বারিচাচাজি মহাল থেকে ফেরার পর নতুন বই কিনে দিয়েছিলেন। তাঁর খুশি দেখে বুঝতে পেরেছিলাম নবারি স্কুলটি সম্পর্কে তাঁর কোনো ধারণাই নেই। গঙ্গার ধারে কেল্লাবাড়ির প্রধান দেউড়ির লাগোয়া দোতলা একটি ঘরে তিনি থাকতেন। ঘরটিতে প্রচুর বই আর পত্রিকা– বেশিরভাগই ইংরেজি, এবং বই-পত্রিকার দিকে আমার একটুও ঝোঁক ছিল না। আমার ভালো লাগত গঙ্গার পাড়ে ঝকঝকে একফালি রাস্তার ধারে ফুলবাগিচা, কাঠের ছাতাবসানো চবুতরা, সানবাঁধানো ছোট আর বড়ো ঘাট, আর গঙ্গা। শীতে কালো জলের তলায় ঝিকমিক করত কী সব জিনিস, মনে হত কবে কোন নবাবজাদির কানের মোতির ‘ল হারিয়ে গিয়েছিল, তারই খুঁড়ো। আর বিড্ডু বলত, উও সিরফ বালু– জাস্ট স্যানড। তুম কভি গঙ্গা নেহি দেখা, শফি? দিস রিভার যিতনি দুইরাসে আতি, যিতনি দুইবোসে যাতি, বহতি, মেরা খানদানকা মুল্লুক থি। শালে ইংলিশ লোগোনে লুঠ লিয়া। আই হেট দা বাটার্ডস। বিড্ডুর বাবা কলকাতায় চাকরি করতেন। তাঁকে কখনও দেখিনি। বারিচাচাজি বলেছিলেন, বিড্ডুব আব্বা কলকাতায় এক মেমসাহেবের সরদার খানসামা । কিন্তু সাবধান, বিড়কে বলিসনে এসব কথা। বলিনি। বিড্ডু বলত, সে বড়ো হলে ফৌজ জোটাবে। পান্নসাব তাকে সাহায্য করবে। সেই ফৌজ নিয়ে সে ইংলিশম্যানদের সঙ্গে জেহাদ লড়বে। কথাটা আমার, কে জানে কেন, ভালো লাগত। সেই ভালোলাগার সূত্রে পান্না পেশোয়ারিকেও সবে অন্য চোখে দেখতে শুরু করেছিলাম! অথচ সেই বিড্ডুই যখন বলত, সে পান্নাবকে ঘৃণা করে এবং লোকটা বিপজ্জনক, তখন অবাক লাগত। আসলে বিড্ডু ছিল অস্থিরচিত্ত, চঞ্চল, কিছুটা ভীতু স্বভাবের ছেলে। পান্না পেশোয়ারিকে দূর থেকে দেখলে এড়িয়ে যেত। ফিসফিস করে বলত, নজর কারকে দেখো, দেয়ার ইজ এ ডারক হ্যালো বিহাইনড হিম, বহত খতরনাক! উসকা সাথ বাত মাত করো কভি। হি ইজ ডেনজারাস।
বারিচাচাজির বাবুর্চি-নোকর বলতে বুড়ো করিম বখশ। সেও আমাকে পান্নাসায়েবকে এড়িয়ে চলতে পরামর্শ দিত। পরে একদিন করিম বখশ মুখ বিকৃত করে বলেছিল, পান্না পেশোয়ারির কাছে লড়কালড়কির কোনো ফারাক নেই। আপনার মতো সুন্দর ছেলের ওপর ওর নজর পড়লে মুসিবত হবে। সঙ্গে-সঙ্গে ব্যাপারটা বুঝতে পেরেছিলাম। পান্না পেশোয়ারির ওপর আমার রাগের তৃতীয় কারণ এই।
