বড় বড় শহরে কলমের চারা পাওয়া যায়। পোস্টকার্ড লিখে অর্ডার দিলেও নিজের নামে নিকটস্থ রেল স্টেশনে বাক্সে চারাগাছ এসে উপস্থিত হয়। টাকা দিয়ে ডাকঘর হতে রসিদ দিয়ে স্টেশন থেকে কোনো সহৃদয় প্রতিবেশী দিয়ে গাছগুলি নিয়ে এসে বাড়ির ধারে পুঁতে দিলে দুই-চার বৎসরের মধ্যেই লাভ ভোগ করা যায়। ভালো কুল, লিচু এবং বড় কাশীর পেয়ারার দাম বাজারে বেশি। বাড়ি থেকেও লোকে কিনে নিয়ে যেতে পারে।
দুই-মর জোড়া পায়রা পুষলে দুই-চার মাসের মধ্যে এক একখানা কাপড়ের দাম সংগ্রহ করা যায়। মুরগী ও ডিম বিক্রি করলেও পয়সা হয়। দুঃখিনা সহায়হীনা রমণীর বাঁচবার অনেক পথ আছে–তার ভয় কি? কেবল চেষ্টা ও বিশ্বাস চাই।
হালিমা : পরদানশীন স্ত্রীলোকের পক্ষে এতগুলি কাজ করা কি সম্ভব? এত বুদ্ধি করে কাজ করলে লোকে যদি বেহায়া বলে?
কারো প্রতি যেন কোনোও প্রকার অশ্রদ্ধা না দেখান হয়। মেয়েরা অনেক সময় স্বামীর আত্মীয়-কুটুম্বকে রান্না ঘরে বসে এরূপ অন্যায় কথা বলে থাকেন যা শুনলে বন্ধু অবাক হয়ে অবিলম্বে বন্ধুর বাড়ি ত্যাগ করেন। ভাগ্যে তারা শোনেন না। সাবধান-এরূপ কথা কখনও বলবে না। বাজে লোকের অত্যাচার বেশি হলে একটি বিরক্ত মেয়েরা না হয়ে পারেন না তাও ঠিক। যাদের বাড়ি শহরে তাদের এখানে বহু অবিবেচক লোকের সমাগম হয়। শহরে থেকে সকলকে পরিতুষ্ট করা অসম্ভব, এটা সকলের বোঝা উচিত। দুটি পান, একটু নাস্তা অন্তত তাদের দেওয়া যায়।
টাকা দিয়ে কেউ যদি কারো বাড়ি খেতে চায় তাহলে বন্ধুরা অসম্মানের ভয়ে, তাতে স্বীকৃত হয় না। পাছে লোকে হোটেলখানা বলে বা অতিথি মনে করেন পরিবারের লোকেরা তার দেওয়া টাকায় লাভবান হচ্ছেন এই ভয়ে বধূরা সরে দাঁড়ান।
হালিমা কলিলেন, এতে বধূদের কিছু অসম্মান হয় বৈকি?
কুলসুম বলিলেন কিছুই না, যে কোনো দ্ৰসন্তানকে টাকা নিয়ে বাড়িতে রাখা যায়। এতে বধূদের কোনো অসম্মান নেই। পক্ষান্তরে বহু ভদ্র সন্তানকে উপকার করা হয়। উন্নত দেশে এরূপ প্রথার প্রচলন আছে। বিদেশীদের উপকার করা হয়।
বাইরে কোনো জিনিস যদি পড়ে থাকে তা ঘরের মধ্যে তুলে রাখতে হবে। সন্ধ্যার আগে বাইরে কাপড় আছে কিনা একবার চিন্তা করে দেখা উচিত।
যেখানকার জিনিস ঠিক সে জায়গায় রাখা একান্ত কর্তব্য। যেখানে সেখানে বাড়িতে কেউ যেন গৃহস্থের আবশ্যক জিনিসপত্র ফেলে না রাখে, এতে কাজের বড় অসুবিধা হয়। পরিবারের কেউ যদি এ নিয়ম পালন না করে, তবে তার উপর ক্ষুদ্ধ হবে।
বধূকে সব কাজে বুদ্ধির পরিচয় দিতে হবে। তা হলে বধূর সুনাম বের হবে। ছেলে ম্যাচ নষ্ট করে জেনেও তার হাত থেকে ম্যাচ কেড়ে না নেওয়া, শুধু ছেলেকে মন্দবলা। বুদ্ধিমতী স্ত্রীলোকের কাজ নয়। ম্যাচ কাটি এলিয়ে ফেলবার আগে, ঘড়া হতে পানি ঢেলে ফেলবার পূর্বেই সতর্ক হওয়া উচিত। কুকুরে ভাত খেয়ে ফেলবার পরে বিরক্তির পরিচয় দিয়ে লাভ কি?
