সিঙ্গিগিন্নি শফিকে দেখছিলেন। এক পা এগিয়ে এসে বললেন, বাড়িতে আর কে-কে আছে বাবা তোমার? বাবা তো শুনলাম পিরসাহেব। মা আছেন–শুনলাম। ক ভাইবোন তোমার?
শফি মুখ নামিয়ে আস্তে বলল, তিন ভাই।
বোন?
বোন নেই।
বারি চৌধুরী বললেন, সমস্যা হল –মেজো ভাই প্রায় জড়বুদ্ধি। একটু বিকলাঙ্গও বলা যায়। ইদানীং নাকি কিছুটা সেরে গেছে কোন কবরেজের ওষুধ টষুধ খেয়ে। ওদিকে ওর দাদিআম্মা –মানে ঠাকুমা পক্ষাঘাতে শয্যাশায়ী। বড়ো ভাই দেওবন্দ মাদ্রাসা থেকে পাস করে মৌলবী হয়ে ফিরেছে। তারপর ঘটনা বলুন, দুর্ঘটনা বলুন –হঠাৎ বড়ো ভাই– আর এই নাবালক ছেলের একই সঙ্গে বিয়ের ব্যবস্থা হয়ে গেছে। পরশু শুক্রবার বিয়ের দিন। কন্যা দুটি যমজ বোন। আমারই দূরসম্পর্কের এক ভাইয়ের মেয়ে। সে-ভাইটি অবশ্য বেঁচে নেই।
প্রফুলবাবু বললেন, আপনার বউদিকে বলেছি সব কথা।
সিঙ্গিগিন্নি শফিকে জিজ্ঞেস করলেন, কোন ক্লাসে পড়ছ তুমি?
জবাবটা দিলেন বারি মিয়াঁ।…ক্লাস সিক্স। অথচ এতদিনে ওর এনট্রান্স পাস করা উচিত ছিল। আসলে ওর বাবা মৌলানপির মানুষ। একেবারে যাযাবর স্বভাব। আজ এ গ্রামে, কাল ও গ্রামে– এই করে সপরিবারে ঘোরেন। ফলে শফির লেখাপড়ার কনটিনিউটি থাকে না।
শফি এই প্রথম হিন্দুবাড়ির রান্না খাচ্ছিল। অন্য এক স্বাদ যেন বড়োগাজির বাড়ির খাদ্যের চেয়েও সুন্দর একটা আস্বাদ পাচ্ছিল সে। এত ভালো ডালরান্না কখনও সে খায়নি। সামান্য শাকসবজিও যে এমন সুস্বাদু হয়, তার জানা ছিল না। ভাজা মাছের ঝোলটাও খুব তারিয়ে-তারিয়ে খাচ্ছিল সে। খাওয়ার দিকে মন থাকায় সে ওঁদের কথাবার্তায় কান করছিল না।
ভাতের শেষে চাটনি এল। তারপর দই আর সন্দেশ। দুপুরের বিরিয়ানি আর হালুয়া আজ রাতে তার কাছে তুচ্ছ হয়ে গেল। যদিও হরিনাথ ময়রার মতো সিঙ্গিগিন্নি শফির সঙ্গে দূরত্ব রেখে কথা বলছিলেন, তাঁর কণ্ঠস্বরে স্নেহ ছিল। আর ওই স্নেহের স্বাদও তার খাওয়াটিকে মধুর করে তুলছিল।
প্রশস্ত পালঙ্কে মশারির ভেতর শুয়ে সে-রাতে শফির ঘুম আসছিল না। একটু তফাতে বারিচাচাজির নাকডাকা, বাইরে নিঝুম চরাচরে পোকামাকড়ের ডাক, তারপর হঠাৎ দেউড়িতে ঢং ঢং ঘণ্টাধ্বনি। আর শফির মনে হল তার মা দাঁড়িয়ে নিঃশব্দ কণ্ঠস্বরে কথা বলছেন। তার ইচ্ছে করছিল, চুপিচুপি বেরিয়ে পড়ে। কিন্তু দেউড়িতে দারোয়ান আছে। ফটক বন্ধ। রুকুর কথা সে মন থেকে মুছে ফেললেও মাকে মুছে ফেলতে পারছিল না। অমন করে সেদিন কেন সে হঠাৎ মায়ের ডাক পিছনে ফেলে এল, একথা ভেবে তার বুকের ভেতর থেকে একটা চাপা আবেগ ঠেলে বেরুতে চাইছিল। দেউড়ির ঘড়িতে যখন ঢং ঢং করে তিনবার ঘণ্টা বাজল, তখনও শফির চোখে ঘুম ছিল না।
পরদিন আব্দুল বারি চৌধুরী যখন তাকে ঘুম থেকে জাগালেন, তখন অনেক বেলা হয়ে গেছে। বারি মিয়াঁ বললেন, ঝটপট চা-নাশতা খেয়ে নাও। আজ থেকে তোমাকে ঘোড়ায় চড়া শেখাব।
