ফতেপুর চটি বলতে গোটাকতক দোকানপাট। প্রকাণ্ড এক বটের তলায় গোরুমোষের গাড়ি। দুটো একা ঘোডাগাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। সওয়ারিদের সঙ্গে কোচোয়ানের দরকষাকষি চলেছে। দেকানপাটের সামনে কিছু লোক দাঁড়িয়ে শালপাতার ঠোঙায় কিছু খাচ্ছে। একটা অশথগাছের ধার ঘেঁসে একটা মন্দির। তার উঁচু চত্বরে বসে আছে জনাদশেক সাধু। ছাইমাখা শরীর, মাথায় জটা, কোমরে একটুকরো লাল কৌপিন। তারা গাঁজার ছিলিম টানছে। বারি চৌধুরীর ঘোড়া থামতেই সামনের ময়রা-দোকান থেকে একটা কালো ঢ্যাঙা গড়নের লোক, পরনে হাঁটু অব্দি খেটে ধুতি, খালি গা, গলায় তুলসীকাঠের মালা, হন্তদন্ত বেরিয়ে এসে আদাব দিল। দোকানের সামনে ছোট্ট বাঁশের মাচা। তার ওধারে একটি আটচালা। আটচালায়। একদল লোক বসে তর্কাতর্কি করছিল। তারাও চুপ করে গেল এবং কালো ঘোড়াটিকে অবাক চোখে দেখতে থাকল। ময়রা লোকটি আদাব দিয়েই ঝটপট একটা কম্বল এনে বাঁশের মাচায় বিছিয়ে দিল। তখন বারিমিয়াঁ বললেন, বসব না হরিনাথ। রসকরা বা মনোহরা যা থোক কিছু দাও। বলে শফির দিকে ঘুরলেন।– হরিনাথের রসকরা খুব বিখ্যাত, বুঝলি শফি? আষাঢ়ে আমাদের ইন্দ্রাণী কাছারিবাড়িতে পুন্যার (পুণ্যাহ)দিন একমণ করে রসকরা লাগে। প্রজারা কাছারিতে ভেট দিতে আসে। তাদের কিঞ্চিৎ মিষ্টিমুখ করাতে হয়।
হরিনাথ একগাল হেসে শফির উদ্দেশে বলল, তা দেওয়ানসাহেব ঠিকই বলেছেন, বাবা! শুধু ইন্দ্রাণী কেন, হরিণমারার জমিদারবাবুদের বাড়িতে শুভকাজ হলেই এ হরিনাথকে তক্ষুনি তলব। আপনারা বসুন দয়া করে।
বলে সে দোকানে ঢুকল। বারিমিয়াঁ বললেন, কী রে শফি? তুই মুখ গোমড়া করে আছিস কেন?
শফি হাসবার চেষ্টা করে বলল, না তো। এমনি। বারি চৌধুরী মিটিমিটি হেসে বললেন, বড়োগাজির কাছে তলোয়ারখেলা শিখছিলি। আমি হঠাৎ গিয়ে বাগড়া দিলাম বলে রাগ করে আছিস বুঝি? কাছারিবাড়িতে চল না। দেখবি, আমারও তলোয়ার আছে।
শফি আসলে তখনও শরীর থেকে গতির ঝাঁকুনি আর জড়তাটা কাটাতে পারে নি। বারি মিয়াঁ তার হাত ধরে বাঁশের মাচানে পাতা কম্বলের ওপর বসালেন। তারপর পাশে বসে বললেন, রসকরা খেয়েছিস কখনও?
শফি আস্তে বলল, বড়োগাজির সঙ্গে অমি নাশতা খেয়েছি। আর কিছু খাব না, চাচাজি।
তোকে নাশতা খাইয়েছে বড়োগাজি? বারি মিয়াঁ হেসে উঠলেন। খুব ভালো । ওকে আমি বলে রেখেছিলাম তোর দিকে নজর রাখতে। কারণ খোনকারের ছেলেটাকে আমি জানি। ভীষণ বখাটে ছেলে। ওর স্বভাবচরিত্রও নাকি ভালো নয়। এই বয়সেই কীসব কেলেঙ্কারি করে বসে আছে। তুই নিশ্চয় জানিস!
