রোজি সেই কথা ভেবেই থালাটা রান্নাঘরে নিয়ে গেল। নুরু ফিরে গিয়ে অবশিষ্ট নাশতায় মন দিল। ব্যাপারটা বুঝতে পারছিল না সে। রোজির প্রতীক্ষা করতে করতে পরোটার শেষ টুকরোটা চিবুতে থাকল সে।….
ঘাটের মাথায় খিড়কির দরজার পাশেই কলাগাছগুলো বেশ ঝাঁক বেঁধে উঠেছে। রুকু সেখানে দাঁড়িয়ে আগাগোড়া ঘটনাটা দেখছে। হঠাৎ তার ইচ্ছে করছিল, ছুটে গিয়ে ওই জমানুষটাকে বাঁচায়। কিন্তু ওকে পালটা আক্রমণ করতে দেখেই থমকে গেছে। মরুক। মেরে ফেলুক ওকে বিবিজি! রুকু মনে-মনে বলছিল।
তারপর সব শান্ত হয়ে গেছে। বাড়িটা চুপ। রুকু ব্যাপারটা দেখেছে, অন্তত রোজি যেন জানতে না পারে– এই ভেবে সে কলাগাছের আড়ালে সরে এল।
কিন্তু বাড়ি ঢুকতে ইচ্ছে করছিল না তার। যদি পারত, পালিয়ে যেতে কোথাও। অন্তত একটা দিনের জন্যও যদি বাইরে কাটাতে পারত। মায়ের কাছে গেলে তো বকুনি পিটুনি দুই-ই খাবে। বাবাকে দুই বোনে শুধু দূর থেকেই জানত। মা-ই তাদের। সব। এতদিন মা তাদের শিয়রে ছিল। ইচ্ছেমতো ঘুরে বেড়াতে দিয়েছে। সেই স্বাধীনতা হঠাৎ কেড়ে নিয়ে তাদের দরদিনী মাও কেমন হিংস্র হয়ে উঠল– কেন এমন হল, রুকু আজও বুঝতে পারে না। বারিচাচাজির সঙ্গে ঝগড়াই কি এর কারণ? আরও অবাক লাগে, বারিচাচাজি আসাই ছেড়ে দিলেন মৌলাহাটে!
আর আয়মনিখালা! তারও কী হল, এবাড়ি আর আসে না। বিবিজি কি কিছু মন্দকথা বলেছেন ওকে? রুকু খুঁজে পায় না। কলাগাছের পাশে দাঁড়িয়ে রুকুর ইচ্ছে করছিল বুক ফেটে কাঁদে। কিন্তু কান্নাতেও আজকাল কী এক ভয়। সবকিছুতেই ভয়। দুনিয়াসুদ্ধ পর হয়ে গেলে যে ভয় মানুষকে পেয়ে বসে, সেই ভয় –কিংবা অন্য কোনো ভয়। সে পুকুরের ওপারে জঙ্গলের ভেতর খোঁড়াপিরের মাজারের। বটগাছটির দিকে তাকাল। মনে-মনে মাথা কুটল, পিরবাবা! আমাকে বাঁচাও। নইলে আমি হয়তো মরে যাব।
কখন রোজি নিঃশব্দে তার পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে, রুকু টের পায়নি। আস্তে একটি ডাক শুনে ভীষণ চমকে উঠল।
রোজির নাসারন্ধ্র স্ফুরিত। চোখ বড়ো। শ্বাস-প্রশ্বাসের সঙ্গে বলল, ঢঙ দেখে বাঁচিনে। কেন নিজের দামদকে খাওয়াতে অত শরম কিসের রে? খামোকা ওকে মার খাওয়ালি। গাঁসুদ্ধ রটতে দেরি হবে না জানিস? আর মায়ের কানে গেলেই হয়েছে। কী হবে বুঝতে পারছিস?
