পান্না পেশোয়ারির আস্তানা ছিল রোশনিমহল্লার ভেতর একটা ঘিনজি গলির মুখে। বিড্ডু একদিন বাড়িটা চিনিয়ে দিয়েছিল। বাড়ির লাগোয়া বুকসমান উঁচু একটা খোলামেলা চবুতরা-ধাঁচের চত্বর। সেখানে খাঁটিয়ায় বসে পান্নাসাব দুটি কমবয়সী ছেলের সেবা নিচ্ছিল। ঘরের দরজা দিয়ে একফালি আলো এসে পড়েছিল তার ওপর। খালি গায়ে বসে আরামে চোখ বুজেছিল পান্না পেশোয়ারি, তার চুল ছুঁয়ে জ্যোৎস্না আর। লানটিনের আলো।
মৃতদের শহরে সবখানেই ধ্বংসস্তূপ এবং যথেচ্ছ ইট পায়ের কাছে। একটা টুকরো-ইট কুড়িয়ে নেওয়ার জন্য ঝুঁকে পড়লাম। সেই নড়াচড়াটা চোখে পড়ায় হাত পা টিপে দিচ্ছিল যে ছেলে দুটি, একগলায় বলে উঠল, কুত্তা নেহি, আদমি! পান্না পেশোয়ারি চোখ না খুলে বলল, আবে শালে! আপনা কাম কর! ছেলে দুটি দেখছিল আমাকে, কী করছি। ইটটা মাত্র কয়েক হাত দূর থেকে জোরে পান্না পেশোয়ারির মুখ লক্ষ্য করে ছুঁড়ে মারলাম। পান্না পেশোয়ারি আই বাপ বলে দু’হাতে মুখ ঢাকল। ছেলে দুটি চেঁচিয়ে উঠল, মার ডালা! মার ডালা পান্নাবকে! ঘরের ভেতর থেকে দুটো লোক বেরিয়ে এল। সঙ্গে সঙ্গে সামনের দিকে দৌড়ে চললাম। পেছনে চিৎকার চাচামেচি শুরু হয়ে গেল। ঘিনজি গলিটায় কোনো আলো ছিল না, শুধু জ্যোৎস্না আর। খাপচা-খাপচা অন্ধকার। এবার গলির ভেতর সাড়া পড়ে গেল। চোর-চোর চিৎকার উঠল। আমি দৌড়চ্ছি দেখে লোকেরা চোর-চোর বলে আমাকে তাড়া করল। গলির পর ঝোঁপ-ঝাড়। নিচে একটা নালা। জলকাদা ভেঙে ওপারে ঘন গাছপালার ভেতর ঢুকে পড়লাম। বুঝলাম, এটা একটা আমরাগান। আমরাগানটা কিছুতেই শেষ হচ্ছিল না। যখন শেষ হল, তখন একটা কাঁচা রাস্তা। রাস্তায় পৌঁছে গাছের তলায় ধপাস করে বসে পড়লাম। দম আটকে আসছিল। মনে হল, আমি বুক ফেটে মরে যাব।…
১৩. শনশন শব্দ
‘হুঁশিয়ার রাত যখন কালো বোরখায় ঢাকে
দিনকে / আর হুঁশিয়ার যখন স্পষ্টতা
আবছায়া হয়ে যায় / আর হুঁশিয়ার
রাতে যা কিছু ভাবতে থাকো / শয়তান
সে তো অশরীরী / তাই।
হুঁশিয়ার হুঁশিয়ার হুঁশিয়ার…..’
