তো মেঘেঢাকা দুর্লক্ষুণে টিপটিপ বৃষ্টির দিনে ভিজে জবুথবু হয়ে যে ঘোড়সওয়ার কাছারিবাড়ির ফটক দিয়ে ঢুকছিল, প্রথমে তাকে জানালা দিয়ে আমিই দেখতে পাই। তিনিই যে হরিণমারার বড়োগাজি সইদুর রহমান, একেবারে চিনতে পারিনি। তার পরনে ছিল আলিগড়ি চুস্ত পাজামা আর শাদা নকশাদার পানজাবি, মাথায় তুর্কি টুপি। ওপরের হলঘরে যখন তাঁকে সসম্মানে নিয়ে আসা হল, তখন তাঁর নেতিয়েপড়া কাদাটে মূর্তি দেখে হাসি পাচ্ছিল। কারণ কিছুদিন আগেই এই লোকটিকেই সবিক্রমে তলোয়ার সঞ্চালন করতে দেখেছি। কিন্তু তখনও জানতাম না, তিনি কেন হঠাৎ এই দুর্যোগে এতদূর পাড়ি জমিয়েছেন? আর ওই কাদাটে চেহারায় তাঁকে এতটুকু ক্লান্ত বা ম্রিয়মাণ দেখাল না এবং তিনি প্রথমেই সোজা এসে আমার সামনে দাঁড়ালেন। ভিজে ঠান্ডা হাতে আমার একটা হাত চেপে ধরে প্রচণ্ড উল্লাসে একটি ইংরেজি বাক্য উচ্চারণ করলেন, মাই বয়! নাও ইউ আর ফ্রি!
বারি মিয়াঁ অবাক হয়ে বলেছিলেন, ফ্রি ফ্রম হোয়াট, গাজি?
ফ্রম ডেনজার! বড়োগাজি এত জোরে অট্টহাসি হাসলেন যে সেই মুহূর্তের শরকালীন মেঘগর্জনও খানখান হয়ে গেল। বড়োগাজি বলেছিলেন ফের, ফ্রি ফ্রম ডেনজার! মৌলানা বদিউজ্জামানের বড়ো এবং মেজো ছেলের সঙ্গে আমার বন্ধু লেট তোফাজ্জেল চৌধুরীর দুই মেয়ের শাদি হয়ে গেছে গতকাল।
প্রফুল্লবু হেসে ফেলেছিলেন বোগাজির অঙ্গভঙ্গি দেখে। কিন্তু বারিচাচাজি হাসছিলেন না। সেই মেঘগর্জন ছিল বজ্রপাতঘটিত এবং আমার মনে হয়েছিল বাজটি আমার ওপর পড়েছে। রুকু! আমার বুকু! তাকে পাশে নিয়ে শোবে মনিভাই– অধপশু অধমানব, বিকলাঙ্গ, উদ্ভট একটা প্রাণী! অকপটে বলছি, ওকে কতোদিন আবছা-আঁধার ঘরে উচ্ছিত শিশ্ন নিয়ে জঘন্য খেলায় লিপ্ত দেখেছি এবং সে-কথা এই বিশাল পৃথিবীর কোনো বৃক্ষকেও জানাতে পারতাম না। এখন নিশ্চিত মৃত্যুর সামনে দাঁড়িয়ে আছি বলেই জানিয়ে যেতে যেতে চাইছি। এ মুহূর্তে জীবনের– আমার এই দণ্ডিত জীবনের পুরোটাই আমি পটের মতো ছড়িয়ে দিতে চাই –মাড়িয়ে যেতে ইচ্ছে হলে তুমিও পা বাড়াতে পার লম্বানেকো শাস্ত্রীভাই!–
একটু পরে বারি চৌধুরী আস্তে বলেছিলেন, গাজি, তুমি কী বলছ!
বড়োগাজি হাসতে-হাসতে বলেছিলেন, শাদিতে আমারও জেয়াফত (নেমন্তন্ন) ছিল চৌধুরী! মইদুর, মানে তোমাদের ছোটো জিরও ছিল। অবশ্য আমি মদুর মতো পিরসায়েবের মুরিদ হইনি। কারণ তাহলে আমাকে ব্র্যানডি-হুইসকি ছাড়তে হবে। সিগারেট ছাড়তে হবে। পাঁচ অক্ত নমাজ পড়তে হবে। ইসলামের জন্য। এতখানি স্যাক্রিফাইস করতে আমি রাজি নই ভাই! আমাকে জেয়াফত করেছিল আমার লেট বুজম ফ্রেনড তোফাজ্জলের বউ। চৌধুরী, শি ইজ এ জিনিয়াস! ইলিটারেট চাষাভুষোর মেয়ে হতে পারে, কিন্তু তার অসামান্য শক্তি। শক্তি আর জেদ। আমি ওর প্রশংসা করি!
