কুলসুম আবার বলিলেন–স্বামী যদি কোনো বিশেষ কাজে বিদেশে থাকেন তা হলে তাকে অনবরত কাজ ফেলে বাড়িতে আসতে অনুরোধ করবে না। বিরহের কথা জানাবে না, এতে স্বামীর কাজে অমনোযোগ আসতে পারে-কর্মশক্তি নষ্ট হতে পারে।
স্বামী যদি কলেজের ছাত্র হন, তা হলে তাকে আদৌ পত্র না দেওয়া উচিত। যদি পত্র লেখা নিতান্ত দরকার হয়, তা হলে, অল্প কথায় লিখবে। প্রণয়ের কথা ভালবাসার কথা লিখতে নেই। পত্রে স্বামীকে উপদেশ দিতে লজ্জা করা উচিত নয়। ঠিক উপদেশ রূপে কথা না বলে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে মিষ্টি করে কথা বলতে হবে। কর্তব্য কার্যে অবহেলা করে স্বামী যেন স্ত্রীর কাছে কখনও না আসেন, সে দিকে লক্ষ থাকা চাই। পত্র না লেখার কারণ স্বামীকে পূর্ব হতেই বলে রাখবে নইলে স্বামী রাগ করতে পারেন।
স্বামীর কাজ বা কথার প্রশংসা করা উচিত। অনর্থক তর্ক করা বড় খারাপ ও অভদ্রতা, এরূপ করলে স্বামী-স্ত্রীতে প্রণয় হয় না। স্বামী কোনো কারণে ক্রুদ্ধ হলে কখনও তাঁর সামনে হাসতে নেই। হাই তোলাও দোষের।
স্বামীর সঙ্গে বিদেশে যেতে কোনো প্রকার লজ্জা বা সঙ্গোচ করা ভালো নয়। বিশেষ বাধা না থাকলে স্বামীর সঙ্গে থাকতে বরং পীড়াপীড়ি করা উচিত। স্বামীর নিকট হতে চলে আসবার জন্যে কোনোরূপ জেদ কখনও করতে নেই। এটা বড় দোষের কথা। এতে স্বামীর শ্রদ্ধা ও বিশ্বাস নষ্ট হতে পারে।
কোনো কোনো পুরুষ স্ত্রীকে ফেলে বিদেশে থাকে। পাঁচ বৎসরেও দেশে ফেরে না। স্ত্রী-পুত্রের জন্য অর্থ উপায় করার উদ্দেশ্যে তারা সাধারণত দূর দেশে যায়, এ খুব প্রশংসার কথা। দুঃখের বিষয়, অনেক লোক চরিত্র হারিয়ে অর্থ উপার্জন করে। যদি এইরূপ কোনো ভয় থাকে, তা হলে স্বামীকে বিদেশে না যেতে দেওয়াই ভালো। চরিত্র হারিয়ে অর্থ উপার্জন। করা মূর্খতা ছাড়া আর কি?
.
সপ্তদশ পরিচ্ছেদ
কুলসুম বলিলেন–প্রিয় বোন, পরিবারের শ্রীবৃদ্ধি অনেক পরিমাণে হাতে। এ যেন সব সময় মনে থাকে। বধূর মনোযোগে দরিদ্র পরিবারেও প্রেম, শান্তি ও সচ্ছলতা বিরাজ করে। পাড়া-প্রতিবেশী সকলেই পরিবারের মঙ্গলকাক্ষী হয়।
বধূকে সব কাজে বুদ্ধির পরিচয় দিতে হবে। স্বামী ভালবাসেন বলে বধূ যেন উজ্জ্বল এবং সংসারের কাজে অমনযোগী হয়ে বা অহঙ্কারে নিজের সুনাম নষ্ট না করেন। কাজের শৃঙখলা-সৌকর্যের প্রতি সব সময় তার নজর থাকা চাই।
হালিমা : দরিদ্র পরিবারে কেমন করে মেয়ে মানুষের চেষ্টায় সচ্ছলতা আসে শুনতে চাই।
কুলসুম : কোনো জিনিস নষ্ট হতে দিতে নেই। দেখে-শুনে হিসাব করে খরচ করলে, সব জিনিসই বেশি দিন চলে। টাকা পয়সা বেশি আছে বলে অনর্থক ভাত, তরকারী বেঁধে পচিয়ে ফেলে দেওয়া উচিত নয়।