শফি অবাক চোখে তাকাল। সে জানে না।
হরিনাথ দুটি শালপাতার ঠোঙা এনে বলল, নিন দেওয়ান সাহেব।
শফি লক্ষ্য করল, সে দেওয়ানসাহেবের ছোঁয়া বাঁচাতে ডানহাতের ঠোঙাটি একটু ওপরে থেকে প্রায় থপাস করে ফেলে দিল। তার অবাক লাগাল, বারি চাচাজি দুহাত পেতে ঠোঙাটি লুফে নিলেন। শফি গোঁ ধরে বলল, আমি কিছু খাব না।
হরিনাথ একটু সাধাসাধির ভান করল। কিন্তু শফি হাত বাড়াল । তখন। বারি মিয়াঁ বললেন, ঠিক আছে, হরিনাথ। এতেই হবে। তুমি বরং জলের ব্যবস্থা করে।
বারি মিয়াঁ নিজের ঠোঙা থেকে একটা রসকরা তুলে জোর করে শফির মুখে খুঁজে দিলেন। শফি আড়ষ্টভাবে রসকরাটি গিলে ফেলল। মিষ্টান্নটি সুস্বাদু। কিন্তু এ মুহূর্তে তার কিছু খেতে ইচ্ছে করছিল না। একটু পরে হরিনাথ একটি কাঁচের গেলাস এনে কম্বলের ওপর রাখল। বারি মিয়াঁ শফিকে বললেন, গেলাসটা ধর শফি! হরিনাথ, ওকে জল দাও।
শফি গেলাসটি ধরলে হরিনাথ ঘটি থেকে আগের মতোই ছোঁয়া বাঁচিয়ে জল ঢেলে দিল। শফি গেলাসটা ধরে আছে দেখে বারি মিয়াঁ বললেন, কী? পানি খাবি নে?
শফি মাথা নাড়ল।
বারিমিয়াঁ ধমকের সুরে বললেন, তোর কী হয়েছে বল্ তো? মিষ্টি খেলি অথচ পানি খাবি নে কেন?
হরিনাথ হেঁ-হেঁ করে হেসে বলল, খাও বাবা জল খাও! মিষ্টি খেয়ে জল না খেলে অম্বলের ব্যামো হয়। অগত্যা শফি জলটা খেয়ে ফেলল। তার রাগ হচ্ছিল, এই ময়রা লোকটি তাদের অত খাতির করছে। অথচ ছুঁতে চাইছে না। এদিকে কম্বলখানা যে পেতে দিয়েছে, তাতে তারা বসে আছে– এই কম্বলখানাও কি সে ছোঁবে না? এই সময় তার মনে পড়ে গেল, হরিণমারা স্কুলের গেটে বিস্কুটওয়ালা বদলাদের কথা। বদলাদ তো হাতে হাতে বিস্কুট দেয় মুসলমান ছাত্রদের!…
কিছুক্ষণ পরে বারি মিয়াঁ জল খেয়ে গ্লাসটি কম্বলের ওপর রেখে পয়সা মেটালেন। হরিনাথ দুহাত পেতে লুফে নেওয়ার ভঙ্গিতে পয়সা নিল। আবার আদাব দিল। বলল, অধমের দিকে একটু দৃষ্টি রাখবেন, দেওয়ানসাহেব। কাছারিবাড়িতে গিয়ে দেখা করব’খন। একটুখানি নালিশ আছে।
কালো ঘোড়াটি মাচানের পাশে এসে দাঁড়িয়ে ছিল। পাথরের ঘোড়ার মতো সে স্থির। রাস্তার ওধারের বটগাছটি খানিক ছায়া পাঠিয়ে দিয়েছিল মাচান অব্দি। বারি চৌধুরী উঠে গিয়ে ঘোড়াটির গালে মৃদু থাপ্পড় মেরে আদর করতে-করতে বললেন, তোমার আবার কী নালিশ, হরিনাথ?
হরিনাথ করজোড়ে চাপা স্বরে বলল, আমার জ্যাঠতুতো দাদা–সেই অম্বিকা, সেই যে সেই–
বারি মিয়াঁ বললেন, কী করেছে অম্বিকা?
হরিনাথ ক্ষুব্ধ ভঙ্গিতে বলল, নগদ সাত টাকা পাঁচ আনা সেলামি গুনে দিয়ে অনাবদি জমিখানার বন্দোবস্ত নিয়েছি। নায়েবমশাই সাক্ষী –জিগ্যেস করে দেখবেন হুজুর! এখন অম্বিকা বলছে, ওই জমি নাকি আমার ঠাকুর্দার বন্দোবস্ত নেওয়া ছিল। আগের বছর ইস্তফা দিয়ে এসেছিল! আমি বললাম, বেশ –সেই ইস্তফানামা কাগজপত্র দেখাও।
