কচি ॥ ছোটোদাদাজি জানতেন ইকরাতনকে ওঁর আব্বা বিয়ে করেছিলেন?
দি বেগম ॥ জানি না! শুনিনি। হিজরি ১৩২৩ সনে এক বর্ষার রেতে উনি এসেছিলেন। আম্মার সঙ্গে কয়ঘড়ি কথাবার্তা বলে বেরিয়ে গেলেন। শাশুড়িসাহেব তখন জবাইকরা মানুষের মতন মেঝেয ধড়ফড় করছেন। আর এমন বেদিল বেরহম মানুষ, অমন করে চলে গেলেন! কেনই বা এসেছিলেন, কেনই বা আম্মার দেলে (হৃদয়ে) চাকু মেরে চলে গেলেন, কে বলবে সেই খবর?
কচি ।। একমিনিট দাদিমা! হিজরি কত সন বললে?
দি বেগম ।। হিজরি ১৩২৩ সন। রবিউস-সানি মাসের ২৭ তারিখ।
কচি ॥ (পঞ্জিকা দেখে হিসেব করার পর), ইংরিজি ১৯০৫ সাল। জুলাইয়ের। এনড অর অগাস্টের ফার্স্ট উইক। থাক বাবা। পরে কামালস্যারের কাছে জেনে নেব। কিন্তু আমার অবাক লাগছে দাদিমা, সনতারিখটা কেন তোমার মুখস্থ? (দিলরুখ বেগম চুপ করে আছেন দেখে) বলো না দাদিমা? ঠিক আছে, বলল না। (একটু পরে) ওঃ হো! ইতিহাস বইতে পড়েছি, ওই বছর ১৬ই অক্টোবর বঙ্গভঙ্গ হয়েছিল। তার বিরুদ্ধে প্রচণ্ড আন্দোলন হয়েছিল। হিন্দু মুসলমানের হাতে রাখি বেঁধে দিয়েছিল। বড়লাট কারজন আর ঢাকার নবাব সলিমুল্লা ষড়যন্ত্র করে কাণ্ডটা বাধায়, জান তো?
দি বেগম ।। আমি ওসব জানি না। আমি কি তোর মতো লেখাপড়া জানি?
কচি ।। (হঠাৎ উত্তেজিত) সেই রাতটার কথা তোমার স্পষ্ট মনে আছে?
দি বেগম ॥ (স্মৃতির ভেতর থেকে আচ্ছন্ন স্বরে) আছে। অবিকল সব দেখতে পাই। পানি বর্ষাচ্ছে। জানালায–
কচি ।। ওয়েট, ওয়েট! ছোটোদাদাজির হাতে রাখি বাঁধা ছিল? দি বেগম ॥ কী?
কচি ।। রাখি, রাখি! লাল সিলকের সুতোয় বাঁধা রাংতার নকশাকরা শাদা। শোলার তকমা। এবার বুঝলে?
দি বেগম ।। (চমকে উঠে) ছিল! দেখেছি।
কচি ।। হুঁ –থাকা উচিত। তুমি কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের নাম নিশ্চয় শুনেছ?
দি বেগম ॥ কে সে?
কচি ॥ ভ্যাট! তুমি হোপলেস দাদিমা। জান? উনি তখন কলকাতার জোড়াসাঁকোর বাড়িতে ছিলেন। বেরিয়ে পড়লেন নাখোদা মসজিদে গিয়ে মুসলমানদের হাতে রাখি পরাবেন বলে। কবিগুরুকে বলা হল, মুসলমানরা ওঁকে মেরে ফেলবে। ওঁকে আটকানো হল। আমার কষ্ট হয়, দাদিমা! মুসলমানরা কি এতই জানোয়ার? মুসলমানরাও ওঁকে বিশ্বকবি বলে মানেনি বুঝি? সেদিন যদি কবিগুরু নাখোদা মসজিদে গিয়ে মুসলমানদের হাতে রাখি বাঁধতেন, উঃ! কী ঐতিহাসিক ঘটনা ঘটে যেত! (আস্তে) দেশভাগ হত না। তোমার চাচাজির ছেলেরাও পাকিস্তানে যেতেন না। মৌলাহাটে আমাদের কী বিরাট ফ্যামিলি হত, কল্পনা করো! কেন যে কবিগুরুকে ওরা মিথ্যে ভয় দেখাল, বুঝি না বাবা!
দি বেগম ॥ মানুষটা কে রে?
