“আরবদেশে আইয়ামে জাহলিয়াতের (অজ্ঞানতার যুগের) কাল হইতে একপ্রকার মনুষ বিদ্যমান ছিল। উহাদিগের ‘কাহিন’ বলা হইত। উহারা শয়তানের বান্দা-বাঁদী ছিল। ওই কাহিনরা মুখে একপ্রকার আওয়াজ করত সংগীতের মারফত আজগৈবি কথাবার্তা জানান দিত। মসজেদে সপ্তরাত্র এত্তেকাফে অতিবাহিত করিয়া অষ্টরাত্রে গৃহে প্রত্যাগমন করিয়া চমকিয়া উঠিয়াছিলাম। বিবি ইকরাতন কোরান শরিফ পাঠ করিতেছে ভাবিয়া কিয়দ্দণ্ড কর্ণপাত করিতেই জানিলাম সে আল্লাহের কালাম আবৃত্তি করিতেছে না। উহা অন্যপ্রকার কিছু হইবেক। তৎক্ষণাৎ গৃহ প্রবেশ করিয়া উহার মুখে আছার বাড়ি মারিলাম। শয়তানি আছা ধরিয়া ফেলিল।….
“বিবি ইকরাতন আদতে কাহিন-আওরত ছিল। উহাকে তালাক দিবার সমুদায় হেতু এরূপে বর্ণিত হইল।…..
“এক বৎসর পর লোকমারফৎ সম্বাদ পাইলাম জে হারামজাদী কাহিন পুনরায় হিন্দু হইয়াছে। বরমপুর অথবা বেহ্মপুর নামক জায়গায় গিয়া তাঁত কারখানায় সূতা কাটিতে কাটিতে আমার কুৎসামূলক সংগীত গাহে। সেইদিবস জুম্মাবার ছিল। মসজেদে জাইয়া খুৎবাপাঠের সময় মোছলেম ভ্রাতৃবৃন্দকে কহিলাম, প্রেরিত পুরুষের তাওয়ারিখ (ইতিহাস)-লেখক ইবনেহিশামের এই বৃত্তান্তটি শ্রবণ করুন।….
‘বনু খাতমা (খাতমাবংশীয় ট্রাইব)-দিগের মধ্যে আস্মা-বিন্তে-মানোয়ান নামে জনৈক ‘কাহিন’ ছিল। সে রসুলে আল্লাহর (সাঃ) নামে কুৎসামূলক সংগীত গাহিত। একদিবস হুজুর পয়গম্বর (সাঃ) ব্যথিতচিত্তে কহিলেন, এমন কেহ কি নাই জে আমাকে মারোয়ানের কন্যার কুৎসা হইতে অব্যাহতি দিবেক? সেইস্থানে বনু খাতুমার জনৈক ইমানদার উমায়ের-ইবনে-আদি হাজির ছিল। সে তৎক্ষণাৎ তলওয়ার খুলিয়া ধাবিত হইল। সেই রাত্রে উমায়ের আমাকে কোতল করিয়া আসিয়া কহিল জে হে পয়গম্বর! আমি উহাকে কোতল করিয়াছি। প্রেরিত পুরুষ কহিলেন জে তুমি আল্লাহ ও তাঁর রসুলের সেবা করিয়াছ। উমায়ের কহিল জে হে পয়গম্বর! আসমা নিদ্রিত ছিল এবং উহাব বক্ষে বাচ্চা ছিল। সে পাঁচটি বাচ্চার মাতা। হে রসুলে আল্লাহ আমার গোনাহ হইবেক কি? প্রেরিত পুরুষ কহিলেন জে উহার জন্য দুইটি ছাগলও ডাকিয়া উঠিবে না। ইহার অর্থ হইল জে গোনাহ দূরের কথা, একজন কাহিনকে কোতল করিলে কেহই তাহাব জন্য কাঁদিবে না। বেরাদানে ইসলাম! তাহার পর বনু খামার সমুদায় লোক ইসলাম কবুল করিয়াছিল। ইবনেহিশাম লিখিয়াছেন জে এই ঘটনা ইসলামের শক্তি সাব্যস্ত করিয়াছিল। আরও কহি জে এই ঘটনা বদরের জঙ্গের (যুদ্ধের) পর ঘটিয়াছিল।….
“জমাদিউল আউল মাসের ১১ তারিখে বিবি ইকরাতন কোতল হয়। সন স্মরণ নাই। সেইকালে তাবৎ মুলুকে ভয়ংকর বন্যা হয়। হাজার ২ মানুষ এবং জানোয়ার ভাসিয়া যায়। শয়তানী কাহিনের কাতেল (হত্যাকারী) তিনদিবস পরে তালডোঙ্গায় চাপিয়া ফিরত আসিল এবং কহিল জে হারামজাদীর লাস পানিতে ভাসিয়া গিয়াছে!…..
