সিতারা চায়ের পাতা মাটির হাঁড়িতে সেদ্ধ করে তাতে দুধ আর একগুচ্ছের বাতাসা ফেলে দিল। ওর চায়ের স্বাদ অন্যরকম। শাদা ন্যাকড়ায় ছেকে দারুণ সুন্দর দুটো চিনেমাটির পেয়ালায় ঢালল। মেঝেয় বসে বলল, পিও–খাও! সে হাসল। বাঙলা কথা আমি শিখতেই পারলাম না। কী করে শিখব? বিয়ের পর কেল্লাবাড়ি থেকে বাইরে আসলাম। তখন একটু শিখলাম। আগে তো কুছু জানতাম না– একটা কথা বলতে পারতাম না। বোলো, এখন কত পারছি। পারছি না?
পারছ।
তুমি বেশি কথা বললে অনেক শিখা হয় যেন! বোলো কথা বোলো।
তুমি আগে বলল, কেন রাগ করেছ আমার ওপর?
আমার খুশি। তুমিও রাগ করতে পার। পার না?
না।
কিছুক্ষণ ফু দিয়ে শব্দ করে-করে চা খাওয়ার পর সিতারা একটু হাসল।… তুমি আরও বড়ো হও। জওয়ান হও পুরা। তখন সব সমঝাবে। সব কথা বুঝতে পারবে। এখন তুমি ছোটা লড়কার মাফিক আছ, শফিসাব। জান? তুমি তাই আমাকে খারাব মেয়ে ভেবেছ।
পেয়ালা রেখে উঠে দাঁড়ালাম। বললাম, আমি খারাপ মতলব নিয়ে আসিনি তোমার কাছে।
আমার গলার স্বর একটু চড়া হয়ে গিয়েছিল। কাল্লুর মা কাঁথা থেকে মুখ বের করে বলল, কারি বহু? কিসকা সাথ করার করতি তু? কাল্লুবেটাকো আনে দো–
চুপ! চুপ্ সে নিদ যাও। গলা দাবা দুঙ্গি!
সিতারার চেহারা দেখে চমকে উঠলাম। উঠোনে নেমে সে আমার সঙ্গ নিল। তুমি তাহলে রাগ করতে পার দেখলাম। বাহাদুর তুমি! সে হাসতে লাগল।
পেয়ারাতলায় দাঁড়িয়ে আগড়টা খুঁজছিলাম। হঠাৎ সিতারা এসে আমার একটা হাত নিল। শিউরে উঠলাম। তারপরই মনে হল, ও আমাকে হয়তো পরীক্ষা করছে। হাতটা এক ঝটকায় ছাড়িয়ে নিলাম। সিতারা শাসপ্রশ্বাস মিশিয়ে বলল, নাদান! বুদ্ধ! আমার হাতকে কী ভাবলে তুমি? গরম লাগল? আগুন জ্বলে গেল?
সে এগিয়ে গিয়ে আগড়টা খুলে দিয়ে একটু তফাতে দাঁড়াল। আমি বেরিয়ে গেলে সেটা জোরে বন্ধ করে দ্বিল। যখন হেঁটে চলেছি, মনে হচ্ছে উদ্দেশ্যহীন হাঁটা। কোথায় যাব জানা নেই।….
.
