মধু জেলে দূরের দহে বিকেল থেকে এক প্রহর রাত অব্দি ছোট্ট নৌকো নিয়ে মাছ ধরতে যেত। সে যথারীতি ফিরে এল মেহরুর কাছে-তামাক খেতে। তার নৌকোয় আমরা ফিরে গেলাম ওপারে।
কাছারিবাড়ির ভেতর ঢুকে প্রতিমুহূর্তে গা শিরশির করছিল। আমাকে দেখে কি বারিচাচাজি টের পাবেন কিছু? আমি কি ধরা পড়ে যাব? আমার চুস্ত পাজামা পানজাবিতে ঘাসের কুটো, পলিমাটির দাগ । কিন্তু দোতালার হলঘরে ঢুকলে বারি চৌধুরী বললেন, আয় শফি! কাল আমরা লালবাগ যাব ঠিক করেছি। কী? দারুণ সুখবর না? বারিচাচাজির সঙ্গে প্রফুল্লুবাবু আর বড়োগাজিও হাসতে লাগলেন।…..
১০. জ্যোৎস্নার মৃত্যুর ঘ্রাণ
নুরুজ্জামান মৌলাহাট মসজিদে তার পিতার ভূমিকা নিয়েছে কিছুদিন। কারণ বদিউজ্জামান গেছেন তিন ক্রোশ দূরের এক শিষ্য-গ্রাম শিসগাঁয়ে। নবীন মৌলানা নুরুজ্জামান তাই নমাজ-পরিচালক হয়েছে। গত জুম্মাবারের নমাজে তার খোবা পাঠে (শাস্ত্রীয় ভাষণ) মৌলাহাটের মুসল্লিদের মধ্যে ধুম পড়ে যায়। শোভানাল্লা! কী গলার আওয়াজ! কী উচ্চারণ! একেই বলে, ‘বাপকা বেটা সিপাহিকা ঘোড়া। কুছ নেহি তো হোড় হোড়া।’
ফজরের নমাজ সেরে বাড়ি ফিরে সে তার বালিকাবধূকে তখনও কোরান পাঠে ব্যাপৃত দেখেছিল। বারান্দায় পাতা জায়নামাজ বা প্রার্থনা আসনটি একটি রঙিন গালিচা। দেওবন্দমুলুক থেকে কিনে এনেছিল নুরুজ্জামান। এ মুহূর্তে মনে হল, খোদাতালার কী মহিমা! পরিস্তানের এক পরিকে মন দিয়ে অনুভব করছিল নুরুজ্জামান। কিন্তু শালীনতাবশে উঠোন থেকে সে একটু সরে কুয়োতলায় গেল। একটু কাশল। বাড়িটা যেন জনহীন। রোজির কোরান-পাঠের মৃদু ধ্বনিপুঞ্জে সারা বাড়ি পবিত্রতার মধ্যে ঝুঁদ হয়ে আছে। তার কাশির শব্দটুকু কোনো পৃথক স্পন্দন তুলল না। তিনটি ঘরের একটি দলিজ হিসাবে ব্যবহার করা হয়। সেখানেই বালিকাবধূ নিয়ে রাত্রিযাপন করে নুরুজ্জামান। মাঝের ঘরটিতে থাকে মনিরুজ্জামান আর তার বালিকাবধূ। শেষ ঘরটিতে দাদি আম্মা কামরুন্নিসা আর মা সাইদা বেগম। বাড়িতেও রোদ আসেনি। ধূসর আলোর ভেতর দরজাখোলা তিনটি ঘরের ভেতর ঘন কালো ছায়া থমথম করছে। তবু নুরুজ্জামান দেখতে গেল, সাইদা তার শাশুড়ির একাঙ্গ ডলে দিচ্ছেন। মাঝের ঘরে কিছু দেখা যাচ্ছিল না। এক মুহূর্তের জন্য নুরুজ্জামানের মাথায় এল, তার ভ্রাতৃবধূ আজও সম্ভবত কোরান পাঠ করেনি। কিছুদিন থেকে থেকে এ ব্যাপারটা চোখে পড়েছে তার। রোজ দুই বোন পাশাপাশি বসে ভোরবেলায় কোরান পাঠ করত। হঠাৎ এমন ঘটছে কেন? রোজিকে জিগ্যেস করবে দুইবোনে ঝগড়াঝাটি হয়েছে নাকি।
সেই মুহূর্তে মাঝের ঘর থেকে এলোমেলো কাপড়, খোঁপাভাঙা চুল, বেরিয়ে এল রুকু। এসেই ভাসুরসায়েবকে দেখে থমকে গেল। তারপর আবার ভেতরে ঢুকে পড়ল। ভেতর থেকে এইসময় গোঙানির মতো ভুতুড়ে হাসির শব্দ ভেসে এল। নুরুজ্জামান বিকৃতমুখে গলার ভেতর বলল, জানোয়ার!