কাপড়-চোপড় ছিঁড়ে গেলে একটু রিপু করে নিতে হয়। কাপড়-চোপড় অবহেলা করে ফেলে না দিয়ে যদি একটু-আধটু সেরে দরিদ্রকে দেওয়া যায়, তা হলে তাদের যথেষ্ট উপকার হয়। সতরঞ্চি কেনবার সঙ্গতি না থাকলে ধোয়া পুরনো কাপড় দিয়ে কাঁথা সেলাই করে নিতে হয়। কাঁথা তৈরি করতে অনেক মেয়ে আলসেমি বোধ করেন; কত দিনে শেষ। হবে, এই ভয়ে অনেকে কাঁথা তৈরি করার নাম শুনে চমকে ওঠেন। এতে অনেক সময় লাগে তা ঠিক, কিন্তু গল্প ও হাসি-তামাসা করার সময় যদি একটু আধটু বা একটা লাইন করে দৈনিক সেলাই করা যায়, তা হলে সতরঞ্চি ও অল্প শীতে রাত্রে গায়ে দেবার কাপড় কেনবার জন্য পয়সা ব্যয় করতে হয় না। নিজেরা বড় মানুষ হলেও গল্পে সময় নষ্ট না করে কাঁথা তৈরি করে, দরিদ্র আত্মীয়-স্বজন অথবা দরিদ্র মানুষকে দেওয়া যায়। পরখে সুখ দিয়ে মনে যে আনন্দের সঞ্চার হয়, তার তুলনা কোথায়? মূল্যবান কাজ নষ্ট করে কাঁথা সেলাই করতে বলছি না। অবস্থার উপর লক্ষ রেখে কাজ করতে হবে। পরিবারের সকলে ও ছেলেপেলেদের শোবার কষ্ট দেখে বধূদের বিবেচনা চাই।
বাড়িতে তরকারি গাছ লাগিয়ে দেওয়া উচিত, এতে সংসারের অনেক খরচা বেঁচে যায়। কুমড়া, লাউ, সীম, বরবটি, বড় কচু, মেটে আলু প্রভৃতি অনেক প্রকার তরকারি বিনা চাষাবাসে হয়। অনেক দরিদ্র পরিবারের মেয়েরা মুরগি, ভেড়া, ছাগল পালন করেন। এতে বেশ লাভ হয়। ছাগল ভেড়ায় পরের অনিষ্ট করে, সে দিকে নজর রাখা চাই। দারিদ্রভার ঘুচাতে গিয়ে যদি সহানুভূতিহীন প্রতিবেশীর গালি খেতে হয়, তবে সেও বড় কষ্টের কথা। কেরোসিন তেল, লবণ, মরিচ, সাগুদানা কিনে যদি পাড়ার লোকদের কাছে বিক্রি করা যায় তা হলেও দরিদ্র গৃহিণীর অনেকটা উপকার হয়। আজকালকার লোক বড় ধূর্ত–কাউকে বাকি দিতে নেই। কোনো ভদ্রলোকের কর্তব্যও নয় দরিদ্র মেয়েদের কাছ থেকে কোনো জিনিস বাকি নেন। ফসলের সময় কালই, পেঁয়াজ বা গুড় কিনে রেখে দিলে বেশ ভালো। হয়। অবশ্য কিছু মূলধন চাই।
যে সমস্ত মেয়ে বাল্যকালে কোনো শিল্প বা সেলাই-এর কাজ শিখে রাখেন, ভবিষ্যৎ জীবনে দুঃখে পড়লে তাহাদের ভয়ের কোনো কারণ থাকে না।
বাড়ির পার্শ্বে হলুদ ও আদার গাছ লাগিয়ে দেওয়া ভালো। আনারসের গাছ জঙ্গলের মধ্যেই হয়। চেষ্ট থাকলে যেমন করেই হউক, গাছের বীজ অথবা গাছ সংগ্রহ করে নেওয়া যায়। দুই-চারটা তরকারি, কলাগাছ থাকলেও পয়সা হয়। এসব কাজ করতে পুরুষের সাহায্য প্রয়োজন হয় না। মূলা শাকের ক্ষেত করতে মাটি তৈরি করার দরকার হয়, মাটি কোপান শুরু পুরুষ লোকেই পারে, এমন কোনো কথা নয়। জোছনা রাত্রে কোমরে কাপড় জড়িয়ে মাটি কোপালে কি ক্ষতি? এতে সম্মান নষ্ট হয় না। সম্মান নষ্ট হয় অন্যায় কাজে-পরমুখাপেক্ষী হয়ে থাকায়, আর ভিক্ষা করায়। ধান ভানলে বা কাজ করলে জাতি যায়, এ যারা মনে করে তারা অপদার্থ।
