সে দেখিয়ে দিল রাস্তার ধারে একটা সন্দেশের দোকানের কাছে ভিড়ে দাঁড়িয়ে আছে বিন্দু। তার কাছে চলে গেলাম। আমাকে দেখেই বিড্ডু, বলল, কান্ অন্ শফি। জলদি আও।
বললাম, চুল্লু আমাদের ডাকছে।
চুল্লু-উল্লু ছোড়ো! বলে সে আমাকে টানতে-টানতে নহবতখানার দিকে হন্তদন্ত এগিয়ে গেল। চুল্লু নিশ্চয় অবাক হয়েছিল। একবার ঘুরে দেখে নিলাম, সে সেখানেই দাঁড়িয়ে আমাদের দেখছে। আমরা ডাইনে মোড় নিয়ে উত্তরের রাস্তায় হাঁটছিলাম। নহবতখানার তলা দিয়ে রাস্তাটা গেছে। পেরিয়ে গিয়ে বললাম, চুল্লু কোন্ উরসশরিফের মেলায় যেতে ডাকছিল। গেলে ভালো হত, বিন্দু।
বিড্ডু বলল, তার চাইতে বঢ়েয়া জায়গায় আমি তোমাকে লিয়ে যাচ্ছি। সে মুখ টিপে হাসল। তার কোর্তায় আতরের গন্ধ ভুরভুর করছিল। রাস্তাটা ঘিনজি, কালো পাথরের ইট এলোমেলো বসানো, খানাখন্দ এবং দুধারে জঙ্গলের ভেতর ধ্বংস্তূপ, কোথাও একলা-দোকলা জরাজীর্ণ একতালা ইটের বাড়ি-পলেস্তারা-খসে যাওয়া, শ্যাওলায় সবুজ, দাঁতবেরকরা কঙ্কালের মতো বাড়ি। গাছপালার ভেতর মসজিদের গম্বুজে একঝাক পায়রা বসে আছে। রাস্তাটা একেবারে জনহীন। বাঁয়ে ঘিনজি গলির ভেতর ঢুকে বিড্ডু জানাল, বিবিমহল্লা এটা। শুধু ছিটেবেড়ার ঘর, খড়ের চাল, কোথাও ইটের বাড়ি– একইরকম হতশ্রী। গোরু ছাগল মুরগি আর আনমনা লোকে ঠাসা। খাঁটিয়ায় বসে বুড়ো-বুড়িরা চাপা স্বরে কথা বলছে এবং হুঁকো টানছে। কেশে অস্থির হচ্ছে। দরজায়, অথবা ফোকর বলাই উচিত, একদঙ্গল করে মেয়ে বসে আড্ডা দিচ্ছে। তারা বিড় আর আমাকে দেখে নড়েচড়ে বসছিল। এমন সব ঠাট্টা করছিল যে আমি লজ্জায় আর অস্বস্তিতে আড়ষ্ট। আরপর আমার মাথায় এল, এরাই তাহলে বেশ্যা। আমি আরও অস্বস্তিতে পড়ে গেলাম। মহল্লা ছাড়িয়ে গিয়ে সোজা বিকেলের গঙ্গার মুখোমুখি হলাম। পাড়ে একটা খাড়া পাচিল দাঁড়িয়ে, তার পাশ দিয়ে যাবার সময় বিড় চাপা হেসে বলল কানিজা-নানির হাভেলিতে তোমাকে লিয়ে যাচ্ছি। তুমি ভি নানি বোলবে। বুঢ়িয়া খুশি হবে।
ধ্বংসস্তূপ, গম্বুজওয়ালা পোড়ো মসজিদ, তার ভেতর একটা উঁচু পাঁচিলে ঘেরা। একতালা একটা বাড়ি। বাড়িটার একটা উঁচু দেউড়ি আছে। কাঠমল্লিকার প্রকাণ্ড গাছ দেউড়ির পাশে। বন্ধ বিশাল কপাট জুড়ে কাঠের ফুলকারি, কপাট দুটো কোনো এক সময় ভীষণ লাল ছিল আর দেউড়িটাও ছিল শক্ত। এখন টুটাফাটা। কপাটের ফোকরে একটা মোটা দড়ি ঝুলছিল। দড়ির শেষে একটা লোহার ছোট্ট ডাভা। সেটা ধরে বিছু বার কতক টানল। ভেতরে ঢঙ ঢঙ করে ঘণ্টা বেজে উঠল। কপাটের। অন্য পাশটায় আরও একটা ঘুলঘুলি এবং সেখানে দুটো চোখ দেখে চমকে উঠলাম। কপাট ফাঁক হলে দেখলাম যার চোখ, সে একজন মোটাসোটা মধ্যবয়সী মেয়ে, সালোয়ার-কামিজ-উড়নি পরা। বিড্ডুকে সে আদাব দিল। বিছু বলল, মুন্নিখালা, ইয়ে মেরা দোস্ত শফি। বহত উঁচা খানদান। উঠোনে একটা ডালিমগাছের পাশে খাঁটিয়ায় একঝাঁক মেয়ে শুয়ে, বসে এবং পরস্পর হেলান দিয়ে কথা বলছিল। আমাদের দেখতে লাগল। বারান্দার ওপর ছোটো তত্তাপোশের বিছানায় বসে এক বৃদ্ধ ফরসিতে তামাক টানছিল। মোটাসোটা মেয়েটি গিয়ে তাকে বলল, বিড্ডুসাব আয়া আম্মি।
বৃদ্ধা ভুরু কুঁচকে বলল, কৌন রি?