একদিন কোনো মহালে প্রজাদের সঙ্গে হাঙ্গামা বেধেছে, বারিচাচাজি হাতি চেপে সেখানে গেছেন, সঙ্গে সাতমার কান্নু এবং একদঙ্গল ভাড়াটে বরকনদাজ, যারা তলব পেলেই আশেপাশের এলাকা থেকে এসে হাজির হত হাজারদুয়ারি প্রাসাদের সামনে। তখন স্কুলে ছিলাম বলে সেই জঙ্গি সমাবেশ দেখতে পাইনি। করিম বখশ এবং পরে বিড্ডু এসে খুব রঙ চড়িয়ে বলল, ফৌজ রওয়ানা দিয়েছে। এতে বিড্ডুর খুশি আর উত্তেজনার কারণ খুঁজে পাচ্ছিলাম না! গদিনশিন নবাববাহাদুর পরিবারের সঙ্গে তাদের প্রচণ্ড শতা। অথচ বিড্ডুর নবারি রক্ত তোলপাড় হচ্ছে নাকি, বিড্ডু বলল, দা সেইম ব্লড শফি, খানদানকা খুন! সেই উত্তেজনায় সে আমাকে এখানে নিয়ে গিয়ে মজা লুঠবে বলে টানছিল। দক্ষিণের বড়ো দেউড়ির কাছে পৌঁছে পড়ে গেলাম পান্নাসাবের পাল্লায়। এড়ানো গেল না তাকে।
পান্নাবকে দুধারের টুলে বসে থাকা লিকলিকে চেহারার দুই প্রহরী, যাদের হাতে খুব লম্বা দুটো গাদা-বন্দুক এবং ডগায় সঙ্গিন আটকানো, সেলাম দিচ্ছিল। পান্নাসাবের চোখ পড়ল আমাদের দিকে। হেসে বলল, আরে বিড়! আআ যা মেরা পাশ! তারপর আমাকে দেখল সুরমাটানা চোখে। ইয়ে কৌন বে?
বিড্ডু আস্তে বলল, বাঙ্গালি। ছোটা দেওয়ানসাবকা ভাতিজা।
পান্না পেশোয়ারি এসে আমার চিবুক ধরে বলল, ওয়াহ! ওয়াহ! (বাঃ বাঃ)
ঝটপট সরে এলাম। প্রহরীদের একজন মুচকি হেসে বলল, কৈ পিরসাহাবা আওলাদ (পুত্র) হুজুর! বঙ্গাল মুল্লুককা বড়া পির, শুনা!
পান্না পেশোয়ারি সুরমাটানা কুতকুতে চোখে আমাকে দেখতে-দেখতে বলল, তো তুমি পিরসাহাবকা আওলাদ ঔর ছোটা দেওয়ানসাহাবকা ভাতিজা। ঠিক হয়! চলোমেরা সাথ ঘুমনো চলল! এ বিড্ডু তু ভি আ যা।
আমি চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছি, বিড্ডু ইশারায় আমাকে দৌড়ে পালাতে বলছে, পান্না পেশোয়ারি ফের আমার চিবুক ধরতে এল!…কী? হামার কোথা সমঝাতে পারছ না? হাম হোড়া-থোড়া বাঙলা বোলে। বোলো, কী বোলবে, বোলো! মেঠাই খাবে? তো এসো, হামার সোঙ্গে এসো।
আবার পিছিয়ে গেলাম। বিড়ু হনহন করে চলে গেল রাস্তার দিকে। সেই সময় কোত্থেকে এসে পড়ল চুল্লু পাঠান। বলল, কা হুয়া পান্নাসাব? ঝামেলা মাত করো! মুশকিল হো যায়ে গা।
পান্না পেশোয়ারি বাঁকা হাসল ।…হাঁ বে চুল্লু! মুশকিল তো হরঘড়ি হোতা। তেরা ছোটিভাবিভি বলি কী, চুল্লু বাহাদুর মর্দ হো গেয়া– মুশকিল হো যায় গা। তো ঠিক হ্যায়।
সে টলতে-টলতে দেউড়ির ভেতর দিয়ে কেল্লাবাড়ির ভেতর ঢুকে গেল। চুমু একটু দাঁড়িয়ে থাকার পর ফোঁস করে শ্বাস ছেড়ে বলল, শফিসাব, চলিয়ে মেরা সাথ।
বললাম, কোথায়?
চুল্লু হাসল ।… জানিবাবার মাজারে উরসশরিফের মেলায় যাচ্ছি আমি। ওইখান থেকে দেখলাম কী, শয়তান পান্নাসাব আপনাদের সঙ্গে কোথা বলছে। খবরদার! উও জাহান্নামি যোখন সামনে আসবে, দেখকে দূরে চলে যাবেন। ওই দেখুন, বিজ্ঞসাব কোথাতে চলে গেসে।