রোজির কোরান পাঠ শেষ। কোরান বন্ধ করে সে সেই পবিত্র ঐশীগ্রন্থটিকে চুম্বন করে কপালে ঠেকাল। তারপর নকশাদার লাল রেশমি কাপড়ের আধারে ঢুকিয়ে শেষপ্রান্তের সরু চিকন দড়িটি দিয়ে জড়াল। রেহেল বা কাঠের পুস্তকাধারটিও ভাঁজ করে নিয়ে বারান্দার তাকে রাখল। গালিচাটি গুটিয়ে ঘরে নিয়ে যাবার সময় সে ঘুরে দেখতে পেল, তার স্বামী তাকে অনুসরণ করছে। একটু হাসল রোজি। তারপর নিজের ঘরে ঢুকল।
নুরুজ্জামান ঘরে ঢুকেই তক্তাপোশের বিছানায় চিত হয়ে শুয়ে পড়েছে। সে। হাসছিল না। রোজি গালিচাটি রেখে তার পাশে এসে বসে পড়ল এবং বুকের ওপর ঝুঁকে চাপা স্বরে বলল, আপনাকে এমন দেখাচ্ছে কেন গো?
নুরুজ্জামান আস্তে বলল, কিছু না।
আপনি আমার উপর গোঁসা করেছেন?
এবার নুরুজ্জামান একটু হাসল। তোমার ওপর গোঁসা করার হিম্মত কার? এইসা নেক আউরত তুম!
রোজি তার তরুণ স্বামীর দাড়িসুষ্ঠু চিবুক ধরে বলল, আবার ওই খোট্টাপনা? ওসব করবেন মসজিদে গিয়ে। আমার কাছে নয়।
নুরুজ্জামান হাসল। মুসলমানের জবান, রোজি।
রোজি কপট অভিমান দেখিয়ে বলল, তো যে-মুলুকে ছিলেন সেই মুলুক থেকে কাউকে শাদি করে আনলেই পারতেন।
নুরুজ্জামান রোজিকে বুকে জড়িয়ে ধরার চেষ্টা করলে রোজি নিজেকে ছাড়িয়ে নিল। ভ্রূ কুঞ্চিত। যেন বলতে চায়, দরজা খোলা। কেউ এসে পড়লেই কেলেংকারি হবে না বুঝি?
নুরুজ্জামান একটু চুপ করে থাকার পর বলল, একটা বাত পুছ করব রোজি!
কী?
বহিনের সাথ কি তোমার কাজিয়া হয়েছে?
মুহূর্তে রোজি একটু গম্ভীর হয়ে গেল। স্বামীর শাদা কোর্তার বোম খুঁটতে খুঁটতে মাথাটা শুধু নাড়ল।
নুরুজ্জামান বলল, তোমরা একসাথ কোরান তেলাওয়াত (পাঠ) করছ না! আলগ-আলগ থাকছ।
রোজি দরজার দিকে একবার তাকিয়ে নিয়ে ফিসফিস করে বলল, বুকুকে আটকে রখে।
নুরুজ্জামান দ্রুত উঠে এসে বসল। বলল, কে? ওই কমবখত শয়তানটা?
চুপ। বলে রোজি উঠে দাঁড়াল। কই সরুন বিছানা গুছোই। সুজনিটা ময়লা হয়েছে। কাঁচতে হবে।
নুরুজ্জামানের টুপিটা বালিশে পড়ে গিয়েছিল। সে সেটি তুলে ভাঁজ করে পকেটে ঢোকাল। তারপর উঠে দাঁড়িয়ে ক্ষুব্ধভাবে বলল, এইসা নাহি চলে গা। আমি এসব বরদাস্ত করব না।
রোজি ধমকের ভঙ্গিতে বলল, আপনি আসুন তো। কেলেংকারি যা হবার হচ্ছে, আর বাড়াবেন না।