শফির মনমরা ভাবটা অমনি কেটে গিয়েছিল। সেই কালো ঘোড়াটির পিঠে তাকে চাপিয়ে বারি মিয়াঁ কাছারিবাড়ির সামনের গোড়ো চটানে নিয়ে গেলেন। প্রথমে কিছুক্ষণ লাগাম নিজে ধরে পাশে-পাশে হেঁটে চললেন। তারপর লাগামটি শফির হাতে তুলে দিলেন। শিক্ষিত কালো ঘোড়াটি শফিকে মেনে নিল। ঘোড়ার চড়ার নেশা শফির পেছনের জীবনকে মুছে ফেলে আরেক জীবনে নিয়ে যেতে চাইছিল। সেই জীবন গতিময়। সে-জীবনে রুকু নেই, আর কেউ নেই। সে একা। তার মনে। হচ্ছিল, এই জীবনের চেয়ে কাম্য আর কিছু থাকতে পারে না।
আর এর তিন দিন পরে বড়োগাজি হঠাৎ এসে খবর দিয়েছিলেন, দরিয়াবানুর দুই মেয়ের সঙ্গে বদুপিরের দুই ছেলের শাদি হয়ে গেছে। দিল আফরোজের সঙ্গে নুরুজ্জামানের এবং দিলরুখের সঙ্গে মনিরুজ্জামানের।
০৯. স্বাধীনতার প্রথম স্বাদ
…স্পষ্ট মনে পড়ে দিনটিকে। মেঘে ঢাকা আশ্বিনের আকাশ থেকে টিপ-টিপিয়ে বৃষ্টি ঝরছিল। প্রফুল্লবাবু গম্ভীর মুখে বলছিলেন, সেবারকার মতো পাগলি খেপে না ওঠে; এবং একটু পরেই বুঝতে পেরেছিলাম, পাগলি বলতে তিনি কাছারিবাড়ির পেছনের নদীটিকেই চিহ্নিত করছেন। তারপর প্রফুল্লবাবু যখন ক-বছর আগে কাছারিবাড়িতে বন্যার জল ঢোকার বর্ণনা দিচ্ছিলেন, তখন অবাক লেগেছিল ওই শীর্ণ বেহুলা নামের স্রোতস্বিনী যাকে এখন এই শরৎকালে বেহালার টানটান তারের মতো দেখায়– যেন ছুঁলেই টুং করে বেজে উঠবে, সে কেমন করে সব-ভাসানিয়া স্বভাব আর সাহস পায়? আর কাল্লু আমাকে বলেছিল, চত্তির মাহিনামৈ তাকে দেখলে তাজ্জব হয়ে যাবেন ছোটাসাব! জেরাসে –এত্তোটুকুন ভি পানি না আছে। বহতু বালি– খালি বালি! ঔর উও বালি চক্কর মারতে-মারতে হাওয়া কি সাথ পাগলা জিনকি মাফিক কাছারিমে ঘুসবে! আঁখ অন্ধা কোরবে! তো ছোটোসাব, বেহুলা এইসি নদীয়া আছে! বহত খেয়ালওয়ালি আছে।
নদীর দিকে কখনও আলাদা করে তাকাতে জানতাম না তখনও। তখনও কি জানতাম আলাদা করে কিছু– ওটা গাছ, এটা মাঠ, ওটা আকাশ এটা কাশবন? উলুশবার মাঠে সারবাঁধা গাড়ির পেছনে নিজেকে একলা করে নিয়ে হেঁটে আসতে আসতে সেই যে একটা অবচেতনা গড়ে উঠেছিল –যার মধ্যে স্বাধীনতা আছে, যা প্রকৃতির তাই যেন কাল্লু পাঠানের সঙ্গে কয়েকটি দিনের ভ্রমণে পাগলি বেহুলার মতো টানটান বয়ে যেতে টের পেতাম। কুটিবাড়ির জঙ্গলে, ওপারে মেহরুর কুঁড়েঘরের সামনে দাঁড়ানো গাবগাছের ছায়ায় মাচানে বসে এক আদিম পৃথিবীর গল্প শুনতে-শুনতে একটি পরাবাস্তবতা আমাকে আবিষ্ট করত। বড়ো স্বাধীনতাময় সেই পরাবাস্তবতা যার সঙ্গে মৌলাহাটের একটি মেয়ের নিবিড় সম্পর্ক আছে।, রুকু ছিল সেই স্বাধীনতাময় পরাবস্তাবতার দূরতম প্রান্তে দাঁড়ানো। মাঝে-মাঝে বেহুলা আর রুকু এক হয়ে যেত! কিন্তু বারিচাচাজির সতর্ক প্রহরীর মতো সাতমার কাল্লু খাঁ যেন আমার চারদিকে কী এক দুর্ভেদ্য ব্যুহ গড়ে তুলেছিল। তাই তাকে ঘৃণা করতাম। অথচ তার মধে বিস্ময়কর বহু চুম্বক ছিল– তাকে এড়ানো যেত না।
