নুরুজ্জামান অবাক হল।…কী হচ্ছে?
রোজি জবাব দিল না। সুজনি গোটাতে ব্যস্ত হল। বাইরে সাইদার গলা শোনা গেল, বড়ো বউবিবি! একবার আসবে, মা?
রোজি সুজনি নিয়ে বেরিয়ে গেল শাশুড়ির ডাকে। সাইদা বললেন, আমার হাতে মালিশের তেল। সাজিমাটি দিয়ে না ধুলে যাবে না। ততক্ষণ তুমি নাশতার জন্য আটা মাখো। বিবিজি আজ পরোটা-হালুয়া খেতে চেয়েছেন। বয়োমে ঘি আছে দেখো গে ।
সাইদা কুয়োতলায় গেলেন। রোজি সুজনিটা বারান্দায় রেখে ডাকল, রুকু!
ভেতর থেকে আওয়াজ এল, যাই!
একটু পরে সে বেরুল। রোজি বলল, আয়, নাশতা বানাতে হবে।
দুজনে রান্নাঘরের বারান্দায় গেছে, এমন সময় নড়বড় করে চৌকাঠ ধরে বেরিয়ে এল মনিরুজ্জামান। সে এখন কোনোরকমে টলতে-টলতে হাঁটতে পারে। গত জুম্মায় বড়োভাই নুরুজ্জামান তাকে মসজিদে নিয়ে গিয়েছিল। দেওবন্দ থেকে ফিরে মনিরুজ্জমানকে মুসল্লি বানানোর জন্য লড়াই করে যাচ্ছে নুরুজ্জামান। নামাজ, দোওয়াদরুদ আবৃত্তি করা শেখাচ্ছে। জড়ানো গলায় অনেক কষ্টে দু-চারটি বাক্য উচ্চারণ করতে পারে সে, অনবরত লালা গড়ায় যার মুখে, তাকে ঐশীবাণী আবৃত্তি শেখানো সহজ নয়, নুরুজ্জামান বুঝতে পারে। তবু এইটুকু উন্নতি দেখে সে খুবই অবাক হয়ে গেছে। পিতার সঙ্গে জ্যোতির্ময় জিনেদের গোপন সম্পর্ক এখন তার বিশ্বাস্য মনে হয়।
মনিরুজ্জামানের পরনে ডোরাকাটা তহবন্দ। খালি গা। সে বারান্দায় পা বাড়ালে কুয়োতলা থেকে সাইদা প্রায় চেঁচিয়ে উঠলেন, অই! অই! অ মেজোবউবিবি দ্যাখো, দ্যাখো কোথা যাচ্ছে!
মনিরুজ্জামান গোঙানো গলায় উচ্চারণ করল, মুঁ ধোঁ-ধোঁ–
মুখ ধুবি তো ওখানেই বস। সাইদা ধমক দিলেন। বস ওখানে। পানি দিচ্ছি।
মনিরুজ্জামান গ্রাহ্য করল না। বেপরোয়া ভঙ্গিতে বারান্দার বাঁশের খুঁটি ধরে সিঁড়িতে পা রাখল। তারপর টাল সামলাতে না পেরে গড়িয়ে নিচে পড়ল। সাইদা আর্তনাদ করে দৌড়ে এলেন। নিজের ঘর থেকে নুরুজ্জামান একবার উঁকি মেরে ব্যাপারটা দেখল শুধু।
সাইদা ধরতে গেলে মনিরুজ্জামান একটা চাপা হুংকার দিল। বোঝা গেল, সে এই দুনিয়ায় পা ফেলে হাঁটার জন্য অন্যের ভরসা করতে রাজি নয়। মায়ের হাতটা সে ধাক্কা মেরে সরিয়ে দিল। তারপর হাঁচড়-পাঁচড় করে উঠে দাঁড়াল। নড়বড় করে পা ফেলে কুয়োতলার দিকে এগোতে থাকল।
রান্নাঘরের বারান্দায় আটা মাখতে মাখতে দৃশ্যটা রোজি দেখছিল। মুখ টিপে হাসছিল। আর রুকু উঠোনের দিকে পিঠ করে বসেছে পিঁড়িতে। উনুনে খুঁটে সাজাচ্ছে। এবারও ঘুরল না এদিকে। তার মুখে নির্লিপ্ততার গাঢ় ছাপ। রোজি ফিসফিস করে বলে উঠল, তোর দামাদ (বর) খেপল কেন রে? তখন কানে আসছিল, দুজনে খুব যুদ্ধ করছিলি যেন!
রুকু বলল, বেশ করছিলাম। তাতে তোর কী?