সেই বসন্তকালে মৃতদের শহরে সিতারা আর আমি যেন একটা অদ্ভুত লুকোচুরি খেলায় মেতে উঠেছিলাম। মাঝে-মাঝে মনে হত, খুব শিগগির আমার বড়ো হওয়া দরকার–সিতারার ভাষায় পুরা জওয়ান। তবে মানুষের জীবনে একেকটা সময় আসে, যখন মনের বয়স শরীরের চেয়ে বেশি হয়ে যায়। সেই দ্রুতগামিতায় একটা অন্ধ ঘোড়ার গতিবেগ থাকে যেন। আমি ছুটছিলাম, ছুটছিলাম, ছুটছিলাম এক বিব্রত সওয়ার হাতে চাবুক নেই আর ঘোড়াটাও লাগামছাড়া। এই ছুটে চলার মধ্যেই কদিন পরে এক সন্ধ্যার জ্যোৎস্নায় গঙ্গার ধারে নির্জন চবুতরায় সিরাকে আবিষ্কার করে চমকে উঠেছিলাম। সে বলল, তোমার সাথে একটা জরুরি কথা আছেশফিসাব। করিম বুঢ়া হারামি লোক। তোমার চাচাজি কুছু বললে তোমার বদনাম হবে। সেজন্য এখানে বসে আছি।
বুঝলাম সে ফটক থেকে আমার এখানে এসে বসে থাকা লক্ষ্য করেছে বোজ। কাঠের লম্বা বেনচের এক কোণে বসে ছিল সিতারা। তার ওপর কাঠের ছাতার গাঢ় ছায়া পড়েছিল। একটু তফাতে বসে বললাম, বলল।
সিতারা বলল, তুমি আমার কাছে আসবে? এসো– এখানে এসো। কেউ দেখতে পাবে না।
একটু সরে গেলে সে আমার হাত ধরে আরও কাছে টানল। আমার শরীর, হারামজাদা কুত্তা শরীর, ভীষণ জোরে চেঁচিয়ে উঠতে চাইল–আর্তনাদের মতো। কিন্তু সিতারা হাত ছেড়ে দিল তখনই। ফিসফিস করে বলল, ভেবেছিলাম বিড়কে দিয়ে তোমাকে ডাকব। লেকিন বিড় আমকে খারাব ভাববে। ছোটদেওয়ানসাব ফিরে এলে তুমি তাকে একটা কথা বলতে পারবে –আমার জন্য?
বললাম, কেন? কাল্লুভাইকে বললেই পার।।
চুপ। সব সেই হারামির কারসাজি। সিতারা তেমনি চাপা স্বরে বলল। পান্নাসাব বহত জুলুম করছে পরশুরোজ থেকে। আজ দুপুরে আমার ওপর জুলুম করতে এল। চাকু দেখাল। আমি তলোয়ার দেখলাম– আমার ঘরে তলোয়ার আছে। তখন। হারামজাদ খবিস বলে গেল, আমাকে লুঠ করে কলকাত্তায় বেচে আসবে।
তুমি চুল্লুকে বললে না কেন? পান্নাসাব চুল্লুকে ভয় করে।
চুলু একা। পান্নাসাবের পিছে টেনের অনেক গুণ্ডা আছে। খানদান লোকেরা আছে। পান্নাসাব শুধু ছোটাদেওয়ানসাবকে ভয় করে। কেনো কী– নবাববাহাদুরের কাছে বললে কালেকটার বাহাদুরকে উনি খবর ভেজবেন। তখন শয়তানকে কয়েদখানায় নিয়ে যাবে সিপাহিলোক।
একটু চুপ করে থাকার পর বললাম, তুমি নিজে চাচাজিকে বলবে না কেন?
সিতারা মুখ নিচু করে বলল, আমার শরম বাজে।
পরে বুঝেছিলাম এও তার খেলা। শরম একটা মিথ্যে ওজর। আসলে সে আমাকেই তাতাতে এসেছিল। আমি কী বলি, কেমন হয়ে উঠি, কী করি, এইসব আঁচ করতে চেয়েছিল সে। আর বোকার মতো আমি সেই খেলার সঙ্গে জড়িয়ে গেলাম। সিতারার মুখ নিচু করে আধো-আধো স্বরে ভিজে গলায় শরম’ শব্দটা উচ্চারণ আমাকে এমন ঝাঁকুনি দিল, একটা চরম বোঝা পড়ার ইচ্ছা আমাকে পেয়ে বসল। উঠে দাঁড়িয়ে বললাম, চলি।
চবুতরা থেকে লাফ দিয়ে নামলে সিতারা বলল, তুমি কোথায় যাচ্ছ? একটু বসো।
সেও নেমে এল। আমার কাঁধে হাত রাখল। বললাম, তুমি আর এখানে থেকো না! টহলদার বেরোনোর সময় হয়েছে।
দেউড়ির দিকে ঘণ্টাঘড়ি বাজছিল। গুনে দেখিনি কবার বাজল। কিন্তু ঘণ্টার শব্দ শুনেই সিতারা হনহন করে চলে গেল। মোতিমহলের পাশ দিয়ে পেছনের কেল্লাবাড়ির মুখ থুবড়ে পড়ে-থাকা ফটকের ভেতর তার অদৃশ্য হওয়া পরিষ্কার দেখা যাচ্ছিল, জ্যোৎস্না এত উজ্জ্বল। বুঝতে পারলাম সে রাত কাটাতে যাচ্ছে বাপের বাড়িতে।
