সাইদার কাছে খবর হয়েছিল, যে খবর হাওয়ার আগে ছোটে, হুজুর পিরসাহেব তাঁর মায়ের কবর জেয়ারত করে দুই ছেলের কাঁধে হাত রেখে রওনা হয়েছেন। কিন্তু ওই একটুখানি দূরত্ব অতিক্রম করতে কী সময় যে লেগে গেল! বারান্দায় রুকু ঘোমটা টেনে দাঁড়িয়ে ছিল। তার কাছ ঘেঁসে দেয়ালে সেঁটে আয়মনি, নুরির মা, আর নুরি। সাইদা যেই শুনতে পেলেন সদর দরজায় বরাবর শোনা সেই পবিত্র দোয়াদরুদ উচ্চারণ, অমনি গম্ভীর শান্ত কণ্ঠস্বরটি তাঁকে বিপন্ন করল বুঝি। শরমের মাথা খেয়ে সাইদা তাঁর ঘরে ঢুকে সশব্দে দরজা বন্ধ করে দিলেন। বারান্দায় চারটি মেয়ে ভ্যাবাচ্যাকা খেল। রুকু বন্ধ দরজার দিতে তাকিয়ে রইল। আর বদিউজ্জামান। উঠোনে দাঁড়িয়ে সাইদার সংসার দেখছিলেন। চাঁদের আলোয় নুরুজ্জামান পিতাকে দেখাচ্ছিল সরকিছু। গোয়ালঘর, কুয়ো, রান্নাঘর, টাট্টিখানা, বড় তিন কামরা মাটির ঘরের খড়ের চাল, উঠোনপ্রান্তের গাছগাছালি। মনিরুজ্জামান তার ছড়িতে ভর করে। দাঁড়িয়ে খালি দুলছিল আর দুলছিল। জ্যোৎস্নায় তার দাঁত চকচক করছিল। নুরুজ্জামান মায়ের ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করাটা লক্ষ করেনি। করেছিলেন বদিউজ্জামান। অস্বস্তি বোধ করেছিলেন।
কী-একটা আশঙ্কা করে এবং শরমে আয়মনি, নুরি, ও তার মা হালকা পায়ে খিড়কির দরজা খুলে বেরিয়ে গেল। বদিউজ্জামান বারান্দায় রুকুর উদ্দেশে যখন আস্তে বললেন, কে –তখন রুকু ঝটপট নেমে এসে শ্বশুরের পদচুম্বন করল। আর মনিরুজ্জামান গোঙানো কণ্ঠস্বরে আম্মাকে ডাকতে থাকল।…
১২. কানা ঘোড়ার সওয়ার
…পান্না পেশোয়ারিকে ইট মেরে জখম করে শহর থেকে পালিয়ে গিয়েছিলাম। বারিচাচাজি বললেন, ‘লালবাগ ইজ দা টাউন অব দা ডেডস’–মৃতদের শহর, আর সেই মৃতদের শহরে শয়তানের প্রতিনিধি ছিল পান্না পেশোয়ারি। এই লোকটাকে দেখলেই সবরকমের লোক সেলাম ঠুকে বলত, আদাব পান্নাসাব! তাগড়াই চেহারা, ফিনফিনে মলমলের কোর্তার ওপর কালো ভেলভেটের জরিদার শলুকা বা সরি, কোমরবন্ধে গোঁজা বাঁকা খাপে চাকা ছোরা, মাথায় পাগড়ি, পায়ে নকশাদার লাল নাগরা পরে পান্না পেশোয়ারি বিকেলে ছড়িহাতে গঙ্গার ধারে ঘুরে বেড়াত। নবাব বাহাদুর ইন্সটিটিউশনে আমার সহপাঠী বিড়, যে ছিল নবারি খানদানের ছেলে, আমাকে বলেছিল, পান্নাবকো সবকোই সালাম দেতা, লেকিন হম নেহি। কাহে কী, আই বিলং টু দা নবাব ফ্যামিলি। বাট ইউ মাস্ট শফি, ভুলো মাত, হি ইজ আ ডেনজারাস ম্যান– খুদ শয়তান উসকো গার্ড দে রহা।
এই কথাটাও পান্না পেশোয়ারির প্রতি আমার রাগের কারণ হতে পারে। ‘মৃতদের শহরটা প্রচণ্ড ভিড়ে ভরা দিনমান। সন্ধ্যার পর থেকেই তার চেহারা কবরখানার। কেল্লাবাড়ি, যার পোশাকি নাম ছিল নিজামত কেল্লা, প্রায় এক বর্গমাইল জুড়ে উঁচু পাঁচিলে ঘেরা। তিনদিকে তিনটে প্রকাণ্ড দেউড়ি, একদিকে গঙ্গা। কেল্লাবাড়ির ভেতর নবাববাহাদুরের মোতিমহল, তার পিছনদিকটা জুড়ে ধ্বংসস্তূপ আর জঙ্গল। তার ভেতর জরাজীর্ণ সব একতালা খোপড়িঘর। আর উঁচু পাঁচিলটা ছিল অনেক জায়গায় টুটাফাটা। ভেতরে বাস করত নবাব-খানদানের অসংখ্য লোক। বিড্ডু তাদেরই একজনের ছেলে। গদ্দিনশিন নবাববাহাদুর-পরিবারের লোকেরা তাদের সঙ্গে রক্তের সম্পর্ক অস্বীকার