রোজি হাসল। তারপর ঠোঁট উলটে বলল, আমার আবার কী? কানে এল, তাই বলছি।
রুকু শলাইকাঠি জ্বেলে একগোছ খড়ের নুড়ি ঢোকাচ্ছিল উনুনের ভেতর সাজানো ঘুঁটের স্কুপে। বলল, চিরকাল আড়িপাতা তোর স্বভাব।
রোজি চাপা হাসতে লাগল। আব্বাসায়েব ফিরে এলে বলিস, কালো জিনটা এখনও পালায়নি তোর দামাঁদের কাছ থেকে।
রুকু ঝাঁঝালো স্বরে বলল, ভালো হবে না বলছি, রোজি!
বেশ বাবা, বেশ। তোমার দায় তুমি সামলাও। আমার কী? বলে রোজি পরোটা বেলতে থাকল। দুলতে-দুলতে কাজ করা তার স্বভাব।
সাইদা প্রতিবন্ধী পুত্রের সঙ্গ ছাড়েননি। কুয়োতলায় তাকে আগের মতো মুখ ধুইয়ে না দিলেও পাশে দাঁড়িয়ে নির্দেশ দিচ্ছিলেন। তবে তিনি মনে-মনে এখন ভারি খুশি। খোঁড়া পিরের দরগায় গোপন মানত অথবা কোবরেজমশাইয়ের ওষুধের গুণেই হোক, এতকাল পরে মনি যে হাঁটতে বা কথা বলতে পারছে, এ এক বিস্ময় তাঁর। তবে এজন্য তিনি দরিয়াবানুর কাছে ঋণীও বটে। কতবার করে বলেন, তোমার গুণ কী দিয়ে শুধব বেয়ান? রোজ কেয়ামতের দিন হাশরের ময়দানে দাঁড়িয়ে খোদাতালাকে বলব, আমি যেটুকু নেকি (পুণ্য) করেছি, তার অদ্ধেক আমার বেয়ানকে দিচ্ছি! দরিয়াবানু বলে, ওকথা বলতে নেই বেয়ান! আমি মুরুক্ষু চাষার বেটি । রাতজোরে মিয়াঁর ঘর করতে এসেছিলাম। তবে হ্যাঁ, এটুকুন জানি– কিসে কী হয়। যদি ছোটোবেলা থেকে ছেলেটাকে হাঁটাচলা শেখাতে, চেষ্টাচরিত্তির করতে– বাছার এমন দশা হত না!
কিন্তু আশ্চর্য ব্যাপার, বিয়ের পরই যেন রাতারাতি বদলে গেছে মনিরুজ্জামান। লালা গড়ালে মুছতে পারে। হাতদুখানির নুলো দশা কিছুটা ঘুচে গেছে মালিশের গুণে। নিজের হাতেই খেতে চেষ্টা করে। যেন স্বাভাবিক মানুষ হয়ে ওঠার জন্য তার আত্মার ভেতর কী এক উদ্দীপনার সঞ্চার ঘটেছে।
কিন্তু সেই উদ্দীপনাই যেন তাকে ইদানীং কেমন হিংস্র করে ফেলেছে। মুখে হাত ঢুকিয়ে উনিশবছরের এই নালা ছেলেটি আর খ্যাখ্যা করে হাসে না। পাখ পাখালি দেখে আগের মতো অবাধ খুশিতে তার চোখদুটো উজ্জ্বল হয়ে ওঠে না। বরং হুংকার দিয়ে তাড়ানোর চেষ্টা করে। গাইগোরুটির দুধ দুইয়ে দিত আয়মনি। তার হঠাৎ কি হয়েছে, পিরসাহেবের বাড়ির আনাচে-কানাচেও তাকে দেখা যায় না। আয়মনি দুধ দুইয়ে বিবিসাহেবাকে দুধভরা পেতলের পাত্রটি দিতে এলে বারান্দা থেকে মনি দুহাত নড়বড়িয়ে শিশুর মতো ছটফট করত। গোঙানো স্বরে দুধ খাওয়ার জন্য কিছু বলার চেষ্টা করত। আর আয়মনি তাকে সস্নেহে বলত, সবুর বাপাজান! একটুখানি সবুর! কাঁচা দুধ খেয়ে ছ্যারানি হবে জান না? কী যে হাসত আয়মনি এইসব কথা বলতে-বলতে! আর মনির মুখ থেকে লালা গড়াত। সে দুপাশে দুলত। হাতদুটো সামনে নাড়া দিত। পাছা ঘসটাতে-ঘসটাতে কখনও রান্নাঘরের দিকে এগোনোর তালে থাক। আয়মনি বলত, অই! অই! সাহস দেখছ ছেলের?
