শফি তলোয়ারটার জন্য অস্থির। সে কিছুই কানে নিচ্ছিল না। করিম বখশ কোষবদ্ধ অস্থটি দুহাতে সসম্ভ্রমে নিয়ে এলে বড়োগজি উঠে দাঁড়ালেন। সেটি হাতে নিয়ে শফিকে ভীষণ চমকে দিয়ে নিষ্কাশিত করলেন। তারপর মহরম অনুষ্ঠানে তলোয়ারখেলার মতো বারকতক সঞ্চালিত করে হাসতে হাসতে বললেন, নাও, দ্যাখো। তবে তলোয়ারের দিন আর নেই রে, বাবা! এটা নেহাত পূর্বপুরুষের একটা স্মৃতিচিহ্ন– জাস্ট এ স্যুভেনির। র্যাদার –এ শো। যেমন আমি ফেলট্ হ্যাট পরি।
শফি তলোয়ারের মুঠো ধরে ওজন পরখ করল। ওজনদার। কিন্তু তার গায়ে কাঁটা দিল। হঠাৎ কী এক উত্তেজনা ভর করল তার শরীরে। মহরম অনুষ্ঠানে সে দেখেছে। তার আব্বার মতে, ওইগুলা শিয়াদের কফরি কাম। হানাফি মজহাবের লোকেরা হুজুগে ওইসব করে-টরে। সুন্নি মজহাব মুহরমের দিন রোজা রাখবে। এতিম-ফকিরকে দানখয়রাত করবে। হানাফিরা সুন্নি হয়েও শিয়াদের মতো কাম করে। তাজিয়া বানায়। দুলদুল’ ছিল হজরত হোসেনের ঘোড়র নাম। তওবা, তওবা! কোথায় হজরত হোসেনের দুলদুল, কোথায় এই হাড্ডিসার ঘোড়া! স্রিফ ‘শেরেকি’ (ঈশ্বরের অংশীদারি) কাম। বেরাদানে ইসলাম! মুহরমের দিন শোকের দিন। তলোয়ার নিয়ে কুস্তোকুস্তির দিন নয়। কান্নার দিন। প্রায়শ্চিত্তের দিন।
শফির কিছু অনুভূতি, যা ওই ধারালো, নকশাখচিত, ইস্পাতের বাঁকা, দীর্ঘ, সুচ্যগ্র বস্তুটি দেখতে-দেখতে এবং ছুঁতে-ছুতে সারা শরীরকে শক্ত করে ফেলছিল, ক্রমশ একটি বোধ এনে দিল। তার মনে হল, সে তলোয়ারটি দিয়ে সহজেই কাউকে বিদ্ধ করতে পারে। কেটে দু-টুকরো করে দিতে পারে। আর এ মুহূর্তে যেন বা সারা পৃথিবী তার করতলগত। সে ইচ্ছে করলেই শাহ (আলেকজানডার) হতে পারে।
আর সেইসময় বাইরে কেউ এসে ডাকল, গাজিসায়েব আছ নাকি? ও সদু!
বড়োগাজি দরজার দিতে ঘুরে সহাস্যে বলে উঠলেন, হ্যাল্লোও! এ বোলট ফ্রম দা ব্লু বলব, নাকি মেঘ না চাইতেই পানি বলব?
শফি ঘুরে দেখে, বারুচাচাজি।
দেওয়ান আবদুল বারি চৌধুরী ঘরে ঢুকেই শফিকে দেখে থমকে দাঁড়ালেন। বললেন, ও কী রে? তলোয়ার নিয়ে কী করছিস তুই? তারপর বড়োগাজিকে বললেন, ডন কুইকজোটিক কারবার কবে ছাড়বে ভাই, সদু? বয়স তো কম হল না।
শফি তলোয়ার টেবিলে রেখে বারুচাচাজির পদচুম্বন করতে এল। কিন্তু তিনি তাকে বাধা দিলেন। গম্ভীরমুখে বললেন, খোনকারের বাড়ি হয়ে আসছি। খোনকারের ছেলে বলল তুই এখানে আছিস। আয়!
বড়োগাজি হাঁ-হাঁ করে উঠলেন।… চলে যাচ্ছ কী? কী হয়েছে, বলবে তো?
