রোজি হাসতে লাগল।….কথা শোনো মিয়াঁর! তুমি না খেলে আমরা খাব? গোনা হবে জান না? কত্তো বেলা হয়ে গেল! খিদে পায়নি বুঝি আমাদের? নাও– নাও! ও রুকু, পরোটা ছিঁড়ে টুকরো করে দে তোর দামদমিয়াঁকে।
মনি গোঁ ধরে বলল, টুঁ-টুঁমি ডাঁও!
তার মানে রুকুর ওপর তার রাগ এখনও পড়েনি। ভাবি তাকে খাইয়ে না দিলে সে খাবে না। রোজি হাসতে-হাসতে পরোটা টুকরো করতে থাকল।
.
এদিন থেকেই তেরো বছরের বালিকাবধূ রোজি এ সংসারে সাইদা বেগমের ঠাঁইটি দখল করে ফেলল যেন। শাশুড়ি আর দাদিশাশুড়িরও সেবাযত্ন তদারক সারাক্ষণ, কোমরে আঁচল জড়িয়ে ব্যস্ত গম্ভীর হয়ে ছুটোছুটি, নুরিকে কথায়-কথায় ধমক, কত কিছু। আর রুকু আরও উদাসীন নির্লিপ্ত। দুই যমজ বোনের মাঝখানে একটি অদৃশ্য পাঁচিল গড়ে উঠেছিল। প্রায়ই শিষ্যবাড়ি থেকে ধানচাল, বিবিধ খন্দ, গুড়ের হাঁড়ি এসে পৌঁছয়। কত দূর-দূরান্তর থেকে শিষ্যরা গোরুর গাড়ি বা টাটু ঘোড়ার পিঠে চাপিয়ে, নয়তো নিজেরাই বয়ে আনে হরেক গুরুপ্রণামী। সাইদার মতো আড়াল থেকে দাঁড়িয়ে নেপথ্যের কণ্ঠস্বরে রোজি নির্দেশ দেয়, কোথায়। জিনিসগুলো রাখতে হবে। নুরুজ্জামান বাড়িতে থাকলেও এই খবরদারি রোজির। রুকু লক্ষ্য করে, রোজির মধ্যে তার মায়ের আদল ফুটে বেরুচ্ছে। প্রচ্ছন্ন ঈর্ষা তাকে। খুব ভেতর থেকে তাতিয়ে দেয়। ভাবে, যদি সে ‘জ্যুমানুষটা’র বউ না হত, তাহলে সংসারে কর্তৃত্বের ন্যায্য শরিকানাটি দখল করত সেও হয়তো কোমরে আঁচল জড়াত। কিন্তু কী দরকার অত ঝামেলায় নাক গলিয়ে? বেশ তো আছে।
না–সত্যিই সে ভালো নেই। যখন-তখন একটা জ্যুমানুষের কামার্ত আক্রমণ, এমন-কি রজস্বলা অবস্থাতেও রেহাই নেই। চোখ বুজে দাঁতে দাঁত চেপে রুকু তার অবশ শরীর রেখে পালিয়ে যায়– পালাতেই থাকে, দূরে-বহুদূরে। কিন্তু কোথায় যাবে? কার কাছেই বা তার এই মানসিক সফর? খালি মনে হয়, খোঁড়াপিরের দরগায় ভাঙা ফটকে কাঠমল্লিকার ফুলবতী গাছের কাছে উলটো মুখে দাঁড়িয়ে আছে কেউ। ভয় পেয়ে পিছু হটে ফিরে আসে নিজের। বেইজ্জত শরীরের ভেতর ঘৃণা, ঘৃণা আর ঘৃণা! নিজের ওপর, সবকিছুর ওপর।….।
অনেকদিন পরে আয়মনি এল খিড়কির দরজা দিয়ে। রোজি কুয়োতলার পাশে বিকেলের রোদে দাঁড়িয়ে চুল আঁচড়াচ্ছিল। রুকু বারান্দায় সুজনি সেলাই করছিল। কদিন থেকে ওই নিয়ে লেগে আছে। কদিন থেকে কামরুন্নিসার বুকে ব্যথা-ব্যথা ভাব। তেল দিয়ে বুক ডলে দিচ্ছেন সাইদা। রোজি আয়মনিকে দেখে চোখ পাকিয়ে। বলল, সাপের পা দেখেছ, নাকি দিনে তারা দেখেছ আয়মনিখালা? যাও, যাও। অবেলায় আমরা মেহমান নিই নে!
