এদিকে হজরত বদিউজ্জামান কিছুকাল পরে ধীরে আত্মম্বসরণের সাধনায় লিপ্ত হন। তিনি চিত্তের প্রশান্তি হারিয়ে ফেলেছিলেন। স্ত্রীর কাছে ফিরে যাওয়ার তাকিদ অনুভব করতেন। একদা ঠিক তাঁর স্ত্রী যেভাবে প্রতীক্ষা করতেন, তিনিও সেইভাবে প্রতীক্ষায় থাকনে। হয়তো সেজন্যই আর খিদমতগার বহাল করেননি। বাড়ি থেকে খানা আনিয়ে আহার করতেন। কোনো-কোনো বেলা তিনি কোনো একটি খাদ্যে সাইদার স্পর্শ-গন্ধ-স্বাদ টের পেতেন। সাইদা আর রুকুর রান্নায় স্বাভাবিক পার্থক্য ছিল। বুজুর্গ ব্যক্তিটির রসনা কেন, দৃষ্টি এড়িয়ে যাওয়ার সাধ্য ছিল না সেই পার্থক্যের।
ক্রমশ তিনি কিছু গঠনমূলক ক্রিয়াকলাপে মন দেন। পুকুরটির পরবর্তীকালে যা পিরপুকুর নাম পায়, তার উত্তরপাড়ে একতলা কয়েকটি ঘর গড়ে ওঠে। সেটি এতিমখানা। মসজিদসংলগ্ন মক্তবটি পুরোপুরি মাদ্রাসা হয়ে ওঠে এবং এর পিছনে হরিণমারার বড়োগাজির প্রচুর মদত ছিল। মৌলানা নুরুজ্জামানের সঙ্গে এ নিয়ে। তুমুল বাহাস (বিতর্ক) হয় বড়োগাজির। নুরুজ্জামান মাদ্রাসাটিতে দেওবন্দি কারিকুলাম চালু করতে চেয়েছিলেন। শুধু আরবি-ফারসি-উরদু ছাড়া আর কোনো ভাষায় পড়াশোনা হারাম –এই ছিল তাঁর মত। কিন্তু বডোগাজি আলিগড়ি ধাঁচের পক্ষপাতী। তিনি বাঙলা আর ইংরাজিকেই আবশ্যিক করতে চান। সুবিখ্যাত ক্যালকাটা মাদ্রাসার দৃষ্টান্ত দেন তিনি (১৮২০ ইংরাজি সনের ১৫ জুলাই কলকাতার তালতলায় যার শিলান্যাস এবং ১৮২২ সনের অগাস্ট মাস থেকে পঠনপাঠন শুরু)। হজরত বদিউজ্জামান বড়োগাজির মতে সায় দেন। ফলে বাংলা ১৩০৯ সন, হিজরি ১৩২০ সন, খ্রীস্টীয় ১৯০২ সনে মৌলাহাট মাদ্রাসা স্কুল স্থাপিত হয়। কয়েক মাসের মধ্যে সরকারি অনুমোদন এবং আর্থিক সাহায্যের ব্যবস্থা করে বড়োগাজি, সবিক্রমে কলকাতা থেকে ফিরে আসেন। অসংখ্য ছাত্র সংগৃহীত হয় এলাকার বিভিন্ন গ্রাম থেকে। হুজুরের পাঞ্জা এবং নিশান নিয়ে বড়োগাজি, ছোটোগাজি, মৌলাহাটের চৌধুরিসাহেব, আনিসুর সর্দার প্রমুখ লোকেরা গ্রামে-গ্রামে সভা করে বেড়াতেন। পরের বছর বাইরের ছাত্রদের জন্য ‘তালেবুলএলেমখানা’ (হোসটেল) তৈরি হয়। ছাত্রদের তখনও ‘তালেবুলএলেম’ বলা হত এবং জনগণের উচ্চারণ-বিকৃতিবশে সেটি ‘তালবিলি’-এ রূপ নিয়েছিল।
