গেটের দুধারে দুটি কাঠমল্লিকা ফুলের গাছ। সেই ফুলের ঝাঁঝালো গন্ধ শফিকে একটা ঝাঁকুনি দিয়েছিল। মনে পড়ে গিয়েছিল মৌলাহাটের খোঁড়াপিরের মাজারে রুকু-রোজির সঙ্গে দেখা হওয়ার সেই আশ্চর্য সময়টির কথা। আর তখনই সে আবিষ্কার করেছিল, একটা কালো ঘোড়া তাকে রুকুর কাছ থেকে দূরে –বহুদূরে সরিয়ে নিয়ে এসেছে। কিছুক্ষণের জন্য অসহায় অস্থিরতায় তার বুকের ভেতরটা কেঁপে-কেঁপে উঠেছিল।
দোতালার কয়েকটি ঘর নিয়ে সপরিবারে বাস করেন এসটেট ম্যানেজার প্রফুল্লরতন সিংহ। পাশেই হলঘরে মতো একটি ঘর দেওয়ানসাহেবের জন্য সব। সময় সাজানোগোছানো থাকে। ঘরের দেয়ালে হরিণ আর বাঘের স্টাফকরা মাথা, নবাববাহাদুরবংশের লোকেদের বড়ো-বড়ো সব তৈলচিত্র, একখানে একটি টেবিলআয়না। বড়োসড়ো সব জানলা। মাঝখানে কয়েকটা সুদৃশ্য গদিআঁটা চেয়ার আর মধ্যিখানে। মার্বেল পাথরেব ডিমালো একটি টেবিল। একধারে একটি পালঙ্কে বিছানা পাতা। বড়োগাজির ঘরটিকে একপলকেই তুচ্ছ করে ফেলেছিল এই ঘর। শফি অবাক চোখে তাকিয়ে ছিল। প্রফুল্লবাবু কথা বলছিলেন বারি চৌধুরীর সঙ্গে। তাঁরা কথা বলতে বলতে খোলা ছাদের দিকে এগিয়ে গেলে শফি উত্তরের জানালায় গিয়ে দাঁড়াল। দেখল সামান্য দূরে একটা ছোট্ট নদী। নদীর এধারে নিচু বাঁধ। হিজল-জারুল জামগাছের সারি। নদীটি কানায়-কানায় ভরা। ওপারে শাদা কাশফুলের ভেতর একটি কুঁড়েঘর। তার সামনে একটা গাবগাছের তলায় বাঁশের মাচান। মাচানে বসে এক প্রায়-ন্যাংটো লোক তকলি ঘুরিয়ে সুতো কাটছে। জনহীন কাশবনের ভেতর একলা এক কুঁড়েঘর আর এক মানুষ শফিকে অবাক করে রাখল কিছুক্ষণের জন্য।
তারপর সে দক্ষিণের জানালায় গেল। নিচের প্রাঙ্গণ, পাম আর ঝাউগাছের সারি, ফুলবাগিচা, মৃত ফোয়ারা ও পরি আর তার ওধারে সেই হাতিটিকে শিরীষগাছের ছায়ায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখল। সে সাতমার কান্নু পাঠানকে খুঁজল। কিন্তু দেখতে পেল না কোথাও।
প্রফুল্লবাবু আর বারি মিয়াঁ ঘরে ঢুকলে সে ঘুরে দাঁড়াল। প্রফুল্লবাবু বেঁটে গালাগোলা মানুষ। মাথায় টাক আছে। গোঁফটি প্রকাণ্ড। ভুরু কুঁচকে এবং মিটিমিটি হেসে শফিকে বললেন, কী? দেওয়ানসাহেবের পাল্লায় পড়ে একেবারে নাস্তানাবুদ হয়ে গেছ দেখছি! বসো, বসো! একটু জিরিয়ে নাও। তারপর কথাবার্তা হবে।
এইসময় উরদি-পরা একটি লোক ট্রেতে দু-গ্লাস শরবত এনে টেবিলে রাখল। প্রফুল্লবাবু শফির হাত ধরে এনে চেয়ারে বসিয়ে দিলেন। বারি মিয়াঁও বসলেন। প্রফুল্লবাবু যখন একটা গ্লাস তুলে শফির দিকে এগিয়ে দিলেন, সে গ্লাসটি নিল। আর তখনই এই হিন্দু মানুষটিকে তার আপন মনে হল। হরিনাথ কি এঁর চেয়েও উঁচুদরের মানুষ?
