ন তন্ত্র সূর্যো ভাতি ন চন্দ্রতারকম্
নেমা বিদ্যুতো ভাস্তি কুতোহয়মগ্নিঃ
পরদিন সকালে গিয়াসুদ্দিনের সঙ্গে একজন মুসলমান যুবক আশ্রমে এলেন। গিয়াসুদ্দিন আমাকে দেখিয়ে তাঁকে সহাস্যে বলে উঠলেন, এই সেই পলাতক পিরজাদা। শফি! এঁর নাম দিদারুল আলম। নুরপুরে নিবাস। তবে বহরমপুর শহরে ওকালতি করেন। আমার আত্মীয়। দিদারুল হাত বাড়িয়ে বললেন, আস্সালামু আলায়কুম! বহুকাল পরে অনিচ্ছাসত্ত্বেও প্রত্যুত্তর দিলাম এবং আমার কণ্ঠস্বর আড়ষ্টতা ছিল। দিদারুল গম্ভীর মুখ বললেন, আপনার আব্বাসাহেব আমাদের গ্রামে এসেছেন জানেন কি? বললাম, না। দিদারুল বললেন, আপনার কথা গিয়াসভাইয়ের কাছে শোনামাত্র ছুটে এসেছি। একটু আড়ালে আপনার সঙ্গে কথা বলতে চাই। গিয়াসুদ্দিন বললেন, আমি দেববুভাইয়ের কাছে গিয়ে বসছি। তোমরা কথা বলল। দিদারুল আমার কাঁধে হাত রেখে বললেন, চলুন। ওই খালের ধারে যাই। আকস্মিকতার ধাক্কা ততক্ষণে কাটিয়ে উঠেছি। শক্ত মনে খালের ধারে একটি জামগাছের তলায় গেলাম। দিদারুলের পরনের আচকান, মাথায় লাল তুর্কি টুপি, গোড়ালির উর্ধ্বে পায়জামা দেখে বুঝলাম এই নবীন উকিল ফরাজি। তিনি বিনা ভূকিায় ভর্ৎসনার সুরে বললেন আপনি সৈয়দবংশীয়। আপনার আব্ব জুর্গ আলেম। অথচ আপনি এই হিন্দুদিগের আশ্রমে হিন্দু লেবাস পোশাক পরে হিন্দু চেহারা নিয়ে বাস করছেন? তওবা, আস্তাগফিরুল্লাহ! এ আপনি কী করছেন? যারা হিন্দুস্থানে সাতশো বছরের মুসলমান তহজিব-তমুদ্দনকে নাকচ করে খ্রীস্টানশাহির মদতে বেদ-রামায়ণ-মহাভারতের দিকে মুখ ফিরিয়েছে, আপনি তাদের কদমে কদম মিলিয়েছেন, ভাই? আপনি নাকি প্রচুর কেতাব পাঠ করেন। আপনি বুঝতে পারছেন না –ডোঞ্চু আনডারস্ট্যানড দ্যাট দা হিন্দুজ আর ডেলিবারেটলি ট্রাইং মিসলিড দেয়ার নিউ জেনারেশন? দে আর মিসাইনটারপ্রিটিং দা হিস্ট্রি! এডুকেশনাল কারিকুলাম পর্যন্ত অভিসন্ধি প্রণোদিত! আপনি ব্রাহ্মদিগের লিবার্যাল অ্যাটিচুড়ের কথা বলতে পারেন। রাজা রামমোহন রায়ের মৃত্যুর পর ব্রাহ্মদিগের লাইন চেঞ্জ হয়ে গেছে। বিস্তর দলাদলি চলেছে তাঁদের মধ্যে। কিন্তু একটা বিষয়ে সকলের এক রা। হিন্দুত্বের পুনরুজ্জীবন। যা কিছু মুসলমানের, তা পরিত্যাজ্য। বাঙ্গালা ভাষা থেকে ইচ্ছাকৃতভাবে আরবি-ফার্সি-তুর্কি বর্জন চলেছে। সংস্কৃতেব আধিপত্য– দিদারুলকে থামিয়ে দিয়ে বললাম, আপনিও কিন্তু সংস্কৃত শব্দ ব্যবহার করছেন! দিদারুল হাসলেন। বললেন, অভ্যাস। বলেই শব্দটি বদলালেন, খাসিয়াৎ। তবে আমি একথা মানি না যে