.
পরদিন স্কুলে বিড্ডুর সঙ্গে দেখা হলে সে স্কুলের পেছনে গঙ্গার পাড়ে নিয়ে গেল আমাকে। হাসতে হাসতে বলল, ইউ আর কাওয়ার্ড, শফি। ভেগে এলে। কেনো? হোয়েন ইউ গো দেয়ার, ইউ মাস্ট নিড এ বিট পেশেন্স। আজ যাবে তো, বোলো?
বললাম, না।
বিড্ডু আমাকে তার বরাতে শেষ অব্দি কী ঘটেছিল, না শুনিয়ে ছাড়ল না। সেই অশ্লীল গল্প শুনে এত খারাপ লাগল যে ঠিক করলাম, আর ওর সঙ্গে মিশব না। নিজেকে আর নষ্ট হতে দেব না। ছুটির পর সেদিন সে আমাকে ডাকতে আসবে ভেবে কেল্লাবাড়ির ভেতর মোতিমহলের সামনে দিয়ে হেঁটে হাজারদুয়ারি প্যালেসের কাছে একটা চবুতরায় বসলাম। নিচে ধাপবাঁধানো ঘাট। চবুতরায় কেন্দ্রে কাঠের ছাতার তলায় বসে গঙ্গা দেখছিলাম। সূর্য ডুবছিল ওপারের গ্রামের আড়ালে। তারপর হঠাৎ নির্জনতা অসহ্য লাগল। ইমামবাড়ার পাশ দিয়ে উত্তরের ফটক পেরিয়ে ডাইনে ঘুরেছি, আবার পড়ে গেলাম সিতারাব সামনে।
সে স্নান কবে বাড়ি ফিবছিল। কাঁখে মাটিব কলসি। থমকে দাঁড়িয়ে ভাবছিলাম, সেও বিড্ডুব মতো একটা কিছু বলবে। ঠাট্টা কববে। কিন্তু তেমন কিছু কবল না সে। একটু হেসে বলল, বোজ এমন কোবে তোমাব সাথে দেখা হলে মুশকিল শফিসাব!
বুঝতে না পেবে বললাম, কী মুশকিল তোমার?
আছে। তোমাকে বলব না।
চুপ কবে আছি দেখে সে ফেব বলল, তুমি এত্তো কম কথা বোলো কেনো শফিসাব? জওয়ান লডকা– তুমি মেয়েলোকের মতো চুপ থাকো হবঘডি। কুছু তো বলবে? তো বোলো। আমি শুনব।
আস্তে বললাম, কী বলব তোমাকে?
বলবে। আমি দেখতে পাই, তোমার মুখে বহত কথা লিখা আছে। তাই বলবে।
কিছু লেখা নেই আমার মুখে।
পিছু ফিবলে সিতারা ডাকল, শফিসাব, শুনো! একটা কথা শুনো।
কী?
আমি কাল্লু-পাঠানেব বহু বলে তুমি আমাকে কামিনা নীচ লড়কি ভেবো না। মুখসুদাবাদ নিজামতেব সবচাইতে উঁচা খানদানেব খুন আছে আমার গাযে!
অবাক হয়ে বললাম, ওসব কী বলছ, সিতারা?
আমি কসবি না।
সিতারা! তুমি কেন এসব বলছ?
সিতারা মুখ উঁচু করে বলল, আমরা শিয়া আছি। তোমরা সুন্নি আছ। তোমার আব্বাজান শুনেছি বুজুর্গ পির। তা না হলে লালবাগের কোনো শিয়া মেয়েলোক তোমার সাথে কথা বলত না!