কচি ।। (উঠে গিয়ে একটি বই এনে এবং খুলে) এই দেখো ইনিই রবীন্দ্রনাথ।
দি বেগম ॥ চোখে তত শোজে না। কিন্তু ওনাকে তো অবিকল শ্বশুরসাহেবের মতন লাগছে রে! হ্যাঁ –ওইরকম পোশাক, ওইরকম বাবরি চুল, সফেদ (শাদা) দাড়ি। ওইরকমই!
কচি ।। বলল তাহলে!
দি বেগম ।। কিন্তু ছবি দেখা গোনাহের কাম, কচি! তুই আবার আমাকে গোনাহগার করলি!
কচি ॥ যাব্বাবা! মৌলাহাটে আর কি সেই পিরিয়ড আছে? কজন ফরাজি আছে আর? আবার তো হানাফি হয়ে গেছে লোকেরা। ঘরে ছবি টাঙায়। গানবাজনা করে। মহরমে তাজিয়া করে। (হাসিতে অস্থির হয়ে) আর তোমাদের পির ফ্যামিলি কী করছে? বড়োদাদাজির বংশধররা? আমরা? আমি আমি বেপরদা হয়ে স্কুলে যাচ্ছি। তার বেলা?
দি বেগম ।। তোর আব্বা যত নষ্টের গোড়া। রফি ঠিক খোকার মতো হিঁদুঘেষা ছিল। রফিকে বোঝায় কার হিম্মত? পিরের খান্দানি রফিই নষ্ট করেছিল।
কচি ।। কখনো না। ছোটোদাদাজি।
(খোকা এল হন্তদন্ত হয়ে। দিলরুখ বেগম পুরনো আমলের খাটে তাকিয়ায় হেলান দিয়ে বসে ছিলেন। কচি পা ঝুলিয়ে। বাইরে শরৎকালীন বিকেলের রোদ্দুর। ভ্যাপসা গরম দিনভর। খোকাকে দেখে দুজনেই চমকে উঠেছিল)।
খোকা ।। দাদিজি! কয়েকদিনের জন্য বাইরে যাচ্ছি। কেউ জিগ্যেস করলে বোলো, জানি না। আর এই পুঁচকি মেয়ে! সাবধান! (সে দেয়াল থেকে ব্যাগ নামিয়ে প্যান্ট-শার্ট-তোয়ালে এইসব জিনিস দ্রুত ভরে নিয়ে বেরিয়ে গেল। এক বৃদ্ধা এবং এক তরুণী হতবাক হয়ে বসে রইল)।……
‘She claims him with her great blue eyes
She binds him with her hair;
Oh, break the spell with holy words,
Unbind him with a prayer!’*
–The Witch of Wenham–J.G. Whittier
‘ফার্সি হুসিয়ারনামা কেতাবে জে২ প্রকারে বর্ণিত আছে, আওরতটির দেহেও সদৃশ নমুদ ছিল। বাঙালামুলুকে ইহাদিগের ‘ডাহিন’ কহা জায়। উহাকে শয়তানের কবজ হইতে বাঁচাইবার নিমিত্ত নুরপুরনিবাসী মোছলেমবৃন্দকে কহিলাম, কেহ কি এই আওরতকে নিকাহ, করিতে তৈয়ার আছে? সকলে বহুত২ ডর পাইল। কেহ করিল, হজরতে আলা! আমরা শুনিয়াছি জে, আপনি জনৈক জমিদারবাবুর কন্যাকে শয়তানের কবজ হইতে বাঁচাইয়াছেন। আমরা উহাকে বাঁধিয়া আপনার হুজুরে হাজের করিতেছি। উহাদিগকে খামোশ করিলাম। কিছু দিবস পরে কাজীছাহেব আমাকে জ্ঞাত করিলেক কে বিবি ইকরাতন নিজমুখে কহিয়াছে জে তোমারদিগের পিছাহেবের যদি আমার নিকাহ দেওয়ার একপ্রকার তাকি থাকে তাহা হইলে তিনিই আমাকে নিকাহ করুন। আমার অজুদ শিহরিত হইল। কহিলাম, প্রেরিত পুরুষ বহুত২ জেহাদে মৃত য়েহুদা এবং নাছারাদিগের বেওয়া আওতগণকে মোছলেমদিগের সহিত নিকাহ দ্বারা ভরণপোষণের বন্দোবস্ত করিয়াছিলেন হাদিছে এমত বর্ণিত আছে। রসুলে আল্লাহ (সাঃ) নিজেও এমতে জনৈক নাছারা বেওয়াকে নিকাহ করেন।…..
