হাঁ। ছোটাসাবকে লিয়ে আসল। মেহরু এঁটো মুখে বলল, বসেন হুজুর, বসেন! আমি খাওয়াটুকুন সেরে লিই! বলে সে বউকে ডাকল, ওরে! কাল্লুভাইকে তামুক সেজে দে দিকিনি!!
আসমা অমনি মাচা থেকে নেমে বলল, সাজো তুমি তামুক। আমি চললাম। আঁধার হয়ে গেল দেখছ না? রহিমা এতক্ষণ ঘর-বার করছে আমার জন্যে।
সে তার মরদকে গ্রাহ্য করল না। গজগজ করতে করতে বৈঠাটি নিয়ে জঙ্গলের ভেতর দিয়ে এগিয়ে গেল আবছাঁ আঁধারে। দু জায়গায় ঘরকন্নার ঝকমারির কথাই সে বলতে-বলতে গেল। আর তাই শুনে খ্যাখ্যা করে হেসে তার বোকাসোকা দার্শনিক মরদটি এঁটো ঠোঁটের নিচে জঙ্গুলে দাড়িতে এককুচি ভাতহ বলে উঠল, শুনো কথা কাল্লুভাই! হারামজাদির কথা শুনো।
কাল্লু অবাক হয়ে সহাস্যে বলল, আজ তুমহারা বিবি থাকল না তুমার কাছে? বাত ক্যা ভেইয়া মেহর?
মেহরু গুম হয়ে বলল, বাড়িতে আপ্তকুটুম্ব এসেছে। আমার ভাগ্নী কাচ্চাবাচ্চা লিয়ে এসেছে তো! তাদের খাওয়া-দাওয়া, মেহমানি তো করাতে হবে, না কী? তবে তামুকটা সেজে দিয়ে গেলে কী ক্ষেতি হত, বুলো কাল্লুভাই?
কানু বলল, তো ঠিক হ্যায়। আমি সেজে লিচ্ছে।
খড়ের দড়ি জড়িয়ে মেয়েদের চুলের বেণীর মতো বাঁধা একটা জিনিসের মাথায় আগুন জুগজুগ করছিল। ওটাকে ‘বিড়ে’ বলে, আমি জানি। কাল্লু জানে কোথায় তামাক আছে। সে ব্যস্তভাবে তামাক সাজতে বসলে আমি বললাম, কান্ধু! আমরা ওপারে ফিরব কী করে এবারে?
কাল্লু হাসল। রোজ য্যায়সে আনা-যানা করি, ওইসে। বৈঠিয়ে না!
খাওয়া শেষ করে তৃপ্তির ঢেকুর তুলে মেহরু নদীতে গেল জামবাটি ধুতে। ফিরে এসে সে জাঁকিয়ে মাচানে বসে কাল্লুর হাত থেকে হুঁকো টানতে টানতে খোদাতালার মেহেরবানির কথা ঘোষণা করছিল। আকাশের অবস্থা থেকে কী ডর না পেয়েছিল সে! না– সে এই নদীর সঙ্গে নিজে লড়াই করে জান বাঁচাতে পটু, এমনি অনেক লড়াই সে সারাজীবন লড়ে আসছে। কিন্তু সেজন্য তার ডর জাগেনি। যত ডর দেড়বিঘে ধানখেতটার জন্য। বুকে থোড় গজিয়ে এখন ধানগাছ ডাগরভোগর হয়েছে। জলের তলায় চলে গেলে আর শীষ গজাত না, সেই ডর। তারপর কী করত মেহরু? সেই মাঘ অব্দি প্রতীক্ষায় থাকতে হত এই মাচানের নিচে সামান্য দূরে কাঁধা’ নামে ঢালু জমিটুকু জেগে ওঠার জন্য। সেই জমিতে সে কুমড়ো কাঁকুড় আর তরমুজের বীজ পুঁতবে। খরার মাসে সেগুলো নিয়ে যাবে তার বউ হাটতলায় হাটবারে বেচতে। এইসব কথা বলার সময় লোটার প্রতি যুগপৎ ঘৃণা আর করুণা জাগছিল আমার। ঘৃণা– কারণ আসমাকে সে বউ করেছে। করুণা– কারণ তার এই বেঁচেবর্তে লড়াই। অবশেষে সে হুঁকোয় সুখটান দিয়ে কান্নুকে দিল এবং বলল, ভাবতে গেলে এ দুনিয়াদারি এক ঝকমারি বটে হে, কাল্লুভাই! মাঝে মাঝে ইচ্ছে করে, লাথি মেরে ফেলে ফকিরি লিই!