রুকু আর সামলাতে পারল না। ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল।
রোজি চাপা গলায় ধমক দিল, চুপ! চুপ মুখপুড়ি! বাইরে এসে কাঁদতে শরম হয় না? কাঁদবি তো ঘরে ঢুকে কাঁদ গে না।
নুরির গলা শোনা গেল বাড়ির ভেতর। সদর দরজা দিয়ে ঢুকেছে। এবার থালা হাঁড়িকুড়ি মাজতে আসবে ঘাটে। রোজি বোনের মুখে হাত চাপা দিয়ে ফিসফিসিয়ে উঠল, চুপ! চুপ! নুরিখালা এসেছে। কেলেংকারি হয়ে যাবে।
রুকু ঝটপট ঘাটে গিয়ে নামল। হেমন্তের শুরুতে পুকুরটা এখনও জলে ভরা। ঘন দাম জমে আছে। ঘাটের সামনেটা শুধু পরিষ্কার। রুকু মুখ হাত পা রগড়ে ধুল। এ বাড়ি খালিপায়ে থাকার রীতি নেই। তার ওপর পিরমওলানা বাড়ির বউবিবি। রুক খালি পায়ে এসেছিল। চটিজোড়া রান্নাঘরের বারান্দায়, নাকি ঘরে খুলে এসেছে, মনে পড়ল না। :
সে উঠে দাঁড়ালে রোজি চাপা স্বরে বলল, মেজোমিয়াঁ খায়নি। চল্, আমি ফের নাশতা বেড়ে দিচ্ছি। তুই নিয়ে যাবি।
রুকু গলার ভেতর বলল, কচি বাচ্চা নাকি? আর-সবে তো–
চুপ! রোজি বোনকে ধমক দিল। যা বলছি, করবি। নইলে মাকে সব বলে পাঠাব।
সে রুকুকে যেন অদৃশ্য হাতে টানতে টানতে নিয়ে গেল। রান্নাঘরে গিয়ে একটা থালায় দুটো পরোটা আর সুজির হালুয়া তুলে দিল রুকুর হাতে। বলল, তুই যা। আমি পানির গেলাস নিয়ে যাচ্ছি।
একটু ঠেলে দিলে রুকু পা বাড়াল। কামরুন্নিসা আর সাইদা চুপিচুপি কথা বলছিলেন। নাকঝাড়ার ফোঁসফোঁস শব্দ ভেসে আসছিল। নুরিকে বাসি হাঁড়ি বাসনকোসন এগিয়ে দিতে থাকল রোজি। একটা চোখ রুকুর দিকে। মেজোমিয়াঁ একটু আগে নিজের ঘরে ঢুকে গেছে। রুকু ঘরে ঢুকলে রোজি মাটির কলসি থেকে। কাঁচের গেলাসে জল ঢালতে ব্যস্ত হল।
গেলাসটা নিয়ে রাজি মুখ টিপে হেসে সোজা চলে গেল মেজোমিয়াঁর ঘরে। গিয়ে দেখল, বিছানায় বসে পা দুটো স্বাভাবিক মানুষের মতো ঝুলিয়ে একটু-একটু করে দোলাচ্ছে মনিরুজ্জামান। কিন্তু মুখটা নিচু। চোখ থেকে জল গড়াচ্ছে। লালার সঙ্গে মিশে যাচ্ছে। আর তার সামনে মাথায় ঘোমটা টেনে নাশতার থালা হাতে দাঁড়িয়ে আছে রুকু।
ন্যালা তরুণটিকে এভাবে কাঁদতে কখনও দেখেনি বোজি। মুহূর্তে তার মন নরম হয়ে গেল। আস্তে বলল, ছিঃ! কাঁদে না! আম্মা মেরেছেন, না অন্য কেউ? খান দিকি, নাশতা খান। দুনিয়ায় কার আম্মা কাকে মারেন না? এই যে আপনার শাশুড়ি– আমাদের মা –আমাদের দুবোনকে কম মারধর করেছেন?
রুকু অবাক হচ্ছিল। রোজির কণ্ঠস্বরে বুড়ি মেয়েমানুষের হাবভাব! তারপর রোজি তাকে ঠেলে দিল। বলল, যাঃ! হাতে নাশতা তুলে দে না!
তাই করতে গেলে মনি হাত নাড়ল। বুঝিয়ে দিল, খাবে না। তখন রোজি তার পাশে বসে পড়ল। কাঁধে হাত রেখে বলল, লক্ষি ভাইজান! আমি তোমার ভাবি হই। শুনবে না ভাবির কথা? তারপর হেসে উঠল সে ….এই মেয়েটাকে তুমি এখন চিনতে পারনি? বড় বদমাইশ মেয়ে। বুঝলে?
আর মনি তাদের দুজনকেই অবাক করে গোঙানো কণ্ঠস্বরে বলে উঠল, টোঁ-টোঁ-টোঁমরা খেয়েছ?
