I am monarch of all I survey,
My right there is none to dispute…….
[William Cowper (1731-1800)]
১৭. নারী এবং প্রকৃতি
He says that woman speaks with Nature.
That she hears voices from under the earth.
That wind blows in her ears and trees whisper
to her. That the dead sing through her mouth…
Woman and Nature–Susan Griffin
কচি ।। বডো আব্বা ইকরাতনকে কেন তালাক দিয়েছিলেন, দাদিমা?
দিলরুখ বেগম ॥ সে ডাহিন আওরত ছিল।
কচি ॥ ডাহিন– ডাইনি? ডাইনি কী দাদিমা?
দি বেগম ॥ তারা নাঙ্গা হয়ে রেতের বেলা মাথায় চেরাগ জ্বেলে মাঠে-জঙ্গলে যায়। তারা গাছপালার সঙ্গে কথা বলে। হাওয়ার সুরে গাওনা করে। সেই গাওনা। শুনে মুর্দারা কবর থেকে উঠে আসে।
কচি ॥ বোগাস! তোমাদের যুগের লোকেরা একেবারে বাজে ছিল।
দি বেগম ।। কচি! ইকরাতন সত্যিই ডাইনি ছিল। এক নিশুতি রেতে আয়মনিখালা আমাকে আর শাশুড়িসাহেবাকে ঘুম থেকে উঠিয়ে দেখিয়েছিল। পুকুরের ওপারে খোঁড়াপিরের দরগায় ইকরাতন নাঙ্গা হয়ে মাথায় চেরাগ জ্বেলে দাঁড়িয়ে ছিল। ও যে হিঁদুর মেয়ে ছিল, তা জানিস?
কচি ।। বলেছিলে। আবদুল ডাকাত তাকে ভাগিয়ে এনেছিল!
দি বেগম ॥ ভাগিয়ে না, জবরদস্তি তুলে এনেছিল। তখন হিন্দু মরদের মউত হলে তার আওরতকেও মুর্দার সঙ্গে পুড়িয়ে মারত। আবদুল ওকে শ্মশানের চিতে থেকে–
কচি ।। কিন্তু তখন তো সতীদাহ অলরেডি বে-আইনি! পুলিশ কী করছিল? (একটু পরে) হুঁঃ! পুলিশ যা করে, দেখতেই তো পাচ্ছি। খোকা ঠিকই বলে।
দি বেগম । সেই দেখার পর শাশুড়িসাহেব পরদিন ইকরাতনকে ডেকে পাঠালেন। খুব নসিহত (ভর্ৎসনা) করলেন। বললেন, বউবিবি! তুমি একে কলমা শেখাও। নামাজ পড়া শেখাও। ইকরাকে বললেন, তুমি রোজ দুকাঠা চাল পাবে। বোজ দুবেলা বউবিরির কাছে এসে ইসলামি এলেম তালিম করো। তাজ্জব লাগে বে! ইকরাতন তারপর থেকে রোজ দুবেলা আসত। তাকে কোরানশরিফের ‘আমপারা পুরো মুখস্থ করিয়েছিলাম।
কচি ।। (উত্তেজিতভাবে) দাদিমা! বুঝতে পেরেছি, ইউরেকা!
দি বেগম ॥ কী হল? চেঁচিয়ে উঠলি কেন?
কচি ।৷ তুমি বলছিলে? বড়ো আব্বার নজর পড়েছিল মেয়েটার দিকে। বড়ো আম্মা তাই তাঁর হবু সতীনকে তৈরি করছিলেন।
দি বেগম ৷। কার দেলের (হৃদয়ের কথা কে জানে ভাই? তো নুরপুরে তাকে নিকাহ করে শ্বশুরসাহেব প্রায় একবছর থেকে গেলেন। এদিকে ওঁর এবাদতখানায় আলি বখশ একলা থাকতে নারাজ। রোজ রেতে তাকে নাকি কালা জিনেরা এসে জ্বালাতন করে। তখন আনিসুর সর্দার আর সব মাথা-মাথা লোক তোর দাদাজিকে বললেন, পিরজাদা! আপনি গিয়ে এবাদতখানায় থাকুন। লোকেরা এসে হুজুরের নামে দানখয়রাত করছে। সব আলি বখশ মেরে দিচ্ছে। তাই নিয়ে ভাসুর-সাহেবের সঙ্গে আলি বখশের খুব কাজিয়া হত। উনি পয়জার মেরেছিলেন আলি বখশকে। সেই থেকে মাতব্বররা রফা করে দিলে । তোর দাদাজি গিয়ে এবাদতখানায় বহাল হলেন। শুনেছি, এবাদতখানায় উনি নামাজ পড়তেন আর সেই নামাজের সময়ে ওঁর পেছনে কাতার (সারিবদ্ধ) দিয়ে শাদা জিনেরা নামাজ পড়ত। ল্যাংড়াভ্যাংড়া মানুষ। কিন্তু খুব সাহসী আর গোঁয়ার ছিলেন। খুব বদমেজাজিও।
কচি ॥ তুমি তোমার স্বামী সম্পর্কে যখনই কথা বল, লক্ষ্য করেছি, বড় তুচ্ছতাচ্ছিল্য কর ওঁর সম্পর্কে! কী ব্যাপার?
