বারি মিয়াঁ শফিকে বললেন, উঠে পড় শফি। শফি রেকাবে পা রেখে ঘোড়ার পিঠে চাপল। তারপর একটু পিছিয়ে বারি মিয়াঁকে জায়গা করে দিল। শফি সেই মুহূর্তে আবার টের পেল, কালো ঘোড়াটির শরীর থেকে একটা জোরালো স্পন্দন তাব শরীরে সংক্রামিত হচ্ছে। বারি মিয়াঁ ঘাড় ঘুরিয়ে হরিনাথের উদ্দেশে বললেন, ইস্তফাঁদেওয়া জমি নতুন বন্দোবস্ত দিলে তাতে আগের মালিকের হক থাকে না।
ঘোড়াটির যখন কদমে পা ফেলেছে, তখনও হরিনাথ করজোড়ে অনুসরণ করে জোর জলায় বলছিল, বলুন– বলুন তাহলে এটা অন্যায্য কি না!…।
হঠাৎ ঘোড়াটি ছুটতে শুরু করল। শফি আবার আঁকড়ে ধরল বারি চৌধুরীকে। বাদশাহি সড়ক আবার ঢালু হয়ে নেমে গেছে। আবার দুধারে দাগড়া-দাগড়া সবুজ শস্যক্ষেত্র, জটপাকানো ঝোঁপঝাড়, গাছপালা। আবার খানাখন্দ, জলকাদা। তারপর ঘোড়াটি খাল। সামনের প্রাচীন সাঁকোটি ভাঙা। একফালি অপ্রশস্ত কাঁদর দেখা যাচ্ছিল। রাস্তার ডানদিকে ঢালের ওপর গোরুমোষের দাগ। নিচের একটা ঘাসজমি পেরিয়ে দাগগুলো জলের ধারে শেষ হয়েছে। ওপাবে আবার সেই দাগগুলো ব্যানাকাশের জঙ্গল চিরে এগিয়ে গেছে। শিক্ষিত ঘোড়াটি সেই পথে নেমে সাবধানে জল পেরিয়ে ওপারে পৌঁছলে বারি মিয়াঁ বিরক্তমুখে বললেন, জেলাবোর্ডের এই সাঁকোটা মেরামত করার কথা। তদ্বির করে-করে হন্যে হয়ে গেছি। বড়োগাজিকেও বলেছি। কোনো লাভ হয়নি। আর স্থানীয় লোকেরাও যেমনি কুঁড়ে তেমনি বদমাইশ। এখানে প্রায়ই রাতবিয়েতে রাহাজানি হয়। গাড়োয়ানদের খন্দের বস্তা লুঠ হয়। তবু কেউ কিছু করবে না। ডিসট্রিকট কালেকটার ম্যাকফার্সনা সায়েবকে না ধরলে কাজ হবে না দেখছি।
ঘোড়াটি আবার ভালো রাস্তা পেয়ে দুলকি চালে হাঁটতে লাগল। বারি মিয়াঁ তাকে ছোটাতে চাইছিলেন না, সেটাই কারণ। কিছুক্ষণ পরে বারি মিয়াঁ সামনে একটা প্রকাণ্ড ঢিবির ধারে একটি বটগাছ দেখিয়ে বললেন, ওখানে গিয়ে একটু বসব আমরা। কেন তোকে এভাবে হঠাৎ তুলে নিয়ে এলাম, তোকে বলা দরকার।
এই বটতলাটি জনহীন। মৌলাহাটের দীঘির মতোই একটি বিরাট দীঘি দেখা যাচ্ছিল দুটি ঢিবির মাঝখান দিয়ে। কিন্তু তেমন কোনও বাঁধানো ঘাট দেখতে পেল না শফি। তবে বটগাছের পেছনে ঢিবির পারে ভেঙেপড়া একটা মসজিদ দেখল সে। প্রকাণ্ড সব পাথরের চাঙড় গড়িয়ে এসে বটগাছের গোড়ায় আটকে আছে। ঘোড়া থামিয়ে দুজনে নামল। ঘোড়াটা আগের মতো পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রইল।
একটা চাঙড়ে বসে বারি মিয়াঁ বললেন; সঙ্গে বন্দুক থাকলে আজ আমি ওই হারামজাদি মেয়েটাকে গুলি করে মেরে আসতাম।
শফি তাকাল। কিন্তু কোনো প্রশ্ন করল না।
