আয়মনির কথা শুনে রোজি বলল, তুমি বিবিজিকে বলে যাও আয়মনিখালা! উনি না বললে যাব কেমন করে? আর শোনো, তুমি এসে নিয়ে যাবে– তবে যাব বলে দিচ্ছি, হ্যাঁ।
আয়মনি একটু হেসে সাইদাবেগমের ঘরে গেল। সাইদা তাকে দেখে বললেন, কী আয়মনি! এ বাড়ি আসা যে ছেড়েই দিয়েছ?
আয়মনি সে-কথা কানে করল না। চৌকাঠের কাছে দাঁড়িয়ে কপালে হাত ঠেকিয়ে আদাব জানিয়ে বলল, দরিবুবু রোজি-রুকুকে সনজেবেলা একবার ডেকেছে। আমি সঙ্গে করে নিয়ে যাব –তাই বলতে এলাম বিবিজি!
সাইদা একটু হাসলেন। বেশ তো, যাবে, বলে শাশুড়ির বুক ডলে দেওয়ার কাজটা থামিয়ে মুখ তুললেন। নুরু বলছিল, সকালে তাকেও ডেকেছিল বেয়ান। কীসব ঝামেলা হচ্ছে উঁইখেত নিয়ে। তো নুরু বলল, ভুইখেতের আমি কী বুঝি? তবে শাশুড়ি বলছেন যখন, তখন বরঞ্চ
আয়মনি কথার ওপর বলল, হুঁ –তাও বলল দরিবুবু। আমি বলি কী বিবিজি, আপনার বড়ো ছেলে বরঞ্চ দরিবুবুর মাথার ওপর গিয়ে দাঁড়াক। মৌলবি হয়েছে বলে দুনিয়াদারি করতে নাইকো?
স্বামীর কথাগুলো মনে প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল। সাইদার।…ইসলাম যেমন দুনিয়াদারি করতে বলছে মানুষকে, তেমনি আখেরাতের কাজও করতে বলেছে। তাই যে মুসলমান পাঁচ ওয়াক্ত নমাজে বসে দুহাত তুলে মোনাজাত করে, সেই মোনাজাতের। মানে হল : ‘হে খোদা! আমাকে ইহকাল-পরকালের শ্রেষ্ঠ জিনিসগুলো দান করো।’
ইসলাম দুনিয়াদারিও চায়। দুনিয়ার সেরা জিনিসগুলোও ভোগ করতে চায়। বদিউজ্জামান পরক্ষণে হাসতে-হাসতে বললেন, তবে আমার যেন দুনিয়াদারি সয় না। বড়ো ঝকমারি লাগে।
সাইদা বললেন, হ্যাঁ– নুরু বলছিল, এবার থেকে শাশুড়ির বিষয়-সম্পত্তির দেখাশোনা করতে হবে। মৌলাহাটওয়ালা ফরাজি হয়েছে। মনটা তো রাতারাতি বদলায় না।
আপনার মাথা খারাপ, বিবিজি? আয়মনি বলল। তার কণ্ঠস্বরে ঝাঁঝ ছিল। মুখে সব আল্লা আমিন করছে, এদিকে ভেতর-ভেতর যা ছিল তাই। লোকদেখানো ভড়ং। এখন পিরসায়েব সফরে বেরিয়েছেন। গিয়ে দেখে আসুন গে, রাস্তায়-রাস্তায় মাঠে-ঘাটে আবার মেয়েলোকগুলো বেশরম ঘুরছে।
পেছন থেকে রোজি বলে উঠল, তুমিও বুঝি বেপরদা হয়ে ঘোর না আয়মনিখালা?
রোজি হাসছিল। আয়মনি বিব্রতভাবে কী বলতে যাচ্ছিল, সাইদা মৃদু ভসনার ভঙ্গতে বললেন, ছি বউবিবি! আয়মনি বড়ো ভালো মেয়ে। আর বেপরদা হয়ে ঘোরে তো কী হয়েছে? চাষিবাড়ির বউঝিরা পরদা করে বসে থাকলে সংসার চলবে?