বলে সে ভিজে কাপড়ের শব্দ তুলতে-তুলতে চলে গেল। তারপর মনে পড়ল, প্রথম যেদিন কাল্লু পাঠান আমাকে খাতির করে তার বাড়ি নিয়ে যায়, সিতারাকে জানিয়ে দিয়েছিল, শফিসাব সৈয়দ। সিতারা বাঁকা হেসে বলেছিল, সৈয়দ? তো সুন্নি কাহে? আব্বাজান বোলা, সব সৈয়দ শিয়া হোনে লাগে। শফিসাব, তুমি কেমন সৈয়দ আছ দেখি। সে খপ করে আমার হাত ধরে ফেলেছিল। কাল্লু হেসে অস্থির! সিতারা বলেছিল, সৈয়দ হলে আমার হাত পুড়ে যেত। গেল না। তুমি ঝুটা সৈয়দ আছ! অবশ্য সে হাসছিল। তুমি রাগ করেছ আমার কথায়? দেখ, মোতিমহলের। নবাববা বলে তারা সাচ্চা সৈয়দ। তারা আমাদের বলে, বান্দা-চাকর-নোকরের খানদান। লেকিন তুমি দেখো, যখন আমি তোমার হাত পাকড়ালাম, সাচ বোলো, আমার হাত আগুন মনে হয়নি? কাল্লু হেসে গড়িয়ে পড়েছিল! জবাব দিজিযে ছোটাসাব! হামি কুছু বলবে না। আপনার জবাব আপনি দেবেন। ঔব যে সিতারা! তমিজসে বাত কব উনহি কা সাথ। তুম তুম কবতি কিঁউ বি? সিতারা তাকে ধমক দিয়ে বলেছিল, চুপসে বৈঠো! ছিলিম পিও। ম্যয় মেহমানকা সাথ আপনা খোলসে বাত কবুঙ্গি …।
একটা কামানের ওপর বসে থাকতে-থাকতে চাঁদ জ্যোৎস্না ছড়াতে শুরু করল। তখন নহবতখানার দিকে হাঁটতে থাকলাম ফটক পেরিয়ে। ভাঙাচোরা বাড়িগুলোর পর সারবন্দি একতালা ঘরের এদিকে শেষপ্রান্তে কাল্লুর বাড়ি। সামনে বেড়াঘেরা। একটুকরো উঠোনে পেয়ারাগাছ। বারান্দায় লানটিন জ্বলছে।
আস্তে ডাকলাম, সিতারা!
সিতারা ‘কৌন’ বলার সঙ্গে সঙ্গে বুকটা ধড়াস করে উঠল। ভাবলাম পালিয়ে যাই চুপিচুপি। কিন্তু সিতারা আমার স্বর চিনতে পেরেছিল এবং জ্যোৎস্নাও তখন স্পষ্ট। সে বারান্দা থেকে নেমে বেড়ার আগড় খুলে বলল, এসো। অমন দাঁড়িয়ে থাকা ঠিক না। ভেতরে এসো।
বারান্দার খাঁটিয়ায় সে একটা সুজনি এনে বিছিয়ে দিল। এতক্ষণে দেখতে পেলাম, ঘরের ভেতরে কেউ শুয়ে আছে কাঁথামুড়ি দিয়ে। সেদিকে তাকাচ্ছি দেখে সিতারা একটু হেসে বলল, মেরি শাস– শাশুড়ি আছে। রিমার হয়েছে।
কাল্লুর মা কাঁথা থেকে মুখ বের করে বলল, কৌন রি বহু?
ছোটা দেওয়ানসাবকা ভাতিজা। পিরসাবকা আওলাদ। উওদিন আয়া থা না?
হাঁ। বলে বৃদ্ধা আবার কাঁথামুড়ি দিল।
সিতারা আস্তে বলল, বোলো!
কী বলব? হঠাৎ মনে হল, তুমি আমার ওপর রাগ করেছ হয়তো। তাই চলে এলাম।
সিতারা একটু চুপ করে থাকার পর নিঃশ্বাস ফেলে বলল, চায়পাত্তা আছে। চায় খাও! আমিও খাব।
এমন করে চলে এসে অস্বস্তি হচ্ছিল। বললাম, না, থাক।
কেন থাকবে? বলে সিতারা বারান্দার কোনায় উনুন জ্বালতে বসল। পাশের ঘরগুলোতে লোকেরা চাপাগালায় কথাবার্তা বলছিল। একটা কুকুর ক্রমাগত ডাকছিল। সে থামলে কাছেই কোথাও শেয়াল ডেকে উঠল। অমনি কুকুরটার চেঁচামেচি বেড়ে গেল। আশেপাশের জঙ্গলে বাঘ আছে বলেছিল করিম বখশ। শীতের সময় তোপখানার ঝিলের দিকে সে নাকি বাঘের ডাক শুনেছে। এদিকটা একেবারে নিশুতি, শহরের শেষপ্রান্ত এবং ধ্বংসস্তূপ, কবরখানা, পোডড়া মসজিদ, জঙ্গল আর মাইলের পর মাইল আমরাগান। ভাবছিলাম নহবতখানার ওদিক দিয়ে ফিরব না। যে পথে এসেছি, সেই পথই নিরাপদ। তবে উত্তরের ফটক খোলা পাব না! স্কুলবাড়িটার পেছনে ভাঙা পাঁচিলের ভেতর দিয়েই যেতে হবে। গঙ্গার ধারে পৌঁছতে পারলে আর ভাবনা নেই। চেনা জায়গা। কেউ জানতেও চাইবে না আমি কে।