একদিন বদিউজ্জামান এবাদতখানার উত্তরের বনভূমিতে গিয়ে অভ্যাসমতো দাঁড়িয়ে আছেন (কিংবদন্তি অনুসারে তিনি ওইভাবে নির্জনে বৃক্ষবাসী জিনদের সঙ্গে কথা বলতে যেতেন), বাঘনখা নামে একটি বেঁটে চওড়া পাতাওয়ালা গাছের তলায় একটি যুবককে বসে থাকতে দেখেন। এইসব গাছের ফলন গড়ন বাঘের নখের মতো। বদিউজ্জামান অবাক হয়ে লক্ষ্য করেন, সে নির্জনে বসে কেতাব পড়ছে। তার মাথায় টুপি, পরনে যেমন-তেমন একটি কুর্তা আর চু পাজামা, খালি পা। মুহূর্তের জন্য চমকে উঠেছিলেন বদিউজ্জামান, যুবকটির মুখের অর্ধাংশ শফির মতো। তিনি একটু কেশে সাড়া দিতেই যুবকটি ঘুরল এবং হজরত পিরসাহেবকে দেখে উঠে দাঁড়াল। তারপর ছুটে এসে সসম্ভ্রমে তাঁর পদচুম্বন করল। বদিউজ্জামান জিগ্যেস করলেন, কে তুমি বাবা? যুবকটি মৃদুস্বরে কুণ্ঠিতভাবে বলল, আমি তালেবুলএলেম। আমার নাম জালালুদ্দিন। হজরত বললেন, তোমার মোকাম?…জি, বীরভূমের মখদুমনগর গ্রামে।…এখানে তুমি কেতাব পড়তে আস দেখছি!…জি, হা…তুমি জান না এই জায়গায় কারুর আসা বারণ? জালালুদ্দিন বিব্রতভাবে বলল, হজরতে আলা! আমি নতুন এসেছি। কেউ আমাকে একথা বলেনি। গোস্তাকি মাফ করবেন। আর কখনও আসব না। এই বলে সে পা বাড়ালে বদিউজ্জামান ডাকলেন, বেটা! শোনো! তুমি কী কেতাব পড়ছিলে এখানে, দেখি। জালালুদ্দিন সংকোচে দুহাতে হুজুরের পাক হাতে কেতাবটি তুলে দিয়ে বলল, জনাবে আলা! এখানি উরদু শাইরি। হিন্দুস্থানের নামজাদা শায়ের (কবি) গালিবের কেতাব। হিজরি ১২৮৬ সনে উনি ইন্তেকাল করেছেন। বদিউজ্জামান কেতাবখানির পাতা ওলটাচ্ছিলেন। একটি পাতা তিনি মনোযোগ দিয়ে পড়ছেন দেখে জালালুদ্দিন শালীনতাবশে চুপ করল। বদিউজ্জামান আস্তে বললেন, মির্জা গালিবের কথা আমি কিছু শুনেছি। সে তো শরাবি ছিল! তবে আল্লাহপাকের কুদরত বোঝা দায়। ব্যানাবনে মুক্তা ছড়ানো বলে একটা কথা আছে। পরওয়ারদিগার কী খেয়ালে রাবি দিওয়ানাদের দেলে হীরা-জহরত-মুক্তা ছড়ান, সেই কুদরত নাদান মানুষ কী করে বুঝবে? জালালুদ্দিন, কেতাবখানি এবেলা আমার কাছে থাউক। মগরেবের ওয়াক্তের পর তুমি এবাদতখানায় এসো। ফেরত দেব। জালালুদ্দিন এমন ভঙ্গিতে চলে গেল সে হুজুরের সঙ্গে এই আশ্চর্য মোলাকাত এবং কেতাব দেওয়ার কথা সাড়ম্বরে সকলকে বলবে। আচানক চোখঝলসানো নুর (জ্যোতিঃ) এবং পাক ছুরত (পবিত্র মূর্তি) এবং কাছে থেকেও দূরবর্তী কণ্ঠস্বরের মতো কণ্ঠস্বর শোনার কথাও সে হয়তো না বলে ছাড়বে না। বস্তুত কথিত আছে হজরত বদিউজ্জামানের কণ্ঠস্বর আসমান থেকে ভেসে আসার মতো বোধ হত। হিন্দুশাস্ত্রে যাকে দৈববাণী বা আকাশবাণী বলা হয়, হজুরের কণ্ঠস্বরে সেই দূরত্ব ছিল।
বদিউজ্জামান গালিবের যে পঙক্তিটি পড়ছিলেন, তা হল : মেহেরবাঁ হোকে বুলালো মুঝে…।
‘যখনই ইচ্ছা, করুণাপ্রবণ হয়ে আমাকে ডেকে পাঠাও/আমি তো চলে যাওয়া সময় নই যে, ফিরে আসতে পারব না!’