রোজি হাসতে-হাসতে সরে গেল। আয়মনি পিরজননীর হালহকিকতের খবর নিয়ে রুকুর কাছে গেল। উঁকি মেরে দেখেও নিল, ঘরের ভেতর বিছানায় বসে ন্যালা দামদমিয়াঁটি ঠ্যাঙ দোলাচ্ছে। আয়মনি রুকুর কাছে দাঁড়ালে রুকু একবার নির্লিপ্ত মুখ তুলে তাকে দেখে নিল। তারপর লাল সুতোয় পদ্মফুল তৈরি করতে ব্যস্ত হল। আয়মনি একটা শ্বাস ছেড়ে আস্তে বলল, আসি রুকু। সনজেবেলা এসে তোমাদের নিয়ে যাব।–
.
হেমন্তসন্ধ্যায় এদিন আকাশে ঝলমলিয়ে চাঁদ উঠেছে। অলিগলি রাস্তা, তারপর। পুকুরপাড় দিয়ে ঘুরে আয়মনি দুবোনকে চুপচাপ নিয়ে যাচ্ছিল তাদের মায়ের কাছে।
খিড়কির দরজায় লণ্ঠন রেখে দরিয়াবানু প্রতীক্ষা করছিল। পুকুরের জল ছুঁয়ে আসা একঝলক হাওয়া হঠাৎ হিম দিয়ে চলে গেল তার বাড়ির ভেতর। কেন যেন। শিউরে উঠল দয়াবানু। চাঁদের আলোয় আবছা তিনটি মূর্তি সামনে দেখেও দরিয়াবানু চুপ।
আয়মনি বলল, কী হল দরিবুবু?
দরিয়াবান লণ্ঠনটি তুলল। দুই মেয়েকে দেখল। তারপর বলল, আয়।
বারান্দায় লক্ষ্যের আলোয় বসে মাহিন্দার বরকত গায়ে তেল মাখছে। শোবার আগে এই কাজটা সে করে। উঠোনে দুটো ধানের মরাই। তার ওপাশে দেয়াল ঘেঁষে। হাঁসমুরগির দরমা। পেছনে গোয়ালঘর। এ বাড়ির চাল টিনের। মেঝেয় লাইমকংক্রিটের ওপর লাল পলেস্তারা। দুই বোনই লক্ষ করল, পলেস্তারা চটে গেছে অনেক জায়গায়। ঘরে ঢুকে লণ্ঠনটি রেখে দরিয়াবানু হঠাৎ রুকুকেই বুকে চেপে ধরে ফুঁপিয়ে-ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। রোজি আর আয়মমি একটু অবাক।
একটু পরে চোখ মুছে রুকুকে, তারপর রোজিকে টেনে পাশে বসাল দরিয়াবানু। আয়মনি চৌকাঠের কাছে বসল কপাটে হেলান দিয়ে। দরিয়াবানু ধরা গলায় বললেন, দুপুরবেলা হঠাৎ দেওয়ানসায়েব এসেছিল ঘোড়ায় চেপে।
রোজি চমকখাওয়া স্বরে বলল, বারিচাচাজি?
দরিয়াবানু তার থান কাপড়ের আঁচল খুঁটতে-খুঁটতে মুখ নামিয়ে বলল, আবার কাজিয়া করে গেল। বললে কী, একটা ছেলের জিন্দেগি আমি নষ্ট করে দিয়েছি। এটার ছাস্তি আমাকে না দিয়ে ছাড়বে না। চাষার বেটি, মুরুক্ষু হারামজাদি বলে একশো গালমন্দ!
রোজি খাপ্পা হয়ে বলল, তুমি কিছু বললে না?
দরিয়াবানু শ্বাসপ্রশ্বাসের সঙ্গে বলল, কী বলব মা? আমিই তো মেয়েটাকে আবার হু হু করে কেঁদে ফেলল সে।
রোজি বলল, মা! মা! তুমি কিছু করনি। রুকু তো ভালো আছে। মেজোমিয়াঁও ভালো হয়ে গেছে কত্তো। রুকু, তুই বল না মাকে। চুপ করে আছিস কেন?
রুকু চুপ। আয়মনি একটু হেসে বলল, ছাড়ো তো দরিবুবু! দেওয়ানসাহেব লবাববাহাদুরের লোক– লববাহাদুর তো লয়কো যে তাকে এত ডর? কী ক্ষেতি সে করতে পারে? ভুইখেত যা-কিছু, সবই তো তোমার লিজের নামে কেনা। তুমার বিটিজামাইরাই তা ভোগ করবে।
দরিয়াবাবু রুকুর দিকে ঘুরল। আবার তাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগল। তব রুকু চুপ। রোজি আর আয়মনিও।
