হালিমা : সময় সময় মুরগীর অত্যাচার বড় বেশি হয়ে পড়ে।
কুলসুম : মেঝের উপর দাওয়া না করলে মুরগীর অত্যাচার থেকে অনেকটা রক্ষা পাওয়া যায়। উঁচু স্থানে হাঁড়ি রাখবে। ঘরের মধ্যে মুরগীকে যেতে দিতে নেই। এঁটো ফেলার সম্বন্ধে বিলক্ষণ সাবধান হবে। মাটির উপর বসে না খেলে শুধু মুরগী নয়-বিড়াল, কুকুর, ধুলাবালি অনেক কিছুর হাত থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। সকলের এক সময় খাওয়া উচিত। এতে এঁটো কম হয়। যখন তখন হাঁড়িতে হাত দেবে না। বিশেষ কারণ না থাকলে ঘরের দুয়ার বন্ধ রাখবে।
কুলসুম পুনরায় কহিলেন–প্রাতঃকালেই থালা মেজে ফেলা উচিত। ছেলেপেলের ঘরে চীনা মাটির কিংবা কাঁচের বাসন ব্যবহার না করাই ভালো।
ছেলেরা কখনও মাটিতে খাবে না। এদের জন্য মেঝের পার্শ্বে ছোট ছোট টুল রেখে দিলে ভালো হয়। মাটিতে খেলে মুরগীর উপদ্রব বড় বাড়ে। জায়গা বাড়ি নোংরা হয়ে ওঠে।
চালের হাঁড়ি নিচে রাখতে নেই চালের গন্ধে ঘরের মধ্যে মুরগী এসে হল্লা করে।
বদনা, বাটী, থালা কখনও মেঝেয় বা হাঁটবার পথে যেন না থাকে। ছেলেরাই এই অপরাধ বেশি করে। এই কু-অভ্যাসগুলো সংশোধিত না হলে, চিরকাল তারা কষ্ট ভোগ করে।
কোনো জিনিস যদি মাটির উপরে পড়ে থাকে, তাহলে তৎক্ষণাৎ সেগুলি তুলে রাখতে হবে। চাকর-বাকরের সুবুদ্ধির উপর নির্ভর করলে চলবে না। সকল কাজে চাকর-বাকর সুবুদ্ধির পরিচয় দেবে, এ আশা করা যায় না।
গোছল করে অনেক সময় কাপড় পানিতে ভিজিয়ে রাখেন। যখন তখন ধুয়ে ফেললে আপদ চুকে যায়। বেশিক্ষণ পানিতে কাপড় থাকলে পচে যাবার সম্ভাবনা।
অনেক পরিবারে বদনা, ঘড়া এক মাসেও মাজা হয় না। প্রতিদিন বদনা মাজা উচিত।
বাড়িতে দাস-দাসী না থাকলে খাবার পর যার যার থালা, এঁটো সেই সেই পরিষ্কার করে ফেলা ভালো। এঁটোব্লুটো, ফেলে রাখলে মেজাজ ভালো থাকে না, দুর্গন্ধও সৃষ্টি হয়।
কখনও অন্ধকারে জিনিসপত্র খুঁজতে নেই।
শোবার সময়, বাতি ও ম্যাচ ঠিক করে শুতে হয়। বৃষ্টি-বাদলার দিনে ম্যাচ কাপড়ের ভিতর রেখে দেওয়া উচিত-নইলে ম্যাচ জ্বলে না। বিদেশে, বৃষ্টি বাদলের দিনের জন্যে পূর্ব হতে জ্বালানি কাঠ ঠিক করে রেখে দিতে হয়, নইলে অনেক সময় না খেয়ে থাকতে হয়। চুলো ও অগম্ভীর হলে কম খড়িতেই রান্না হয়।
হালিমা : খড়ি কাঠ ঠিক করে রাখা কি মেয়ে মানুষের কাজ?
কুলসুম : না, স্বামীকে পূর্ব হতেই হুশিয়ার হতে বলতে হবে। ধানের খোসা এবং গোবরে জ্বাল দেবার সাহায্য হয়। পল্লী ছাড়া এসব সংগ্রহ করতে পারা যায় না।
হালিমা : গোবরে হাত দিতে আমার বড় ঘৃণা বোধ হয়।
কুলসুম : অবস্থা নিয়ে ব্যবস্থা। খড়ি কেনার পয়সা না থাকলে, গোবরে হাত দিলে দোষ কি? গোবর নোংরা জিনিস নয়।
হালিমা : গোয়াল ঘরের ভিতরে এবং কাছে যে আবর্জনা জন্মে তা দেখলে ঘৃণায় গা বমি করে। এমন জঘন্য দৃশ্যও মানুষকে দেখতে হয়। ছি!
