কিছুক্ষণ পরে শান্ত হয়ে আবার চোখ মুছে দরিয়াবানু উঠে দাঁড়াল। আস্তে বলল, খইয়ের লাডু বানিয়ে রেখেছি। পাঠাইনি। আপন হাতে খাওয়াব বলে।
সিকেয় ঝুলন্ত হাঁড়ি নামিয়ে সেটি নিয়ে এল দরিয়াবানু। একটা নাড়ু রুকুর, আরেকটা রোজির মুখে গুঁজে দিল। আয়মনিকে বলল; বারান্ডায় কলসিতে পানি আছে। ওই দ্যাখ কাঁসার গেলাস। পানি নিয়ে আয় তত বহিন!
আয়মনি ব্যস্তভাবে আদেশ পালন করতে গেল। দরিয়াবানু বলল, সকালে নুরুকে ডেকেছিলাম। বললাম, আমার তো আর কেউ নাইকো বাপজান তুমরা ছাড়া। পিরসাহেব দুনিয়াদারির ধার ধারেন না। কিন্তুক তুমাকে ভিনরাস্তায় হাঁটতে হবে– নইলে জো নাইকো। নুরু বলল, তার আপিত্য নাইকো। বললে পরে এবাড়ি এসেই থাকবে।
রোজি বলল, বিবিজির তবিয়ত ভালো না। দাদিশাশুড়িরও এখন-তখন অবস্থা। আমরা এলে চলবে?
দরিয়াবানু রুকুর দিকে তাকিয়ে বলল, রুকু তো আছে।
বলে সে রুকুর মাথায় হাত বুলোতে থাকল। রুকু লাড়ু চিবুচ্ছিল। তেমনি নিপ। আয়মনি দু’ গেলাস জল খাটের পাশে প্রকাণ্ড সিন্দুকটার ওপর রেখে বলল, খুব ভালো কথা বুলেছ দরিবুবু। ইটা একটা কাজের কথা বটে।
দরিয়াবানু রুকুর উদ্দেশে বলল, দেল (হৃদয়) শক্ত করো, বেটি! এই যে আমাকে দেখছ– আমি কী করে সংসার সামলেছি। তোমার আব্বাজান কী করে বেড়াত, মনে করে দ্যাখো। সেইসব কথা ভেবে বড়ো হও। বরাত বেটি! আমারই ভুলে তোর এই কষ্ট।
রোজি বলল, কিসের কষ্ট? ও কিছু না।
দরিয়াবানু ভাঙা গলায় বলল, সব কানে আসে! গাঁয়ের লোক কত হাসাহাসি করে। লোকু ছড়াদার সঙের গান বেঁধেছে। কুচ্ছোর শেষ নাইকো আমার নামে! রাগে দুঃখে ঘেন্নায় ছাতি ফেটে যায় রে!….
.
রোজির তাড়ায় বেরুনো গেল। বেশ রাত্তির হয়ে গেছে। হাঁড়ির নাডু বয়ে নিয়ে গেল আয়মনি। এবার তার হাতে দরিয়াবানুর লণ্ঠন। পুকুরপাড় থেকে চাঁদের আলোয় খিড়কির ধারে দাঁড়ানো মায়ের আবছা মূতিটা চোখে পড়ছিল দু’বোনের। রুকু বার-বার ঘুরে দেখছিল। মায়ের এই চেহারা সে কোনো দিন দ্যাখেনি। তাছাড়া মায়ের শরীর থেকে কী যেন একটা গন্ধ তীব্র হয়ে তাকে অনুসরণ করছিল। তার মা কি আতর মেখেছে?
সে রাতে রুকু ঘুমোতে পারছিল না। মায়ের শরীরের সেই অদ্ভুত গন্ধটার কথা ভাবছিল। পাশের জম্ভমানুষটি এ রাতে তার বউকে জ্বালাতন করেনি। কোবরেজের বড়ি নিজেই চেয়ে নিয়ে খেয়ে বেঘোরে ঘুমোচ্ছ। মাঝরাতে হিমটা আরও ঘন হল। সেই হিম বুকুকে ধীরে ঘুমের দিকে টেনে নিয়ে গেল। ঘ্রাণটাও হারিয়ে গেল।
আর সেই ঘুম ভোরবেলা ভেঙে গেল রুকুর। রোজির কোরানপাঠের সুর শুনে নয়, কী একটা প্রচণ্ড চেঁচামেচিতে। নুরি কান্নাকাটি করে কী একটা বলছে শুনতে পেল। বেরিয়ে যেতেই নুরি হাহাকার করে বলে উঠল, ওরে বেটিরা! তোদের কপাল ভেঙেছে রে! তোদের মা ডুমুরগাছে গলায় দড়ি দিয়ে ঝুলছে রে!