তারপর সে গুনগুন করে গান গাইতে লাগল। কান্নু বলল, গলা ফাড়কে গাও ভেইয়া! তুমি তো বহত ওস্তাদ নোক আছ! গাহনা করো– ছোটোসাবকে শুনাও!
মেহরু এত সুন্দর গাইতে জানে! তখন চারদিক নিঝুম আঁধার। কুঁড়ের ভেতর রেড়ির তেলের পিদিমটি জ্বলছে এবং পোকামাকড়েরা আত্মহত্যায় লিপ্ত। নদীর দিকে আবছা ছলচ্ছল একটা শব্দ শুধু। শরৎ-ঋতুর আকাশে ঝকমক করছে নক্ষত্রের ঝালর। দূরে একটু আগে যে শেয়ালগুলো ডাকছিল, তারা হঠাৎ থেমে গেছে। মেহরু কানে একটা হাত রেখে তান দিল, আহা রে-এ-এ….তা-না-না-না….
‘ভেবো না ভেবো না বিফলো ভাবনা/ভাবিলে যাবে না দূরে—’
কাল্লু পাঠান সমের মাথায় বলে উঠল, বহত আচ্ছা! মেহরু চেরা গলায় গাইতে লাগল। নদীতীরের এই সংগীতধ্বনি প্রতিধ্বনিত হয়ে দূর-সুদূর ছাড়িয়ে যেতে থাকল। ওপারে কাছারিবাড়ির দোতলায় আলো জ্বলছিল। সেই আলোকে ছুঁয়ে মেহেরুর গান মেঠো দার্শনিকতাকে বয়ে নিয়ে চলল কোথায়– যেন বা ওই নক্ষত্রপুঞ্জের দিকে, ওই লম্বাটে ছায়াপথের সীমানায়! আর আমি দেখলাম, কী বিশাল ওই আকাশ, কত জ্যোতির্ময়তা! তার কাছে কতটুকু এই মানুষের ভাবনা! মেহরুর ভাবনা! আমার ভাবনা আর এই মেহরুর যুবতী বউয়ের শরীর থেকে প্রতিশোধের ছুতোয় আমি যে শান্তি সংগ্রহে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলাম, তারই বা মূল্য কতটুকু? ছি ছি এ আমি কী করলাম– কেন করে ফেললাম এ পাপ? অন্ধকারে আমার দুচোখ ভিজে যাচ্ছিল –জানি তা মেহরুর গানের বিষাদজনিত সংক্রমণে নয়, পাপবোধে।
না –ওই বয়সে ঠিক এমন করে সাজিয়ে-গুছিয়ে কিছু ভাববার ক্ষমতা ছিল না, কিন্তু অনুভূতি ছিল। বোধ ছিল। নিজের ওপর দুঃখে করুণায় আমার কান্না পাচ্ছিল। আমার যে-শরীরে নাকি পবিত্র পুরুষে রক্তধারা বয়ে চলেছে, আর যে শরীর নির্দিষ্ট ছিল অন্য এক নারীর জন্য, যাকে আমি বেহেশতের তুলনায় শ্রেষ্ঠ ও কাম্য বলে গণ্য করতাম– সেই শরীরকে আর হঠকারিতায় আমি হারিয়ে ফেলেছি! আমি নিজের পবিত্র সত্তাটিকে হিজলজামজারুলের জঙ্গলে ভিজে ঘাসের ওপর জবাই করে ফেলেছি। আর এই নিরক্ষর মেঠো লোকটি সুর ধরে আমাকে শোনাচ্ছে, ভেবো না ভেবো না বিফলো ভাবনা/ভাবিলে ভাবনা যাবে না দূরে!
বড়ো অবাক লাগে হে শান্ত্রিদ্বয়! বেহুলা নদীর ধারে এক আশ্বিনের সন্ধ্যারাতে আমার মাথার ভেতর উলটে এক বন্য ঘুণপোকা ঢুকে পড়েছিল। সত্যিই তো! বিশাল পৃথিবীতে বিরাট আকাশের নিচে মানুষের সব ভাবনাই কী অকিঞ্চিৎকর! তবু মানুষ ভাবে। ভাবনা ছাড়া মানুষের চলে না। দার্শনিক মেহরু ভাবনা নামে পোকাটিকে তাড়াতে গিয়ে সেটি আমার মাথায় ঢুকে পড়েছিল। আর সেই ভাবনার কুটকুট কামড়ানিতে অস্থির হয়ে বাকি জীবন আমি ছুটে বেড়ালাম বিভ্রমণে। কী না করে বেড়ালাম! স্বেচ্ছাচারিতার চূড়ান্ত।