শনশন শব্দ করতে-করতে বাইরে একটা হঠাৎ-আসা বাতাস চলে গেল। তারপর গাছপালায় শব্দ, পানিতে শব্দ, কতক্ষণ ধরে ফিশফিশ, চাপা হাসি বা কান্না– কিংবা এরকম কিছু গোপনীয় মানবিক আর্তি, আর চক্রান্তের আভাস চারিদিকে, তখনও পেছনদিকের সবচেয়ে উঁচু তালগাছে বাগড়ায় খড়খড় ঝাঁকুনি, বাদশাহি সড়কের ধারে অশথগাছটায় ক্রমাগত পতপত করে পাতাগুলোর ধারাবাহিক অস্থিরতা, কিছু কি ঘটতে চলেছে, কিছু কি সত্যিই ঘটবে, কান পেতে থাকি। অপেক্ষা করি। আবার শ্বাসপ্রশ্বাসের মতো চারদিকে হুঁশিয়ার হুঁশিয়ার হুঁশিয়ার…! প্রতিটা রাত আসে আর এই হুঁশিয়ারি শুনি। ফারসি ‘হুঁশিয়ার-নামা’ কেতাব বুজিয়ে লানটিনের দম কমিয়ে দিলাম। এবার জানালার বাইরেটা কিছু স্পষ্ট হল। জ্যোৎস্না ঝলমল করছে দীঘির জলে! ইচ্ছে হল শানবাঁধানো নতুন ঘাটে গিয়ে বসি। কিন্তু উঠতে গিয়ে এতক্ষণে কানে এল কারা চাপা গলায় কথা বলছে। ঘঁ, কথা নয়, তকরার। নুরুজ্জামান খুব তর্ক করে বটে। আর বড়োগাজিও তাই। দরজার কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম। দেওবন্দির সঙ্গে আলিগড়ির বাহাস (তক) চলেছে। সড়কের ধারে ঘোড়াটার একটা রেকাবে পা রেখেও বড়োগাজি বলছেন, যাই বলুন মৌলবিসাহেব, আপনার ওই ঢাকার নবাব মস্ত ভুল করছেন। হা….আশরাফ আতরাফ আমি মানি। তাই বলে বাঙ্গলার আশরাফের জবান হবে উরদু, এটা আমি মানি না। নুরুজ্জামান বলল, আপভি ভুল করছেন গাজিসাহেব। আতরাফ নেহি, আজলাফ বলিয়ে। বড়োগাজি ঘোড়ার পিঠে বসে বললেন, ঠিক আছে। আজলাফ বলুন কী আতরাফ বলুন, এরা এদেশের লোক। আশরাফরা আরব-পারস্য থেকে এসেছে ঠিকই। কিন্তু এখন তারা এদেশের লোক কি না? মুসলমান যে দেশে গেছে, সে দেশের জাবানেই কথা বলেছে। এলেম শিখেছে। বড়োগাজি হাসতে লাগলেন ।…আর আপনি মওলানা মোহাম্মদ কাসেম সাহেবের কথা বললেন। ওঁরা তো ওহাবিদের মতো এদেশকে ‘দারুল হরব’ (শত্রুর দেশ) বলেছেন, এমন-কি এদেশের জুম্মার নামাজ নাজায়েজ (অসিদ্ধ) বলে ফতোয়া দিয়েছেন। কিন্ত মওলানা কেরামত আলি সে-ফতোয়া নিয়ে বাহাস করে বলেছেন, এ ফতোয়া দেওয়াই নাজায়েজ! নুরুজ্জামান টিট হয়ে গেল। বলল, ফির বাত করেঙ্গে। বহত রাত হয়ে গেল। হোশিয়ারিসে যাইয়ে গাজিসাহাব। বড়োগাজি হঠাৎ তার তালোয়ার বের করে ফেললেন। চাঁদের আলোয় ঝকঝক করে উঠল তলোয়ার। চমকে উঠলাম। বড়োগাজি তলোয়ার দেখিয়ে বললে, জুলফিকার মৌলবিসাহেব! হজরত আলির তলোয়ার জানবেন! নুরুজ্জামান রাগ করে চলে গেল যেন। হজরত আলির তলোয়ারের নাম ছিল জুলফিকার! বড়োগাজি তার তলোয়ারকে জুলফিকার বলায় নুরুজ্জামানের রাগ হওয়া স্বাভাবিক। তবে শিয়ারা শুনলে বড়োগাজির মাথা যেত। বড়োগাজির ঘোড়ার পায়ের শব্দ দূরে মিলিয়ে গেল। আমি হেসে ফেলেছিলাম। এই দুই নাদান বুড়বকের কাণ্ডকারখানা দেখে মনে মনে হাসি। কিন্তু আবার সব চুপচাপ। তারপর আবার হুঁশিয়ার হুঁশিয়ার হুঁশিয়ার –চারদিক থেকে। মনে মনে বললাম, হে কুলমখলুকাতের মালিক! হে আল্লাহ! এ বান্দা সবসময় হুঁশিয়ার। দুমাস হল, মসজিদের উলটোদিকে সড়কের এধারে এই ‘এবাদতখানা তৈরি করে দিয়েছে লোকেরা। মসজিদে থাকায় আমার খুব অসুবিধে হচ্ছিল। কিছুতেই একা থাকা যায় না মসজিদে। দিনভর এত লোক আসে! সে এক জুলুম বটে! শেষে কাতারে-কাতারে লোক হাত লাগিয়ে এবাদতখানা (ভজনালয়) বানিয়ে দিল। এখনও চুনের গন্ধ ঝাঁঝালো। অস্বস্তিকর এই গন্ধটা। আর আশ্চর্য, এই গন্ধটা কেন যেন আমাকে শফিউজ্জমানের কথা মনে পড়িয়ে দেয়। কেন? পুকুরের ঘাটের মাথায় গিয়ে বসে ভাবতে-ভাবতে হঠাৎ মনে হল, হ্যাঁ –খয়রাডাঙার স্কুলবাড়িতে নিজে তাকে ভর্তি করিয়ে দিতে গিয়েছিলাম, তখন স্কুলবাড়িটা সদ্য চুনকাম করা হয়েছিল। ঠিক, ঠিক! শফির জন্য মন খারাপ হয়ে গেল। দেওয়ানসাহেব নাকি এখনও ওকে খুঁজে বেড়াচ্ছেন। বিশ্বাস করি না। খালি মনে হয়, শয়তানের হাতে আমার ছেলেকে তুলে দিয়েছিলাম। আফসোস! লোকেরা আমার এইসব ছোটখাটো ব্যাপার নিয়ে মাথা ঘামায় না। কেন আমার মেজাজ এমন বদলে গেল, আস্তে শান্তভাবে কথা বলি, কাউকে তম্বি করি না আগের মতে, ঠোঁটে সবসময় হাসি ফুটিয়ে রাখি, এসব কেউ লক্ষ্য রাখে না! উঁচুতে উঠে গেলে যেন মানুষের সবটুকু চোখে পড়ে না নিচে থেকে। ওরা ভাবে, আমার ঘরগেরস্থালি নেই, স্ত্রী-পুত্র নেই, আমি অন্য এক মানুষ। অথচ আমার মধ্যে এইসব জিনিস আছে। টিকে থেকে গেছে সবকিছুই। সাইদার আহাম্মুকির শোধ নিতে আমি যদি নিকাহ করি, লোকের চোখে ছোটো হয়ে পড়ব, এই ভয়। ওরা ভাববে, তাহলে বুজুর্গেরও খাহেস (কামনা-বাসনা) আছে? আসে নাদান বেঅকুফ! পবিত্র কেতাবে বলা হয়েছে, চাষী যেমন তার শস্যক্ষেত্রের দিকে নয়, পুরুষ যাবে তার আউরতের দিকে। পবিত্র কেতাবে আরও আছে? ‘আউরত তার পুরুষের খাহেস পূর্ণ করতে সবসময় তৈরি থাকবে, যদি সে রজস্বলা না হয়। তাঁর ওই মুসলমান প্রতিদিন পাঁচবার নমাজের সময় হাত তুলে বলে, হে দয়াময়! আমাকে ইহলোক ও পরলোকের