বিকেলেও সেরেস্তা আর খাজাঞ্চিখানায় লোকজনের ভিড়। শফি ফোয়ারাটির কাছে গিয়ে দাঁড়াল। শাদা পাথরের পরিমূর্তির দিকে তাকিয়ে আবার তীব্রভাবে রুকুর কথা তার মনে পড়ে গেল। আর তখনই একটা প্রচণ্ড ইচ্ছে তাকে পেয়ে বসল, সে কি চুপিচুপি পালিয়ে যাবে? বারিচাচাজি নেই। কেউ তাকে বাধা দেবার নেই। হঠকারিতায় সে গেট পর্যন্ত এগিয়ে গেল। গেটের দুধারে দুটি কাঠমল্লিকাফুলের গন্ধ তার সেই হঠকারিতার গতি বাড়িয়ে দিল। শফি রাস্তায় পৌঁছুল।
ইন্দ্রাণী গ্রামটি কাছারিবাড়ির পেছনদিকটায় শুরু হয়েছে। বাদশাহি সড়ক গেছে তার মাঝখান দিয়ে। কয়েক পা এগিয়ে গেছে, কাল্লু পাঠানের ডাক শুনে থমকে দাঁড়াল শফি। ঘুরে দেখল, কাল্লু হাসিমুখে তার দিকে এগিয়ে আসছে। শফির বুকে রক্ত ছলকে উঠল। এই লোকটিকে কি তাহলে বারিচাচাজি তার পাহারায় রেখে গেছেন?
কাল্লু সেলাম ঠুকে বলল, ছোটাসাব! আপনি এসেছেন, হামি খবর পেয়েছে। তো উধার কাহা ঘুমতে যাচ্ছেন? আসেন, আসেন। আমি আপনাকে ঘুমিয়ে লিয়ে আসি।
শফি দাঁড়িয়ে আছে দেখে কান্দু চোখ নাচিয়ে বলল, গাওঁকি অন্দর কী দেখবেন ছোটোসাব? উধার কুছ ভি দেখনেকা নেহি আছে। আসেন, আপনাকে কোঠিবাড়ির জঙ্গল দেখিয়ে লিয়ে আসি।
সে হাত তুলে উত্তরদিকের ঘন গাছপালাঢাকা একটা জায়গা দেখাল। শফি বলল, না। আমি কোথাও যাব না।
কাল্লু খ্যা খ্যা করে অদ্ভুত হাসল ।…তো ঠিক হ্যায়! লেকিন গাওকি অন্দর মাত যাইয়ে।
শফি বলল, কেন?
গাঁওবালেকি সাথ হামলোগোঁকা বহত ঝামেলা মেলা চলছে। উও মাহিনা কাছারিতে হামলা কোরতে এল; তো মেনিজারবাবু পাইক ভেজে সব ঠাণ্ডা করে দিল।
আজ তো চাচাজির সঙ্গে গাঁয়ের ভেতর দিয়ে এলাম!
কাল্লু আবার হাসল।…দেওয়ানসাবের কথা আলাদা আছে। উনহিকে কৈ কিছু বলবে ইয়েহিম্মত কার আছে বোলেন? আরে ছোটাসাব, উনহি তো সব কাজিয়া রফা করে দিলেন।…কাল্লু চাপা স্বরে বলল, ওহি যো মেনিজারবাবু আছে না? উনহি খালি ঝুটঝামেলা কোরবেন — ফিকির কোরবেন। লেকিন ছোটাসাব, আপকা গোড় পাকড়ে বলছি, মেনিজারবাবুর কাছে বোলবেন না।
শফি আবার কাছারিবাড়িতে এসে ঢুকল। কাল্লু বারবার তাকে চাপা স্বরে অনুরোধ করছিল, ম্যানেজারবাবুর কানে কথাটা যেন না যায়। ফোয়ারার কাছে পৌঁছে শফি বলল, আমি কি কাছারিবাড়ির লোক যে আমাকে মারবে?
কাল্লু চলল, কুছু বিশোয়াস নাই ছোটাসাব। আপনাকে দেওয়ানসাহেবের সঙ্গে আসতে দেখেছে কী না বোলেন? তো ব্যস, আপনিভি কাছারির লোক হয়ে গেছেন।….
সে রাতে বারি চৌধুরী ফিরে আসার পর শনি জানতে পেরেছিল, কাল্লু পাঠান মিথ্যা বলেনি। বিশাল ইন্দ্রাণী পরগনা জুড়ে কিছু ছিমহল আছে। সেগুলোর মালিক হিন্দু বা মুসলিম জমিদার। নবারি মহলের সঙ্গে তাদের প্রায়ই সংঘর্ষ বাধে। ইন্দ্রাণী গ্রামটি এক মুসলিম জমিদারের এলাকাভুক্ত। সম্পর্কে তিনি হরিণমারার বড়োগাজির। আত্মীয়। মাঝে-মাঝে বড়োগাজি এসেও রফা করে দিয়ে যান। গ্রামটি মোটামুটি মুসলিমপ্রধান। এদিকে নবারি এসটেটের ম্যানেজার প্রফুল্ল সিঙ্গি মুখে যত অমায়িক হোন, অতিশয় ধূর্ত মানুষ। তাঁর কী অভিসন্ধি ঠিক বোঝা যায় না। কিন্তু বারি চৌধুরী জানেন, উনিই সব সংঘর্ষের প্ররোচনা দিয়ে থাকেন। খোলা ছাদে বসে যখন চাপাস্বরে বারি চৌধুরী শফিকে এসব কথা বলছিলেন, সেই সময় প্রফুল্লবাবু এলেন লণ্ঠন হাতে। বললেন, আপনারা অন্ধকারে এখানে বসে– এদিকে হরিবন্ধু আপনাদের খুঁজে বেড়াচ্ছে। আসুন, আসুন । আহারাদি প্রস্তুত।
সত্যিই প্রস্তুত অবশ্য হয়নি। ঝাড়লণ্ঠনটি জ্বলছে সন্ধ্যা থেকে। শাদা টেবিলে শুধু একটি জলের পাত্র। সেটি চীনেমাটির এবং কারুকার্যকরা। ওধারের ঘর থেকে দুটি লোক প্ৰকাঙ কাঁসার থালায় ভাত নিয়ে এল। ট্রেতে সাজিয়ে একগুচ্ছের তরিতরকারির বাটি আনল। এই প্রথম শফি হিন্দুবাড়ির রান্না খেতে চলেছে। প্রকাণ্ড থালার পাশে কী-সব ভাজাভুজি আর সবজির দলা দেখে সে পার্থক্যটা বুঝতে পারছিল।
একটু পরে ঘোমটা টেনে এক প্রৌঢ়া হিন্দু মহিলা এলেন। বারি চৌধুরীকে আদাব দিয়ে শফিকে দেখিয়ে মৃদুস্বরে বললেন, এই বুঝি আপনাদের পিরসাহেবের ছেলে?
প্রফুল্লবাবু হাসতে-হাসতে বললেন, দেখে কী মনে হচ্ছে বলো?
সিঙ্গিগিন্নি বললেন, চেহারা দেখে মনে হয় বাঙালির ছেলে। মুসলমান বলে চেনাই যায় না।
বারি চৌধুরী একটু হেসে বললেন, আপনাদের খালি ওই কথা! মনে পড়ে আমাকে প্রথমবার দেখে বলেছিলেন? আমাকে দেখেও নাকি
সিঙ্গিগিন্নি ঝটপট কথা কেড়ে এবং বিব্রত মুখে বললেন, না-না। সেভাবে বলিনি। সত্যি তো! মানুষের চেহারায় কি কিছু তফাত আছে? তবে যাই বলুন দেওয়ানসাহেব, এই ছেলেটিকে যদি ধুতিশার্ট পরিয়ে দেন, বামুনের ছেলে মনে হবে না? কেমন টকটকে গায়ের রঙ, কেমন নামুখের গড়ন!
প্রফুল্লবাবু একটু তফাতে চেয়ার টেনে বসে হতাশ ভঙ্গি করে বললেন নাও। শুরু হল! আরে বাবা, পোশাকের ভেতর মানুষ তো একই? সেই দুখানা ঠ্যাং, দুখানা হাত, একটা মুণ্ডু!
বারি চৌধুরী বললেন, তবে বউদির কথায় একেবারে সত্য নেই, তা নয়। পোশাকও বটে, আবার মুখের ভাষাতেও খানিকটা পার্থক্য থেকে গেছে হিন্দু মুসলমানে। কালচারাল ডিফারেন্স বলা যায়।
