একটি মেয়ে ভেংচি কেটে বলল, চোলে যাচ্ছি! বিড়ু দেখ বাঙ্গাল ছোকরা চোলে যাচ্ছে। এসো, এসো। যাবে কেনো? জেরা দুধ খেয়ে যাও, কোলে তো বোসো!
সে তার কোর্তা নামিয়ে স্তন দেখানোর ভঙ্গি করল। বিজ্ঞ খি-খি করে হেসে উঠল। আমি রাগে, দুঃখে লজ্জায় দেউড়ির দিকে এগিয়ে গেলাম। প্রকাণ্ড কপাটের হড়কো তুলে বাইরে গেলাম। মুন্নি হা-হা করে দৌড়ে এসে কপাট বন্ধ করল। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে বিড্ডুর অপেক্ষা করলাম। কিন্তু বিজ্ঞ এল না।
বিবিমহল্লার ভেতর দিয়ে ফিরতে ইচ্ছে করল না। ডাইনে ধ্বংসস্তূপ, একটা কবরখানা আর ঝোঁপজঙ্গলের ভেতর দিয়ে এগিয়ে দূরে নহবতখানা চোখে পড়ল। কিছুটা হাঁটার পর একফালি পায়েচলা রাস্তা, রাস্তাটা ঢালু হয়ে নেমে গেছে গঙ্গার দিকে, সেখানেই দেখা হয়ে গেল কাল্লু পাঠানের বউ সিতারার সঙ্গে।
সিতরা মাটির কলসি নিয়ে জল আনতে যাচ্ছিল। আমাকে দেখে থমকে দাঁড়িয়ে গিয়েছিল। বলল, শফিসাব! তুমি এখানে একেলা কী করছ? কী হয়েছে তোমার? অমন দেখাচ্ছে কেনো তোমাকে?
ওকে বলা যায় না আমি কোথায় গিয়েছিলাম, কী ঘটেছে এবং বিড্ডুই আমাকে নিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু সিতারার যতই বদনাম থাক খারাপ মেয়ে বলে, সেই মুহূর্তে সে কানিজাবেগমের হাভেলির বেশ্যাদের মতো কেউ নয়, একটি চেনাজানা মেয়ে এবং তার চেহারার নবারি খানদানের ছাপ, তার চলা-ফেরায় বা কথাবলার ভঙ্গিতে একটা চাপা আভিজাত্য– তা হোক না সে সাতমার কা পাঠানের বউ। আর বারিচাচাজি বলতেন, আনবাব জাত মানেন না, কেল্লাবাড়িতে একঘরে সেজন্য। বেচারার দুর্ভাগ্য, সাত আটটা মেয়ে, একটাও ছেলে নেই। তো কী করবেন? যাকে পছন্দ হয় এবং টাকা দিতে পারে, তাকেই একটা করে গছিয়ে দেন। তিন মেয়ের অবশ্য ভালো বর জুটেছে। তারা কলকাতায় আছে। বাকিগুলো বিলিয়ে দিয়েছেন যেখানে-সেখানে। তবে সিতারা কাল্লুর ঘরে গিয়ে ভালোই আছে শুনেছি।…
সিতারার কথার জবাবে বললাম, এমনি ঘুরে বেড়াচ্ছি।
বিড্ডুকে সাথে নাওনি আজ? সিতারা হাসল। কাজিয়া হয়েছে নাকি?
নাঃ!
তো এসো আমার সাথে। আমি গোসল (স্নান) করব। তুমি আমাকে পাহারা দেবে।
ঘাট অব্দি আর একটা কথাও বলল না সে। আমিও চুপ করে থাকলাম। গঙ্গার পাড়ে একসময় দালানকোঠা ছিল। সব ভেঙে গুঁড়িয়ে গেছে। ঘাটের দুধারে প্রকাণ্ড সব চাঙড়। ঘাটে স্বচ্ছ জলেও প্রচুর চাঙড় মাথা উঁচু কবে আছে। কলসিটা বুকে নিয়ে জনহীন ঘাটে সাঁতার কাটতে থাকল সিতারা। ওর পরনে বাঙালি মেয়েদের মতো শাড়ি। লম্বাহাতা কোর্তা। বাড়িতে সে লাল চটি পরে ঘোরে। এখানে তাকে দেখতে দেখতে আসমার কথা মনে পড়ে গেল।
নদীর সঙ্গে মেয়েদের কী যেন সম্পর্ক আছে– আমি ভাবছিলাম একটা চাঙড়ে বসে। যত ভাবছিলাম, তত আমাকে টানছিল নদী। তবে এ নদী সেই ছোট্ট নদীটি নয়। এর জলের রঙ স্বচ্ছ কালো। এ নদী বড়ো, এর বিস্তার আছে, কিন্তু স্রোত বইছে কি না বোঝা যায় না। দূরে জেগে আছে বালির চড়া। বাঁদিকে ঘুরে গেছে বলে কিছু দেখা যাচ্ছিল না, যদিও জানি ওদিকটায় কেল্লাবাড়ি, ইমামবাড়া, হাজারদুয়ারি প্যালেস, মোতিমহল। হঠাৎ আমার কোর্তায় জল ছিটিয়ে দিল সিতারা। জলের শব্দের সঙ্গে বলল, আও শফিসাব–এসো! খেলা করব।