শ্রেষ্ঠ জিনিসগুলো দাও’ সে কথাও ভেবে দেখতে হবে। ‘পুরুষ ও নারী পরম্পর প্রতিশ্রুতিবদ্ধ’– এও পবিত্র কেতাবের কথা। স্রষ্টা আদমকে গড়েছিলেন। সে পুরুষ। তার বাঁ পাজরের হাড় থেকে বিবি ‘হবা’কে তৈরি করেছিলেন। কেন? বিবি হবাকে গন্দমগাছের ফল খাওয়ার জন্য শয়তান কুমতলব দিল। সাইদাকে শয়তান হাতের মুঠোয় এনে ফেলেছে। তাকে বাঁচানো উচিত। কিন্তু কী করব? কদিন আগেও একবার ইচ্ছে হল, বাড়ি যাই। তারপর হঠাৎ মাথায় এল, জুম্মাবারে আমি খোবা (শাস্ত্রীয় ভাষণ) পাঠের সময় দৃষ্টান্ত দিয়েছিলাম। প্রেরিত পুরুষ একবার পুরো একটি চান্দ্রমাস স্ত্রীদের কাছ থেকে সরে গিয়ে একা মসজিদবাসী ছিলেন। সেই মাসটিতে উনত্রিশটি দিন ছিল। প্রেরিত পুরুষের খানদানে আমার জন্ম। কিন্তু আমি আল্লাহ এবং তার প্রেরিত পুরুষের একজন দীন সেবক মাত্র। কাজেই আমার এই সরে থাকার কাল আরও বেশি হওয়া দরকার।’….এই কৈফিয়ত দেওয়া জরুরি ছিল। ভেবেছিলাম প্রেরিত পুরুষের স্ত্রীদের নিয়েও যেমন মুসলমান নামধারী মোনাফেকরা কেচ্ছা-কেলেঙ্কারি রটাত, তেমন মোনাফেকের তো অভাব নেই। তারা গোপনে কেলেঙ্কারি রটাতে পারে, এই ভেবেই দৃষ্টান্তটি দিয়েছিলাম। তবে যা দেখছি, অনেক উঁচুতে উঠে গেলে নিচের লোকেদের তত নজর চলে না। অথচ আমার কষ্ট। আমার মনে খাহেস। তসবিহ জপে ভুল হয়। তখন মনে পড়েছিল ‘হুশিয়ারনামা’ কেতাবটির কথা। আমার চারদিকে তারপর থেকে হুঁশিয়ার হুঁশিয়ার হুঁশিয়ার…অথচ রাত নিশুতি হলে সেই হুঁশিয়ারির মধ্যও চাপা হাসি-কান্নার মনবিক আর্তি ভেসে আসে। কেই বা হাসে, কেই বা কাঁদে চুপিচুপি ভেবে পাই না। বুঝতে পারি না আমার কী করা উচিত। সারারাত ঘুম আসে না দুচোখে। খালি চিন্তা, উটকো সব কথা, গাছ থেকে পাতা পড়ার মতো কিছু খসে পড়ে, দমকা হাওয়া এসে পাতাগুলো ওড়ে, ছত্রভঙ্গ পায়রার ঝাকের মতো, আবছা, ফালতু কী সব কথা খালি কথা আর কথা, আর সঙ্গে সঙ্গে হুঁশিয়ার হুঁশিয়ার। হুঁশিয়ার…পুকুরের পানিতে ঝিলমিল করে জ্যোত্মা কাঁপছে হুঁশিয়ার হুঁশিয়ার হুঁশিয়ার! ওপারের কালো গাছপালার ভেতর গাঢ় ছায়ায় বসে শয়তান নজর রেখেছে হুঁশিয়ার হুঁশিয়ার হুঁশিয়ার। আমার গা ছমছম করছিল। আমি এত একা! ‘আল্লাহ আমাকে শয়তানের হাত থেকে বাঁচাও!’ বারকতক এই কথাগুলো আবৃত্তি করাম। মাঠের দিকে শেয়াল ডেকে উঠল। গ্রামের দিকে কুকুর। তারপর রোদে বেরনো চৌকিদারের হাঁক ভেসে এল হুঁশিয়ার হুঁশিয়ার হুঁশিয়ার…অসহ্য।