কিছুক্ষণ চুপ করে থাকার পর বারি চৌধুরী একইভাবে বলেছিলেন, আমি করি না।
কেন বলো তো?
আজও জানি না, সেদিনও বুঝতে পারিনি, কেন বড়োগাজির ওই সরল প্রশ্ন শুনে বারিচাচাজি হঠাৎ ফেটে পড়েছিলেন। আই হেট দ্যাট উওম্যান। ছোটো লোকের মেয়ে! তরতাজা গোলাপের মতো ফুটফুটে একটা মেয়েকে
উত্তেজনায় বাকরুদ্ধ দেওয়ানসাহেব উঠে গিয়ে জানালার রড মুঠোয় আঁকড়ে পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে ছিলেন। বড়োগাজি একটু হকচকিয়ে গিয়েছিলেন প্রথমে। সামলে নিয়ে শুকনো হেসে বলেছিলেন, সিঙ্গিদা! আপনার দেওয়ানসাহেবকে আজ অব্দি আমি বুঝতে পারলাম না! এলাম ঝড়পানি মাথায় করে এত ক্রোশ পথ একটা সুখবর দিতে! আর মিয়াঁসাহেব উলটে –থাক গে, মরুক গে! আমি চলি।
বুঝতে পেরেছিলাম বড়োগাজি অপমানবোধে আহত। প্রফুল্লবাবু হাঁ-হাঁ করে উঠেছিলেন, কী মুশকিল! কাপড়-চোপড় বদলে নিন। অনুগ্রহ করে গরিবালয়ে এসে পড়েছেন যখন, তখন এভাবে চলে গেলে গেরস্থের অকল্যাণ হয় জানেন না?
প্রফুল্লবাবুর কথার মধ্যে সরলতা আর কৌতুকও ছিল। কিন্তু বড়োগাজি গ্রাহ্য করেননি। আমার দিকে ঘুরে বলেছিলেন, তোমার কাছে তলব পাঠিয়েছিলেন তোমার। আব্বা– কিংবা আম্মা। যাই হোক, কাজিসাহেব কিছু বলতে পারেননি তুমি কোথায় আছ। আমি অবশ্য বলেছিলাম লোকটাকে সোজা এখানে আসতে। আসেনি সে?
খুব আস্তে বলেছিলাম, না। একটু পরেই ফের বলেছিলাম, জানি না।
আমার হাতে ঠাণ্ডাহিম হাত রেখে বড়োগাজি বলেছিলেন, যাক গ। যা হয়, ভালোর জন্যই হয়। তুমি বেঁচে গেছ। এখন মন দিয়ে পড়াশুনো করো। ওহে চৌধুরী! তোমার আবার হলটা কী? ঘোয়রা এদিকে। আহা!
বলো!
শফি হরিণমারায় ফিরছে কবে?
কেন?
অদ্ভুত প্রশ্ন! বড়োগাজি একটু বিরক্ত হয়ে বলেছিলেন। ওকে কি স্কুল ছাড়িয়ে দেবে নাকি? মাথা ঠাণ্ডা রেখে আমার কথাটা শোনো। পুজোর ছুটি চলছে এখন। দিনকতক এখানে থাক। তারপর আমার কাছে এসো। কাজির বাড়ি থাকলে ওর লেখাপড়া হবে না। কাজির ছেলেটা বড় শয়তান। শফিকে আমি রাখব। আমার বাড়ি থাকবে। আমি ওকে পড়াব। ইংরেজিতে ও বড় কাঁচা– জান কি?
বারি চৌধুরী চাপা শ্বাস ছেড়ে সরে এসেছিলেন জানালা থেকে।–সেসব কথা পরে হবে। তুমি যেও না। পোশাক বদলে নাও। খাওয়া-দাওয়া করো!
বড়োগাজি পা বাড়িয়ে বলেছিলেন, তোমার মাথা খারাপ? আসার পথে রফিকুল আমাকে দেখেছে। ওর বউ এতক্ষণ গোসা করে বসে আছে।