যদি এ নদী হত ইন্দ্রাণী কাছারির পেছনে সেই খরস্রোতা বেহুলা, আর সিতারা হত আসমা, তক্ষুনি ঝাঁপ দিতাম। কালো জলের দিকে তাকিয়ে আমার ভয় করছিল। ভয় করছিল সিতারাকেও। দূরে ওপারে বাঁশবনের পেছনে সূর্য ডুবে গেছে। আবছায়া ঘনিয়ে এসেছে চারদিকে। কালো জল আরও কালো হয়ে উঠেছে। সিতারা আবার জল ছুঁড়ে মারল। সঙ্গে সঙ্গে মনে হল, এখনই ঠিক করে ফেলা উচিত, এই কালো নদীটিকে ভয় করব, না করব না। সে আমাকে টানছে, পাল্টা টান দেব কি না। কিন্তু টাগ অব ওয়ারে হেরে গেলাম।
হেরে গেলাম অথবা জিতে গেলাম। পায়ে চলা রাস্তাটা ধরে এগিয়ে বড়ো রাস্তায় পৌঁছে একবার মনে হল, সিতারা কী ভাবল আমাকে। যাই ভাবুক, ওর নষ্ট হয়ে যাওয়া থেকে ওকে বাঁচিয়ে দিয়েছি, এই আমার সুখ। আমি যদি জলে ঝাঁপ দিতাম, ও নষ্ট হয়ে যেত। কেউ ওকে বাঁচাতে পারত না, আমিও না।
সে রাতে খেতে বসে করিম বখশকে বললাম, হাবেলি কী করিম?
করিম বলল, কোনো? কোঠি। তো আপনি কোন হাবেলির কথা বলছেন ছোটোসাব? এ টৌনমে তো একহি হাবেলি আছে। বহুত খারাব জায়গা। কানিজা বেগমকি হাবেলি। বাইজিলোক থাকে।
কথায় কথায় সে একটা ইতিহাস শুনিয়ে দিল। রিসালাদার মির মুর্গিন খায়ের বউ ছিল কানিজা বেগম। বিশ বছর আগে মুর্গিন খাঁকে ডাকাত বদনাম দিয়ে সদর কালেকটার সিপাহি-পলটন পাঠায়। তোপখানার জঙ্গলে একটু লড়াই হয়েছিল। মুর্গিন ধরা পড়ে। সদর আদালতে তার ফাঁসির হুকুম হয়। কানিজা বেগম নাকি তার মৃত্যুতে খুশির খানা দিয়েছিল। কেল্লাবাড়ির কোতোয়াল বাকিউদ্দিনের সঙ্গে তার প্রেম ছিল। সেই সময় কেল্লাবাড়ির গরিব মেয়েদের কিনে নেয় কানিজা এবং বাকিউদ্দিন তাকে সাহায্য করে। আসলে কানিজা নিজে ছিল বাইজির মেয়ে। লখনউ থেকে তাকে ভাগিয়ে এনেছিল মুর্গিন। ইতিহাসটি দীর্ঘ। খাওয়ার পরও করিম শোনাতে থাকল। বাকিউদ্দিন লোকটা নিজেই চোর, সে কেল্লাবাড়ির দামী জিনিস লুকিয়ে বেচে দেয়। তারপর কানিজার যৌবন ফুরিয়ে গেলে কীভাবে কোতোয়ালসাব ত্যাগ করে, করিম ইনিয়ে-বিনিয়ে প্রচুর রস মিশিয়ে সেই বৃত্তান্ত বলল। কোতোয়ালসাব বহত হারামি লোক। থানার দারোগাবাবু তার দোস্ত। সদরে কালেকটারবাহাদুরকে দরখাস্ত ভেজেছে, হাবেলিতে খানকি লিয়ে বেওসা হচ্ছে। তো আফশোস কি বাত, গদ্দিনসিন নবাববাহাদুর ভি সহি দিয়েছেন দরখাস্তে। নোটিশ জারি হয়েছে, হাবেলি ছেড়ে দিতে হবে। এখন বলুন ছোটাসাব, বেউশ্যা বলুন কী কসবি বলুন কী খানকি বলুন, বিবিমহল্লার কথা উঠল না কেনো? না –পান্নাসাব বিবিমহল্লার জিম্মাদার! করিম বখশ হাসল। দাড়ি চুলকে বলল, কুছু হোবে না। কুছু হবে না, কেনো– কী, কানিজা বেগম বড়ি ধড়িবাজ আওরত আছে। পান্নাবকে ধরবে। ব্যস!…