দি বেগম ।। (ক্রুদ্ধস্বরে) কচি! ছোটো মুয়ে বড়ো বাত কবি না।
কচি ।। (হাসতে-হাসতে) ঠিক আছে বাবা! তোমাদের প্রাইভেট ব্যাপারে নাক গলাব না! এবার বলো, কেন বড়ো আব্বা ইকরাতনকে তালাক দিলেন? ও দাদিমা! প্লিজ! আর কখনো ওকথা বলব না। বলো না কেন ইকরাতন বিবিকে তালাক দিলেন বড়ো আব্বা?
দি বেগম ।। (কিছুক্ষণ পরে শ্বাস ফেলে) কয়লা যায় না ধুলে/খাসিয়ৎ যায় না মলে। শ্বশুরসাহেব যখন মসজিদে ‘এত্তেকাফে’ থাকতেন, তখন ইকরাতন আবার ডাহিনগিরি করত। হুজুরের কানে সেকথা পঁহুছে দিত লোকে! তবে কথা কী জানিস, ভাই? বনের পাখি খাঁচায় ঢোকালেই কি পোষ মানে? ইকরাতনের চিরটাকাল বেপরদা মাঠেঘাটে ঘোরা খাসিয়ৎ। সে পরদায় বন্দী থাকতে পারবে কেন? তাই যেন ইচ্ছে করেই তালাক নেবার জন্যেই ওইসব করত। শেষে শ্বশুরসাহেব দেখলেন, ভুল কাম হয়েছে। তাঁর ইজ্জত বরবাদ হয়ে যাচ্ছে। তখন মজলিশ ডেকে তাকে তালাক দিলেন। তারপর নুরপুর থেকে আবার ফিরে এলেন মৌলাহাটে। সেদিন। মৌলাহাটে আবার সে কী ভিড়! কাতারে-কাতারে লোক আগাম খবর পেয়ে দুদিন ধরে পথ তাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বাদশাহি সড়কের দুধারে লোক। সক্কালে খবর হল, দূরে হুজুরের নিশান দেখা গেছে। টাঙ্গাগাড়িব মাথায় সবুজ নিশান, তাতে শাদা চাঁদতারা। ইসলামি নিশান।
কচি ।। কিন্তু ইকরাতনের কী হল?
দি বেগম ॥ হুঁ, সেকথা বলি। (একটু চুপ করে থাকার পর) সবই শোনা কথা। আয়মনিখালা ছিল আমার ছোট্ট দুনিয়ার জানালা। সে আমাকে তাবৎ খবর দিত। তো নুরপুরে বড়ো এক রেশম কারখানা ছিল। তার মালিক ছিল এক গোরা সাহেব। সে ‘স্বদেশীদের হাতে খুন হয়েছিল। তারপর কারখানাটা এক হিন্দু জমিদার কিনে নেন। কিন্তু চালাতে পারেননি। তাবৎ কারিগর আর সুতোকাটুনিরা কষ্টে পড়ল। তখন বেম্মপুরে– যেখানে তোর ছোটদাদাজি হিন্দু হয়ে থাকতেন, সেখানে তাঁতের কারখানা ছিল। তারা অনেকে সেই কারখানায় গেল। ইকরাতনও শুনেছি সেখানে গিয়ে সুতোকাটুনির কাম করত। তোর ছোটোদাদাজির সঙ্গে সেখানেই তার দেখা হয়।
