দরজার গোড়ায় আঁধারে অনেক সময় কুকুর দাঁড়িয়ে থাকে, অন্ধকারে হঠাৎ তাদের গায়ে পা দিলে কামড়াতে পারে। না দেখে তাদের গায়ে পানি ফেললে গা ঝেড়ে হঠাৎ কাপড়-চোপড় নষ্ট করে দেয়। কুকুর-বিড়ালকে কখনও শুধু মুখে দূর দূর করতে নেই তাতে লাভ হয় না। সর্বদা লাঠি দিয়ে ভয় দেখাবে।
বাড়িতে স্বতন্ত্র পায়খানার ব্যবস্থা থাকা চাই। স্ত্রীলোকের পায়খানায় কখনও যেন পুরুষ যায়, নিজের ছেলে বা অন্য কোনো পুরুষ কেউ নয়। অবশ্য একথা শহরে খাটে না।
অনেক সময় বাড়ির দাসীদের পেশাব-পায়খানা করবার বড় অসুবিধা হয়! সেদিকে গৃহিণীর বিশেষ দৃষ্টি থাকা আবশ্যক। দাসদাসী বলে তাদের জীবন ও অভাব-অসুবিধা উপেক্ষিত হবার নয়।
হালিমা জিজ্ঞাসা করিলেন-ধোপার কাপড় ও দুধের হিসাব কে রাখবে? বাজার খরচ কার হাত দিয়ে হওয়া ভালো?
কুলসুম : কাপড় ও দুধের হিসাব স্ত্রীদের রাখা উচিত। খরচপত্র স্বামীর হাতে থাকাই ভালো। অনেকে বুদ্ধিমতী স্ত্রীর হাতে মাসের প্রথমে বা শেষে বাজার খরচের টাকা দিয়ে থাকেন। স্ত্রী পরিবারের খাওয়ানোর ভার নিজের হাতে নেন। বাজার খরচ নিজের হাতে নিলে রীতিমতোভাবে খরচের হিসেব রাখা চাই।
কুলসুম আবার কহিলেন–অনেক সময় তাড়াতাড়ি বসবার টুল, হুঁকার কলকে বা গ্লাসের পিঠে বাতি রাখেন, এটা অন্যায় ও কদর্য রুটির পরিচায়ক।
রান্না ঘরে ল্যাম্প না জ্বালানোই ভালো। ঝুলানো বাতি ব্যবহার করলে ঘরে বা কাপড়ে কালি পড়ে না।
অনেক বাড়িতে সংসারের জিনিসপত্র কেবল গড়িয়ে বেড়ায়, এ ভালো নয়। হয় জিনিসপত্র ব্যবহার করতে হবে না হয় যত্ন করে তুলে রাখতে হবে।
পরিবারের মধ্যে যদি কেউ শৃঙখলা ও ভালো রুচির পরিচয় না দেয়, তাহলে নিজে ভালো বলে নিরন্তর তার সঙ্গে ঝগড়া-ঝাটি করাও ঠিক নয়। তার দোষ বা আর সকলে সেরে নেবে। ক্ষমাশীল, দয়ার্দ্র হৃদয়, শান্ত স্বভাব ও হওয়া ভদ্রমহিলার স্বভাব। বেশি কড়াকড়ি নিয়মে ফল খারাপ হতে পারে।
রোজার দিনে পূর্ব হতেই চাকর পরিচারিকা দিয়ে হোক অথবা নিজ হস্তে অথবা ছেলে-মেয়ে দিয়ে এফতারী প্রস্তুত করবে। রোজার সময় সন্ধ্যাকালে রাগারাগি করা দোষ।
কারো কাছে কিছু পাওনা থাকলে মাঝে মাঝে তাগাদা দিতে হয়। নইলে তা আদায় হয় না। তাগাদার জোরে অনেক সময় নিতান্ত বদ লোকের কাছে থেকেও টাকা আদায় হয়। প্রথমেই রূঢ় ব্যবহার নিষেধ।
ঘরের মেটে দাওয়ার ধান গড়ান ধরনের হলে, ভাঙ্গে না। নদীর ধারের মতো করতে হয়। টিনের ঘর তো স্বাস্থ্যকর নয়। তুলতে নিচে ছাত দেবে।
.