কুলসুম : গরুতে অনেক উপকার হয়। প্রত্যেক জ্বগৃহে দু’একটা ভালো গাভী থাকা নিতান্ত দরকার। অন্য কোনো জিনিস থাক বা না থাক, একটা গাভী এবং কয়েকটি মুরগী পোষা উচিত। দুধ-ঘিতেই মানুষের জীবন; মুরগীর ডিম শরীরের পক্ষে বড় উপকারী। যে কথা বলছিলাম, গোয়াল ঘরের ধারে যে আবর্জনা হয় তা অনেকটা বিরক্তিকর বটে। আষাঢ় মাসে কোনো কোনো বাড়ির ঘর বড় জঘন্য হয়ে ওঠে।
গোয়ালঘর বাড়ি হতে দূরে হওয়া ভালো। ভদ্রগৃহে একটি বা দুইটি গাভীর বেশি থাকা উচিত নয়। এতে বাড়ির পার্শ্বে বড় নোংরা হয়ে ওঠে। দেশে ভালো দুধ-ঘি তৈরি করবার জন্য ব্যবস্থা থাকলে গৃহস্থকে আর কষ্ট করতে হয় না। গ্রাম হতে দূর মাঠের মাঝে মাঝে কেউ যদি দুধ-ঘি সরবরাহের ব্যবসা খোলে তা হলে সে ব্যবসায় বেশ লাভজনক হতে পারে। এই কাজে দেশের লোক যেন বড় উদাসীন। শিক্ষিত নর-নারী যদি এদিকে মনোযোগ দেন তবে লোকের বড় মঙ্গল হয়। দুধ-ঘিতেই মানুষের জীবন।
হালিমা : দরিদ্র মেয়েরা যদি দুধ হতে ঘি তৈরি করে বিক্রি করেন, তাহলে ক্ষতি আছে কি?
কুলসুম : ক্ষতি নেই। একটা রাখাল রেখে মেয়েরা বাড়িতেও এ ব্যবসা করতে পারেন। দূরে গোয়ালঘরে রাখালের তত্ত্বাবধানে গাভীগুলি থাকবে; প্রয়োজনমতো গাভী বাড়িতে সে নিয়ে এ মূলধন নিয়ে একবার পরীক্ষা করে দেখলে মন্দ হয় না। রাখাল চাকরকে কঠিন কথা বলবে না, তা হলে ব্যবসা মাটি হবে।
হালিমা : কি প্রতিক্রিয়ায় ঘি তৈরি করা সুবিধা?
কুলসুম : জমানো দুধ হতে ঘি তৈরি করাই বড় সুবিধা।
হালিমা : কোনো কোনো গৃহিণী গাভীর বাচ্চার উপর বড় অত্যাচার করেন।
কুলসুম : সে আর বলো না বোন। সারাদিন সারারাত্রি বাচ্চা বেঁধে রাখা বড় অন্যায়। দিনে দুবার দুধ বের করা নিষ্ঠুরতা। সন্ধ্যায় বাচ্চা ধরে রাখতে হয়। প্রাতঃকালে নামাজ সেরেই দুধ টানা নিয়ম। দিনের মধ্যে মাত্র একবার দুধ নেবে, আর নয়।
হালিমা : বধূরা কি দুধ টানতে জানে?
কুলসুম : গাভীর তত্ত্বাবধান ও যত্ন বধূদের হাতেই থাকা ভালো। দুধ টানা বন্ধুদেরই কাজ। দুগ্ধ, ঘি, অমৃতসুষমা, মাধুরীশক্তি–এসব জিনিসের মালিক বধূ।
কুলসুম বলিলেন–সন্ধ্যাকালে বাতি পরিষ্কার করা ও বাতিতে তেল ভরা নিয়ে একটা সোরগোল পড়ে যায়। প্রত্যহ স্নানের পূর্বে বাতি ঠিক করে রাখলে সন্ধ্যাকালে হৈ-চৈ হয় না।