“সেই রাত্রে আসমান ছিদ্রযুক্ত হওনের নিমিত্ত পানি গিরিতেছিল। এবাদতখানায় বসিয়া আছি। আচানক দেল ফাটিয়া গেল। দুই হস্তে মুখ ঢাকিয়া ক্রন্দন করিতে থাকিলাম। হে পরওয়ারদিগার। হে কুমখলুকাতের মালেক! বনু আদমের মৃত্তিকা নির্মীত এই অজুদের ভিতরে তুমি কী গোপন চীজ (জিনিস) স্থাপন করিয়াছ জে সামান্য ধাক্কায় সমুদায় জিন্দেগী কাঁপিয়া উঠে? হতভাগিনী ‘কাহিন’ আওরত! কেয়ামতের পর হাশরের ময়দানে আমি উহার জন্য নেকির অর্ধাংশ দানে তৈয়ার। রহিলাম!…..”
মেহেরবাঁ হোকে বুলালো মুঝে চাহো জিস্ ওয়াক্ত
ম্যায় গ্যায়া ওয়াক্ত নেহি হুঁ কে ফির আভি না শাকুঁ….
মৌলাহাটে ফিরে আসার পর ‘হজরত’ বদিউজ্জামান (আর তাঁকে কেউ মৌলানা বা মওলানা বলত না) কিছুকাল এবাদতখানায় নিঃসঙ্গ কাটান। কথিত আছে, তাঁর খিদমতগার আলি বখশকে তিনি এসে আর দেখতে পাননি। পরে খবর হয়, আলি বখশ বীরভূম জেলার আমভুয়া গ্রামের মসজিদে আজান হাঁকার অর্থাৎ মোয়াজ্জিনের কাজ পেয়েছে। বোনকেও সেখানে নিয়ে গেছে। আলি বখশের কণ্ঠস্বর মোলায়েম এবং সুরেলা ছিল। তাছাড়া বদুপিরের খিদমতগার হিসেবে তার একটি পৃথক কৃতিত্ব ছিল জনসাধারণের কাছে, সরকারি চাকরির বেলায় দরখাস্তে এক্সপিরিয়েন্স শীর্ষক আইটেম যেমন প্রার্থীকে যোগ্যতর প্রতিপন্ন করে। অবশ্য আলি বখশের এই পলায়নের কারণ হুজুরের সঙ্গে ইকরাতন বিবির নিকাহ।
প্রতিবন্ধী মনিরুজ্জামান তার পিতার ফিরে আসার খবর পেয়েই বাড়ি চলে যায়। সে এবাদতখানায় সম্ভবত জীবনে প্রথম অলৌকিকতার আস্বাদ পেয়ে থাকবে। জ্যোতি জিনগুলি অথবা নিঃসঙ্গতা (আলি বখশ তাকে পছন্দ করত না বলে এড়িয়ে চলত), প্রাকৃতিক পরিবেশজনিত রহস্যময় নৈঃশব্দ্য, আর এবাদতখানার ভেতরে বুজুর্গ পিতার চিহ্নগুলি– এই-সমস্ত তার জড়তাগ্রস্ত চেতনাকে পুনঃপুন আঘাতে জর্জরিত করত। আর অন্তত এটুকু সে বুঝত, তার আওরত তাকে পছন্দ করে না। সে ততদিনে ছেলের বাপ হতে পেরেছে এবং এটিকে সে কৃতিত্ব বলে গণ্য করছে এবং তার আত্মবিশ্বাস জন্মেছে। অথচ ওই খুবসুরত আওরতটি তাকে বৃক্ষলতা কিংবা চতুস্পদ প্রাণী গণ্য করে। তাই তার মনে অভিমান ছিল। জ্বালা ছিল। এবাদতখানার প্রশান্তি– যা একটি সরোবর, বনানী, নির্জনতা, জ্যোৎস্না, অন্ধকার, চাঁদ, নক্ষত্র, ছায়াপথ, পাখি ও পোকামাকড়ের দ্বারা নির্মিত পরাবাস্তবতা, তাকে একপ্রকার অলৌকিকতার আস্বাদ দিয়েছিল। নারীর জন্য প্রেম, পুত্রের প্রতি বাৎসল্য– এসব বাস্তবতাকে ওই সংক্রামিত পরাবাস্তবতা গ্রাস করে। মাকড়সার জাল যেমন পোড়ো বাড়ির দরজাকে ঢেকে রাখে, তেমনিভাবে স্ত্রী-পুত্র-জননী সংসারকে মনিরুজ্জামান ধূসর একপ্রকার সূক্ষ্ম তন্তুজালে আবৃত দেখত। তার এবং,রুকুর মধ্যে একটি শিশু পরিণামে দূরত্ব সৃষ্টি করে। কিন্তু মনিরুজ্জামান সম্পর্কে একটি ঘৃণ্য বিষয়ের উল্লেখ জরুরি। পশুর তীব্র যৌনবোধ থেকে এই হতভাগ্য। প্রতিবন্ধী নিষ্কৃতি পায়নি। সে স্বমৈথুনে অভ্যস্ত ছিল। এবাদতখানার পূর্বে জঙ্গলের মধ্যে সে এই প্রবৃত্তি চরিতার্থ করে আসত। বাড়ি ফেরার পর যখন তার ওই মেটামরফসিস ঘটে গেছে এবং সে পরাবাস্তবতাময় জীবনের অন্তর্ভুক্ত হয়েছে তখনও সে হঠাৎ-হঠাৎ কামনাজর্জর হত এবং পায়খানাঘরের ভেতর যৌনতা থেকে মুক্তি চেয়ে নিত। এভাবেই রুকুকে বর্জনের চেষ্টা করত সে।