বিড্ডু গিয়ে বলল, নানি! ম্যয় বিড্ডু হুঁ! ক্যায়সি হো তুম নানিজান? খবর আচ্ছি তো? বলে সে আমার নামটাই শুধু বলল। বৃদ্ধা ঘোলাটে চোখে আমাকে দেখতে দেখতে নলে টান দিতে থাকল!
মুন্নি, সেই মেয়েটা, আমার দিকে ঘুরে বলল, তুমি বাঙ্গাল আছ বাবু?
ততদিন আমার জানা হয়ে গেছে, এ শহরের উরদুভাষীদের ‘বাবু’ ‘হিন্দু বাবু’ নয়। বাবা আদরে বাবু হয়। বিজ্ঞ আমার পাঁজরে আঙুল ঠেকাল। বললাম, হ্যাঁ।
বৃদ্ধা, বিড্ডুর কানিজা-নানি নির্বিকার স্বরে বলল, বিড়ুয়া, তু বহৎ ঝুটবাজ।
কাহে রি নানি? বিড্ডু তার পাশে বসে পড়ল। আমাকেও অন্য পাশে বসতে ইশারা করল। কিন্তু আমি বসলাম না।
বৃদ্ধা ধোঁয়ার মধ্যে বলল, কোতোয়ালসাবকো তু কুছ নেহি বলিস! কাল হারামিবাচ্চা দারোগাবাবুকো সাথ লেকে আয়া। লোঠিশ লটক দিয়া দেউড়িমে। বোলা কী, আদালতকা পেয়াদাভি আবে! তো ম্যয় হাবেলি ছোড় কার কালকাত্তা জাউঙ্গি? কা?
বিড্ডু বলল, তেরা কিরিয়া নানি, খোদাকা কসম, কোতোয়ালসাবকো হাম
ছোড় বে শালে পাঠঠে! বৃদ্ধা তার পিঠে থাপ্পড় মারল বাঁ হাতে। ম্যয় পান্নাবকো খবর ভেজুঙ্গি।
মুন্নি এবার আমাকে একটা তেঠেঙ্গে কুরসি এনে দিল ঘর থেকে। কুরসিটার গদি আছে। মুন্নি আমার কাঁধ ধরে বসিয়ে দিল। অমনি বৃদ্ধা একটা হাত বাড়িয়ে বলল, এ বাঙ্গাল ছোঁড়া! কিতনা রূপেয়া হ্যায় তোরা পাস? নানিকো তো কুছ ইনাম দেনা পড়ে গা! দে!
নানি! বিড্ডু বলল। উও বাঙ্গালকা সবসে বড়া পিরসাবকা আওলাদ। উসকো পাস কৈ ফিকির মাত করুগি তু। উও সিরফ, তেরি সাথ মুলাকাতকে লিয়ে আয়া।
বৃদ্ধা ভুরু কুঁচকে বলল, আবে ছোড় শালে পাঠঠে! তেরা মতলব ময় সমঝি। উত্ত ভি রাঙিবাজ লড়কা!
নানি, এক শরিফ লড়কাকো তু–
বৃদ্ধা থাপ্পড় তুললে বিড্ডু উঠে দাঁড়াল। ইশারায় আমাকেও উঠতে বলল। ডালিমতলায় খাঁটিয়ায় মেয়েগুলো ভীষণ ফরসা –পাতাচাপা ঘাসের মতো ফ্যাকাশে। বিড্ডু বারান্দার ধাপ বেয়ে নেমে তাদের কাছে গেল। আমি একটু তফাতে দাঁড়িয়ে থাকলাম। বিড়ু চাপাস্বরে মেয়েগুলোকে কিছু বলল। ওরা হাসতে লাগল আমাকে দেখিয়ে। রাগ করে বললাম, বিজ্ঞ আমি চলে যাচ্ছি।