রুকু একপলক শুধু দেখল রোজিকে খিড়কি দিয়ে বেরিয়ে যেতে। কিন্তু সে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। হঠাৎ তার মনে পড়ে গিয়েছিল, কাল জোৎস্নারাতে পুকুরপাড়ে ডুমুর গাছটার পাশ দিয়ে আসার সময় কী একটা ঘ্রাণ পেয়েছিল, বুঝতে পারেনি। এখন বুঝল, সে ছিল তার মায়ের গায়ের ঝাঝালো ঘ্রাণ– মৃত্যুর ঘ্রাণ ।…
১১. সব পাখি ঘরে ফেরে
বদিউজ্জামান শুধু বলেছিলেন, আমি সবই জানতাম। আর এই থেকে গুজব ছড়িয়ে পড়ে, মধ্যরাতে দরিয়াবান যখন ডুমুরগাছে ঝুলতে যাচ্ছে, তখন পিরসাহেবের অনুগত এক জিন ছুটে এসে খবর দিয়েছিল। জিনটি বলেছিল, আত্মহত্যাকারীদের প্রতি খোদার লানৎ (অভিশাপ)! পিরসাহেবের সঙ্গে জিনটির তুমুল তর্কাতর্কি হয়ে যায়। পিরসাহেবের মতে, আল্লাহ দোজখের একাংশ খালি রেখেছেন আত্মহত্যাকারীদের জন্য। কাজেই আল্লাহের ইচ্ছা পূর্ণ হোক। ক্ষুব্ধ জিনটি পরে আলোর বেগে অকুস্থলে পৌঁছেও দরিয়াবানুকে আটকাতে পারেনি। সে স্তম্ভিত হয়ে দেখে, ডুমুরগাছটিকে পাহারা দিচ্ছে একদল কালো জিন। সেই জ্যোৎস্নারাতে একটা কালো দেয়ালের ভেতর নাদান এক স্ত্রীমানুষের মৃত্যু হচ্ছিল। ব্যথিত জিন ফিরে এসে পিরসাহেবকে ধ্যানস্থ দেখতে পায় এবং আসমানের দ্বিতীয় স্তরে নিজের দেশে চলে যায়। আর সে কোনোদিন ভুলেও পৃথিবীর মাটিতে পা রাখেনি।
জিনটির সঙ্গে বদিউজ্জমানের তর্কাতর্কি শুনেছিল মসজিদ-সংলগ্ন একটি বাড়ির বুড়ো-বুড়িরা। তারা জোগই রাত কাটায়। তাই সাক্ষ্য দিয়েছিল, পিরসাহেব। বেয়ানের মরতে যাওয়ার কথা জানতে পেরেছিলেন। জিনটি চলে যাওয়ার সময়। নিমগাছে আলোর ঝলকও দেখেছিল তারা। সাংঘাতিক কিছু ঘটতে চলেছে ভেবে তারা ভোরের প্রতীক্ষায় রাত কাটাচ্ছিল।
সকালে মৌলাহাট থেকে খবর এলে হুলুস্থুল পড়ে যায়। পিরসাহেবের বেয়ানের অত্যভুত মরণঝাপের একটা উপযুক্ত ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা চলে। তবে বদিউজ্জামান। ভারী একটা শ্বাসের সঙ্গে শুধু এই বাক্যটি উচ্চারণ করেন, আমি সবই জানতাম।
ইসলামে আত্মহত্যাকারীদের ক্ষমা নেই এবং নিশ্চিত অনন্ত দোজখ। আসলে শয়তান তার কালো জিনের বাহিনী নিয়ে যখন কাউকে ঘিরে দাঁড়ায়, তখন কিছু কিছু ক্ষেত্রে তার জয়লাভ ঐশী নিয়মের অধীন। নইলে আল্লাহ যে হাবিয়া থেকে জাহান্নাম পর্যন্ত পর্যায়ক্রমে বড়ো থেকে ছোটো সাতটি দোজখ প্রস্তুত রেখেছেন, তা পূর্ণ হবে কেমন করে? :