বাক্সের উপর কখনও কোনো জিনিস রাখতে নেই। এতে হঠাৎ বাক্সের কভার খুলতে গিয়ে জিনিস নষ্ট হয়।
বিছানা-পত্র দিনে রোদ থাকতে শুকিয়ে নিতে হবে–সন্ধ্যাকালে সিক্ত বিছানাপত্র হাতে করে, খোকা-খুকুদের সঙ্গে রাগারাগি করে কোনোই লাভ নেই।
গৃহস্থালীর কোনো জিনিস ফুরালে, পূর্ব হতেই সতর্ক হওয়া উচিত। পল্লী-গ্রামে, হাটের দিন স্বামীকে কী কী জিনিস কোনো দরকার, আগেই মনে করিয়ে দেওয়া উচিত। খালি হাত হবার পূর্বে জিনিসপত্র নতুন করে আনার নিয়ম।
বধূরা অনেক সময় বেলা পর্যন্ত শুয়ে থাকে। ছেলে-পিলে হলে মেয়েদের সারারাত্রি অনিদ্রায় কেটে যায়, সেইজন্যই সকাল সকাল ওঠা কঠিন হয়। রাত্রি অনিদ্রার জন্য, দিনে একটু ঘুমিয়ে নেওয়াই সুবিধা। সকাল বেলা নামাজ নষ্ট করে না ঘুমানই ভালো।
মনে রেখ, নামাজ নষ্ট করা বড়ই অন্যায়। ছেলেপেলের অত্যাচারে অনেক সময় নামাজের বড় ক্ষতি হয়। ছোট শিশু হলে তাকে ফিডিং বোতলে অভ্যস্ত করানো উচিত। গো-দুগ্ধ ছাড়া বাজারের কোনো খাদ্য কখনও ব্যবহার না করাই উচিত। ছেলের হাতে মিষ্টি বিস্কুট দিলে অনেক সময় তাদের কান্না থামে। ( কখনও নতুন জুতো যেন বাইরে না পড়ে থাকে। শেয়াল বা কুকুর নতুন জুতো পেলেই নিয়ে পালায়।
পরিবারের বিছানাপত্র ও লেপ দুই-চারটা বেশি করে তৈরি করে রেখে দিতে হয়। লেপ ও বিছানাপত্রের দিকে স্বামী যেন বিশেষ মনোযোগ দেন। বধূরও সম্ভব হলে কাঁথা তৈরি করে স্বামীকে সাহায্য করা উচিত। বাজারের তৈরি লেপ ভালো নয়। ধুনকারদের সেলাই করা লেপ আবার নতুন করে সেলাই করলে সহজে তুলা সরে না; নইলে এক বছরেই লেপ নষ্ট হয়ে যায়। প্রত্যহ একটু একটু করে সেলাই করলে কয়েক দিনেই একটা লেপ সেলাই করে ফেলা যায়।
হালিমা জিজ্ঞাসা করিলেন-তোষক না কিনলে কি চলে না?
কুলসুম : খুব চলে। ছেলেপেলেদের তোষকের কোনো দরকার নেই। স্বাস্থ্য যাদের ভালো, মনে যাদের চিন্তা–উদ্বেগ নাই, যারা ঘুমে আকুল, তাদের তোষক না হলেও চলে। বয়োবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ঘুমকে কাজ রূপে গ্রহণ করতে হয় তখন কিছু নরম বিছানার দরকার হয়। যাদের বেশি মানসিক পরিশ্রম করতে হয়, তাদের জন্য যত নরম বিছানা হয় ততই ভালো।