আয়মনি একটু হাসল।…আসা হয় না মা! বাপজানের শরীল ভালো না। বলে সে রুকুর দিকে ঘুরল। বুকু, কেমন আছ মা?
রুকু আযমনিকে বলল, ভালো। সে আয়মনিকে দেখছিল। কেমন যেন নিষ্প্রভ দেখাচ্ছে ওকে। সেই সাজগোজের ঘটা আর নেই। কপালে টিকলি নেই, কোমরে রুপোর চন্দ্রহার নেই, পায়ে নেই রুপোর মল! কানের সোনার বেলকুঁড়িটা নেই।
রোজির কাছেই দাঁড়িয়ে রইল আয়মনি। এইতেও রুকুর খারাপ লাগল। ওকে দেখেই বুকের ভেতরটা দুলে উঠছিল চাপা আবেগে। কত কথা জমে আছে মনে!
রোজি হাসতে-হাসতে ছড়া কেটে বলল, ‘এসো কুটুম বসো খাটে। পা ধোওগে ডোবার ঘাটে!
আয়মনি একটু হাসল। আমি কি কুটুম? পর বই তো লই।
রোজি কপট রাগ দেখিয়ে বলল, তাহলে পরের বাড়ি এলে যে বড়ো?
এলাম একটুকুন কাজে।
আয়মনির কণ্ঠস্বরে কী একটা ছিল, রোজি আর রুকু একই সঙ্গে তার দিকে স্থির চোখে তাকাল। তারপর রোজি আস্তে বলল, কী কাজ আয়মনিখালা?
আয়মনি বলল, দরিবুবু পাঠাল। সনজেবেলা দুই বহিন একবার যেও।
দরিয়াবানু বেয়ানবাড়ি কদাচিৎ এসেছে। মেয়েদের বিয়ের পর এ অঞ্চলের প্রথা হল, বিনা আমন্ত্রণে আর অদ্ভুত বেয়ানরা পরস্পরের বাড়ি যাবে না। সাইদা সেই একবার মৌলাহাটে প্রথম পোঁছে গাড়ির ধুরিভাঙার দুর্ঘটনার দরুন দরিয়াবানুর বাড়ি উঠেছিলেন। ছিলেনও কয়েকটা দিন। কিন্তু তখনও তিনি ভাবতে পারেননি, এই চাষাঢ়ে স্বভাবের স্ত্রীলোকটি তার বেয়ান হবে। ছেলেদের বিয়ের সময়ও তিনি যাননি, যদিও বরপক্ষের সঙ্গে বাড়িতে মেয়েদেরও যাওয়ার নিয়ম। আসলে ওই বিয়েটা ছিল একটা হঠকারিতা। একটা আকস্মিক ঘটনামাত্র।
তবু যে দরিয়াবানু বেয়ানবাড়ি গায়ে চাদরমুড়ি দিয়ে কখনও এসেছে সেটা তার পক্ষেই সম্ভব। এসে ঈষৎ লজ্জা আর কুণ্ঠায় বলেছে, এখন আমি পিরসাহেবের বেয়ান। আগের মতো মাঠেঘাটে চাষবাসের তারকে বেরুতে শরম হয়,বহিন! বেয়াইসাহেবের কানে উঠলে উনিও শরমেন্দা হবেন। অথচ দেখো, বড় ক্ষেতিও হচ্ছে। মুনিশ-মাহিন্দার লুটেপুটে খাচ্ছে। সমিস্যেয় পড়েছি।
আরও কিছু সমস্যা ছিল তার স্বামীর স্থানীয় আত্মীয়দের নিয়ে। জমিজমার শরিকানা নিয়ে ঝুটঝামেলা বাধত। মৌলানা এবং ‘পির’ বদিউজ্জামান কুটুম্ব হওয়ায় গ্রামের লোক এখন দরিয়াবানুর দলে। তাই সেসব ঝামেলা বাইরে-বাইরে দেখা যায় না। এবার দরিয়াবানু তদারকের জন্য নিজে মাঠে যেতে পারে না বলে চৌধুরী আর খোনকার সায়েবর যেন আড়াল থেকে মুনিশমাহিন্দারকে প্ররোচনা দিচ্ছেন। ঠিকমতো নিড়ান দেওয়া হয় না। সেচ পড়ে না। এবার ধানের ফলন নিয়ে দরিয়াবানু ভাবনায় পড়ে গেছে।…..