করতেন। ওঁরা থাকতেন মোতিমহলে। এদিকে নহবতখানার ফটকের পেছনে ভেঙেপড়া কয়েকটা বাড়ি। তার ওপাশে কেল্লাবাড়ির পাঁচিল ঘেঁসে সারবন্দি ঘুপচিঘর। সেই ঘরগুলোতে থাকত বাতিল চাকর-নফরদের পরিবার। সাতমার কাল্লু পাঠান কেল্লাবাড়ির ভেতর পিলখানা বা হাতিশালায় যে ঘর পেয়েছিল, সেটা ছেড়ে চলে আসার কারণ, বিড্ডুর মতে, তার দুসরি বহু সিতারা। আর এটাই আশ্চর্য সিতারা ছিল কেল্লা বাড়ির অস্বীকৃত ‘নবাব’দের মেয়ে, তার বাবা আতা বেগ ছিলেন রোশন মহল্লার এক দরজি। দরজিগিরি করলেও লোকে। তাঁকে বলত আনবাব। বিড্ডু বলত, কেল্লাবাড়ির বান্দা-বাঁদিদের বংশও নিজেদের নবাব বলে চালায়, আর উজবুক শহরের লোক সেটা বিনা প্রশ্নে মেনে নিয়েছে। কিন্তু পরে বারিচাচাজি বলেছিলেন, কাল্লুর ছোটোবউ সিতারা বিন্দুর এক চাচির (কাকিমা) মেয়ে। আর তখন থেকেই সিতারার দিকে আমার চোখ যায়।
নহবতখানার কাছে সারবন্দি একতালা ঘরের একটা জবরদখল করেছিল কাল্লু পাঠান। সেই ঘরটাতে থাকত এক বুড়ি, ইসমাইল কোচোয়ানের মা। ইসমাইল তার মাকে বাঁচাতে পারেনি, তার কারণ নাকি পান্না পেশোয়ারি। ইসমাইল থাকত রোশনিমহল্লার বস্তিতে। মাকে অগত্যা সেখানে নিয়ে যায়। আর তারপর থেকে পান্নাসাবেরও চোখ পড়ে সিতারার দিকে।
এসব কথা বিড্ডুর কাছে শোনা। বিড্ডুর আসল নাম ছিল মির্জা আরিফ বেগ। লম্বা, ছিপছিপে, ফরসা এই ছেলেটি আমাকে পাত্তা দিত। কাল্লুর ছোটো ভাই চুরু ছিল পিলখানার এক নোকর। চুল্লুর সঙ্গে বিছুই আমার পরিচয় করিয়ে দেয় ‘পিরসাহেবের ছেলে’ বলে এবং দুর্ধর্ষ চুলুই ছিল একমাত্র লোক, যে পান্নাসাবের থোড়াই পরোয়া করে। ফলে চুল্লুকে আমার ভালো লেগে যায়। বিড্ডু তার কাছে লুকিয়ে গাঁজার ছিলিম টানতে যেত। আমিও চুম্বুরই কথায় ছিলিম টানি। সারারাত পড়ে থাকি চুল্লুর ঘরে। ভাগ্যিস তখন বারিচাচাজি কোনো মহালে গিয়েছিলেন, আর তখন শীতকাল, ফসল ওঠার মরশুম, খাজনা আদায়ের তাগিদ তখন থেকেই শুরু হয়। মৃতদের শহরটা প্রথম দিন থেকেই খুব রহস্যে ভরা মনে হয়েছিল বলে রহস্য ফর্দাফাই করার জন্য সেটাই ছিল আমার সুসময়। বিড্ডুর সঙ্গে টো-টো-করে ঘুরতাম দিনে রাতে। স্কুলটাতে তত কড়াকড়ি ছিল না। কারণ বেশিরভাগ ছাত্ৰই নবারি খানদানের আর বাদবাকি সব নবাববাহাদুরের কর্মচারীদের সন্তান। ইংরেজির ওপরই বেশি ঝোঁক ছিল, তাই স্কুলে যাওয়াটা আমার পক্ষে ছিল ভারি অস্বস্তিকর। শিক্ষকদের মধ্যে অনেকেই অ্যাংলো-ইনডিয়ান। একজন মেমসায়েবও ছিলেন, আলাদা ঘরে বোরখাপরা মেয়েদের ইংরেজি পড়াতেন। সেই প্রথম গোরাসায়েব এবং, মেমসায়ের দেখেছিলাম। তাঁদের মনে হত কথাবলা আজব রঙিন পুতুল। দুজন হিন্দু শিক্ষক, প্রচণ্ড বুড়োমানুষ, বাঙলা পড়াতেন। তাঁদের ক্লাসে বেশিরভাগই বাঙালি কর্মচারীদের ছেলেরা এবং মুসলিম ছাত্র মোটে কয়েকজন, আমিও। তবে প্রতাপশালী শিক্ষক বলতে আরবি-ফারসি-উরদুর মৌলবিসাহেবরা। কোনো–এক পিরসায়েবের ছেলে বাঙলা পড়ে, এটা তাঁদের কাছে বেজায় বেশরিয়তি, তাই আমাকে দেখলে তাঁরা মুখ ঘোরাতেন। কোন সুনির্দিষ্ট কারিকুলামহীন, খেয়ালখুশিমাফিক পড়াশোনার এই প্রাইভেট স্কুলে তবু ক্লাস, পরীক্ষা এসব ব্যাপার ছিল এবং ছাত্ররা কেউ ফেল করত না। আমিও ফেল করিনি।