বারি মিয়াঁ বললেন দরিয়াবানুর সঙ্গে আজ আমার খুব ঝগড়া হয়ে গেছে। আমি ওকে বোঝাতে গিয়েছিলাম, রোজির সঙ্গে নুরুজ্জামানের শাদি দেয় তো দিক। রুকুর জন্য বরং অপেক্ষা করুক। শফি লায়েক হোক। লেখাপড়া শেখা শেষ হোক। তখন না হয় রুকুর সঙ্গে তার শাদি হবে। কিন্তু দরিয়াবানুর এক কথা। একই সঙ্গে দুই বেটির শাদি হবে। তার চেয়ে সাংঘাতিক কথা, ওই ধূর্ত মেয়েছেলে আগেই টের পেয়েছিল, আমি তোর শাদিতে নারাজ। তাই কী করেছে জানিস? বিয়ের তারিখ এগিয়ে এনেছে। সামনে শুকুরবার বিয়ের দিন ঠিক হয়ে গেছে। তুই তো জানিস, তোর আব্বা মসজিদেই থাকেন। সাংসারিক ব্যাপারে আর মাথা ঘামাচ্ছেন না। তাঁর কথা হল, যা করার তা নুরু আর তোর মা করুন। তাতে তাঁর অমত হবে না। আর ব্যস! দরিয়াবানু কোমর বেঁধে নেমে পড়েছে।
একটু চুপ করে থাকার পর শ্বাস ফেলে বারি চৌধুরী বললেন, তোর আব্বা বা তোর বড়ো ভাই আলেম লোক। তার ওপর ওহাবি না ফরাজি। ওঁরা আশরাফে আজলাফে (উচ্চবর্ণ-নিম্নবর্ণে) বিশ্বাস করেন না। আমি ধর্মটর্ম মানি না। কিন্তু আমিও মানুষের মধ্যে ভেদাভেদে বিশ্বাস করি না। তবে আমি জানি, এজুকেশান কালচার বলে একটা ব্যাপার আছে। সেদিক থেকে আশরাফ-আজলাফ না মেনে পারা যায় না। দরিয়াবানু আজলাফ ঘরের মেয়ে। তার রুচি আলাদা। সে এজুকেশান কালচাব বোঝে না। সে শিক্ষার মূল্য কী জানে না।
বারি চৌধুরী চুপ করলেন। একটু পরে শফি মৃদুস্বরে বলল, আপনি আব্বাব সঙ্গে দেখা করেননি?
করেছিলাম।
আব্বা কী বললেন?
বারি মিয়াঁ একটু হাসলেন।…দরিয়াবানু আর তোর বড়ো ভাই যা বলছে, তাই বললেন। তবে তোর বড়ো ভাই আলেম হয়ে দেওবন্দ থেকে ফিরেছে। সে আমাকে খুব তম্বি করল। হুমকি দিল। বলল, আমি নাকি হিন্দুদের স্কুলে খ্রিস্টানি শেখাচ্ছি। শুনেছি, তোর বড়ো ভাই নাকি তোর আব্বার সঙ্গেও আজকাল কোরান-হাদিস নিয়ে তর্ক করে। সেদিন, নাকি মসজিদ-ভরা লোকের মধ্যে তোর আব্বাকে নুরু চার্জ করেছিল, কেন উনি তোকে ‘কুফরি কালাম (বিধর্মীর বিদ্যা) শিখতে দিয়েছেন? তোর আব্বা ওকে থাপ্পড় তুলে মারতে এসেছিলেন। লোকেয়া নুরুকে টানতে-টানতে সরিয়ে নিয়ে যায়।
শফি উঠে দাঁড়াল।…আমার এসব শুনতে ইচ্ছে করছে না। ইন্দ্রাণী আর কতদূর?
বারি মিয়াঁ আস্তে বললেন, আর ক্লোশ দুই মাত্র। চল, রওনা হওয়া যাক।
ইন্দ্রাণীতে নবাববাহাদুরের কাছারিবাড়িটি বিশাল। গেটে দুজন সঙ্গীনধারী দারোয়ান আছে। তিনদিকে সারবন্দি অনেকগুলো ঘর। দক্ষিণ-পূর্ব কোণের অংশটি দোতালা। নিচের ঘরগুলিতে খাজাঞ্চিখানা, সেরেস্তা, মহাফেজখানা এইসব। প্রজাদের ভিড়ে কাছারিবাড়িটি গিজগিজ করছে। মাঝখানে খোলামেলা বিশাল এক চত্বর। দুধারে পাম আর ঝাউগাছের সারি। টুকরো-টুকরো কিছু ফুলবাগিচা। একখানে পুরনো ফোয়ারা। কিন্তু ফোয়ারাটি শুকনো। মাঝখানের যে স্তম্ভের ছিদ্র দিয়ে জল ছড়িয়ে পড়ত, তার মাথায় একটি মার্বেলের পরি সামনে ঝুঁকে কুণ্ডে জল ভরার ভঙ্গি করছে।