প্রফুল্লবাবু হাসতে-হাসতে বললেন, বাবিবাহ মন্দ না! দেওয়ানসাহেব তা যাই বলুন! এই দেখা না, আমার বিয়ে হয়ে। হল ঠিক তোমার বয়সে। তখন আমি ক্লাস নাইনের ছাত্র। এফ, এ পড়ার বছর আমি ছেলের বাপ হলাম। মন্দ কী ।
বারি মিয়াঁও হাসলেন…ঘরের শত্রু বিভীষণ একেই বলে! সিঙ্গিমশাই, ওকে তাতাবেন না।
প্রফুল্লবাবু মুখে কপট গাম্ভীর্য এনে বললেন, আলবত তাতাব। লোককে তাতানোই আমার কাজ।
বলে শফির দিকে ঝুঁকে চাপা স্বরে সকৌতুকে বললেন ফের, দেওয়ান সাহেবকে তুমি কী বল?
শফি সলজ্জ হেসে বলল, চাচাজি!
ঠিক আছে। আমাকে তুমি কাকাজি বলবে।
বারি মিয়াঁ বললেন, দ্যাটস এ টার্কি ওয়ার্ড সিঙ্গিমশাই! মুসলিমতুর্কিদের ভাষা।
আপনাকে নিয়ে পারা যায় না চৌধুরীসায়েব! প্রফুল্লবাবু শফির দিকে ঘুরলেন– ওঁকেও চাচাজি বলবে, আমাকেও চাচাজি বলবে। এটা হয় না। চাচাজি আর এই কাকাজি এক বস্তু নয়। থাকো কিছুদিন– হাড়ে-হাড়ে টের পাবে।
বারি মিয়াঁ বললেন, জানো তো শফি, সিঙ্গিমশাই মুখে বলছেন বাল্যবিবাহের পক্ষপাতী। এদিকে এখনও দুই মেয়ের বিয়ে দেননি। তাদের দিব্যি শহরের স্কুলে। কলেজে পড়াচ্ছেন।
প্রফুল্লবাবু সে-কথায় কান না করে উঠে পড়লেন।…ওসব থাক চৌধুরীসায়েব। বারোটা বাজে প্রায়। এবেলা শুনলাম মেহমানখানায় আপনাদের খাওয়া রেডি করেছে। যাই হোক, ওবেলা এই বান্দার ঘরে দুমুঠো খেতে হবে। কী গো? তুমি নাকি পিরসায়েবের ছেলে। খাবে তো হিন্দুবাড়ি? তোমার এই চাচাজি ভদ্রলোকের কিন্তু বহু আগে জাত গেছে!
বারি মিয়াঁ চোখে ঝিলিক তুলে বললেন, জাত কি আপনারও যায়নি সিঙ্গিমশাই?
ঠোঁটে আঙুল রেখে প্রফুল্লবাবু বললেন, চুপ, চুপ…
দুপুরে শফি ঘুমিয়ে পড়েছিল। বিকেলে কার ডাকাডাকিতে ঘুম ভেঙে গেল। দেখল উদরদিপরা সেই লোকটা চায়ের পেয়ালা হাতে দাঁড়িয়ে আছে। আদাব দিয়ে বলল, আর ঘুমোবেন না খোকামিয়াঁ! উঠে পড়ুন।
শফি উঠে বসে জিজ্ঞেস করল, চাচাজি কোথায়?
দেওয়ানসাহেবের কথা বলছেন তো? উনি তোপপাড়া গেছেন। ফিরতে সন্ধে হয়ে যাবে।
সে সসম্ভ্রমে চায়ের পেয়ালাটি শফির হাতে দিয়ে বেরিয়ে গেল। শফি পেয়ালাটি হাতে দিয়ে দক্ষিণের জানালায় গিয়ে দাঁড়াল।
নদীর ওপারে কুঁড়েঘরের লোকটি এখন ভরা নদীতে জাল ফেলছে। বিকেলের রোদ টেরচা হয়ে পড়েছে নদীর বাঁকের ওপর। এপারের বাঁধে দাঁড়িয়ে আরেকটা লোক ওপারের লোকটিকে চিৎকার করে কিছু বলছে। এপারের লোকটিকে একটু পরেই চিনতে পারল শফি। এ সেই সাতমার কাল্লু পাঠান। এখন তার পরনে লুঙ্গি, গায়ে কুর্তা, রীতিমতো মিয়াঁসাহেবটি। শফি চা শেষ করে নিচে নেমে গেল।