বাঙালি মুসলমানের জবান হবে উরদু। যাই হোক, ভাই শফিউজ্জামান আপনি সৈয়দ। আপনার দেহে পাক খুন বইছে। আপনাকে আমাদের সমাজের খুবই প্রয়োজন। আপনাকে আমি নিতে এসেছি। এখনই আমার সঙ্গে নুরপুরে চলুন। আপনার আব্বাসাহেবের কদম মোবারকে (পবিত্র পদে) হাজের হলেই শয়তান আপনার সঙ্গ ছেড়ে ভেগে যাবে। দিদারুল হাসতে থাকলেন। আমার ইচ্ছা করল, এই উকিলটিকে স্ট্যানলির পিস্তলদ্বারা হত্যা করি। কিন্তু পিস্তলটি আমার ঘরে লুকানো আছে। আমি চুপ করে আছি দেখে দিদারুল আমার একটা হাত ধরে টানলেন। অমনি হাত এক ঝটকায় ছাড়িয়ে নিয়ে বললাম, আপনি এখনই আশ্রম ছেড়ে চলে যান। যদি না যান, বিপদে পড়বেন। দিদারুল স্তম্ভিত হয়ে বললেন, সে কী কথা! বললাম, আপনি যদি গিযাসসাহেবের সঙ্গে না আসতেন, আপনাকে –আমি থেমে গেলে প্রায় চেঁচিয়ে উঠলেন, সৈয়দজাদা! এখনও হিন্দুস্থানে মুসলমান তত কমজোর হয়ে পড়েনি। আপনার আব্বাসাহেবকে খবর দিলে তমাম এলাকার মুসলমান এসে আপনাকে তুলে নিয়ে যাবে। কিন্তু আমার ইচ্ছা নয়, আপনার ওপর জবরদস্তি করি। আপনি আমার কথা বুঝতে চেষ্টা করুন। আপনি কি ভেবেছেন, হিন্দুরা আপনাকে আপন বলে গ্রহণ করবে কোনোদিন? সৈয়দজাদা। এ আপনার আকাশকুসুম খোয়াব। হিন্দুদিগের আপনি চেনেন না। যারা নিজেদের মধ্যে একজাতি অপরজাতিকে অস্পৃশ্য জ্ঞান করে, তারা মুসলমানকে ভেতর-ভেতর কী চোখে দেখে, নিজেই ভেবে দেখুন। এবার আমি আর সহ্য করতে পারলাম না। দ্রুত স্থানত্যাগ করলাম। দিদারুল গম্ভীর মুখে দাঁড়িয়ে থাকলেন। আমি প্রায় শুকিয়েপড়া খালটি এক লাফে ডিঙিয়ে মাঠে গিয়ে পড়লাম। তারপর হলুদ এবং ভূলুণ্ঠিত পাকা ধানখেতের ভেতর দিয়ে উদভ্রান্তের মতন হাঁটতে থাকলাম। তখনও রাতের শিশির শুকোয়নি। হাঁটু পর্যন্ত ভিজে গেল। কোথায় সামান্য জলকাদা, কোথাও ঝোঁপজঙ্গল। সবখানে মাকড়সার জালে শিশিরবিন্দুগুলিন ঝলমল করছিল। শঙ্খিনীর তীরে সেই হিজলগাছটির কাছে পৌঁছে মনে হল, আমি নিরাপদ। আঃ। কী রাজার ঐশ্বর্য চতুর্দিকে দীপ্যমান। কী রহস্য ওই অরণ্যের বুকে ঘননীলবর্ণ কুয়াশায়। কোথায় পাখি ডাকল। এই তো সেই পবিত্র ভূমি যেখানে পৌঁছুলেই মনে হয়, কেউ একজন আছে, যে চিরকালের নারী, যার জন্য পুরুষদিগের জন্ম, যাকে লক্ষ্য করে সমুদয় কবিগণ কবিতা রচনা করেন, ‘Whose heart-strings are a lute’। শখিনী নদীর জলে পা ধুয়ে এসে। মাটির সমান্তরাল হিজল ডালটিতে বসামাত্র মনে হল, কী আশ্চর্য! এই তো আমার রাজত্ব। কার সাধ্য আমাকে এখান থেকে স্থানচ্যুত করতে পারে?