অষ্টাদশ পরিচ্ছেদ
কুলসুম বলিলেন-হালিমা অনুন্নত সংসারে অনেক সময় শিক্ষিতা মার্জিত রুচি বালিকাঁদের বড় দুরবস্থা হয়। অনুদার, বহির্জগৎ সম্বন্ধে খবরহীন অথচ অহঙ্কারী পরিবারের বধূদের বড় জ্বালা হয়। শ্বশুর-শাশুড়ী, পাড়া প্রতিবেশী সকলেই বধূকে বিব্রত করে তোলেন। স্বামী এতগুলি লোকের কথা ও মতের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারে না। স্বামী ও আত্মীয়-স্বজনের হয়ে স্ত্রীর উপর অত্যাচার আরম্ভ করেন। বধূকে চূর্ণ করে স্বামী মনুষ্যত্বের পরিচয় দেন। বধূ কি চাকরি করতে যাবে?
হালিমা : চাকরি করলে দোষ কী?
কুলসুম : অসভ্য দুর্মতি লোক যারা তারা দুনিয়ায় পশুর মতো বেঁচে থাকতে পারলেই যথেষ্ট মনে করে। তারা যে নিজে একটু লেখাপড়া শেখে, সে কেবল ঘুষ খেয়ে লোকের তোষামোদ করে বা পরকে ফাঁকি দিয়ে নিজেরা সুবিধা করে নেবার জন্যে। জ্ঞানী, সভ্য ও ভদ্র হবার জন্যে তারা লেখাপড়া শেখে না। নারীকে লেখা-পড়া শিখতে দেখলে তারা তো রাগবেই।
কুলসুম পুনরায় বলিলেন–কোনো দুঃস্থ নারীকে দেখে যদি বধূ সহানুভূতি প্রকাশ করতে যান, তা হলে শঙ্কীর্ণ হৃদয় শাশুড়ী বধূর উপর রেগে থাকেন। বাড়িতে দুপুর বেলা বা অন্ধকার রাত্রির সন্ধ্যায় অতিথি এসে উপস্থিত–বধু তাদের কারো দিয়ে সাদর অভ্যর্থনা। জানাতে ইচ্ছে করবে, স্বামী-শ্বশুরের জ্বালায় তা পিরবার যো নেই। কোনো দরিদ্র আত্মীয় স্বজন বাড়িতে এলে তাকে যত্ন করা দরকার, না করলে অনেক স্বামী বিরক্ত হন। এই প্রকার ব্যক্তিদের মধ্যে থাকা অনেক বধূর কষ্টকর হয়ে পড়ে। যাদের মধ্যে বাস করতে হয়, তাদের ব্যবহার ও প্রবৃত্ত যদি বেশি নীচ হয়, তাহলে বধুর জীবনে কোনো সুখ থাকে না। কোনো কোনো পরিবারে অশ্লীল ও কুৎসিত কথা অসঙ্কোচে উচ্চারিত হয়; এই সমস্ত লোকের মধ্যে বসা করাও বড় কঠিন।
একই ভাব ও প্রবৃত্তি বিশিষ্ট লোকের মিল হয় ভালো। যে মেয়ে বাল্যকাল হতে অন্য রকমে গঠিত হয়েছে তার পক্ষে দুর্মতি লোকদের সঙ্গে বাস করা কঠিন নয় কি? হয় তাকে নিচে নেমে আসতে হবে, নইলে ভিতরে ভিতরে মৃত্যু পর্যন্ত প্রাণে দুঃখে পোষণ করতে হবে। সে দুঃখের কোনো মীমাংসা নেই। শয়তান প্রকৃতির স্বামীর স্পর্শে এসে কত শুভ্র। নারী–আত্মার শোচনীয় পতন হয়। কোনো কোনো আড়ী ভদ্রবংশের মেয়ে বিয়ে করে ভদ্র হতে চেষ্টা করে। কন্যার পিতার তাকে বলে দেয়া উচিত–এইভাবে ভদ্র হতে চেষ্টা করে, নিজে চরিত্রবান ও শিক্ষিত হয়ে ভদ্র হতে চেষ্টা করুন। ইতর ও অর্ধ শিক্ষিত ব্যক্তির হাতে মেয়ে পড়লে তার জীবনে দুঃখ বাড়ে।
কুলসুম : কথা শুনে মর্মাহত হলাম। জান বাঁচান ফরজ, পরদা অপেক্ষা প্রাণের মূল্য বেশি। যে সমস্ত কথা বললাম, এসব কথা কাজে পরিণত করার জন্য, বেপরদা হবার তো কোনো দরকার নেই। স্ত্রীলোক বুদ্ধির পরিচয় দিলে লোকে তাকে বেহায়া বলে, এ আমি কোনো দিন শুনি না।