বারিমিয়াঁ বললেন, পরে বলব’খন।
বাইরে গিয়ে শফি দেখল একটা কালো ঘোড়া বাঁধা আছে নিমগাছের গোড়ায়। বারুমিয় সেদিকে পা বাড়িয়ে বললে, মৌলাহাট থেকে আসছি। তোদের বাড়ির খবর ভালোই। তবে –চল, যেতে-যেতে বলছি। ইন্দ্রাণীর কাছারিবাড়ি থেকে বেরিয়েছিলাম সেই ভোরে। মৌলাহাটে গিয়ে নাস্তাপানি করিনি। চল, ইন্দ্রাণীর আগেই ফতেপুর বাজারে কিছু খেয়ে নেব…
০৮. কালো ঘোড়াটির পিঠে
….all my blood has turned
into her black poison/I am
the sinister glass in which
the shrew beholds herself.
–Baudelaire
কালো ঘোড়াটির পিঠে জিনের বদলে পুর তুলোর গদি এবং তার ওপর নকশাদার গালিচার সঙ্গে লাল জাজিম চাপানো ছিল। ঘোড়াটির কপালে সাজানো ছিল পেতলের। ঝকঝকে কলকা গড়নের সাজ। তাতে দুটি তলোয়ার আড়াআড়িভাবে খোদিত এবং শীর্ষে একফালি চাঁদ-তারা। হঠাৎ দেখলে মনে হবে, এটি বুঝি মহরম অনুষ্ঠানে সেই দুলদুল। আসলে এইসব প্রতীক ছিল নবাববাহাদুরের নবারি ঐতিহ্যের ইজ্জতের স্মারক। নবাববাহাদুর তাঁর প্রিয় দেওয়ানকে ঘোড়াটি উপহার দিয়েছিলেন। আর সেই কালো এবং নবারি ইজ্জতের প্রতীক ঘোড়াটির পিঠে দেওয়ান বারি মিয়াঁ যখন শফিকে দুহাতে তুলে ধরে বসিয়ে দিলেন, শফি বুঝতে পারল, মানুষটির গায়ের জোরও কম নয়।
প্রথমে কিছুক্ষণ ঘোড়াটি কদমে হাঁটছিল। চাষাভুষো মানুষজন সসম্ভ্রমে রাস্তার দুধারে সরে দাঁড়াচ্ছিল। সকলেই আদাব বা সেলাম দিচ্ছিল দেওয়ানসাহেবকে। স্ত্রীলোকেরা থোমটার ফাঁক দিয়ে প্যাটপ্যাট করে চেয়ে দেখছিল। শফি বারি চৌধুরীর পেছনে পুতুলের মতো বসে ছিল। সে প্রশ্ন করতে চায়নি, এভাবে তাকে কোথায়। নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। যেদিন ঠিক এমনি করে বারিমিয়াঁ তাকে হাতির পিঠে চাপিয়ে উলুশরার জঙ্গলে নিয়ে যান, সেদিনও তো সে প্রশ্ন করেনি!
তবে আজ তার এভাবে যাওয়ার মধ্যে চাপা একটা আড়ষ্টতা ছিল। সে বুঝতে পেরেছিল, সেদিন হাতির পিঠে যাওয়ার সঙ্গে আজকের এই ঘোড়ার পিঠে যাওয়ার। মধ্যে একা গুরুতর পার্থক্য কাছে। হরিণমারা পেরিয়ে গিয়ে শুকনো খটখটে সড়কে পৌঁছে বারি মিয়াঁ বললেন, আমাকে চেপে ধরে থাক এবার। নইলে ছিটকে পড়ে যাবি। তারপর শফি দেখল কালো ঘোড়াটি ছুটতে শুরু করেছে। প্রচণ্ড ঝাঁকুনি খেল শফি। একটু ভয়ও পেল। নিঃসাড় দুহাতে বারিমিয়াঁকে জোরে আঁকড়ে ধরল সে। আর সেই সময়, জীবনে এই প্রথম গতির সঙ্গে পরিচয় হল তার; সে গতি এমনই দ্রুততাপূর্ণ, এমনই দুর্দান্ত যে চরাচরের যাবতীয় রঙ-রূপ ও স্থিতি এককার হয়ে উলটো দিকে অপসৃত হতে থাকল। দুধারের বিস্তীর্ণ ধানখেত, ঘাস, গাছপালা, সবকিছুই হয়ে উঠল দাগড়া-দাগড়া সবুজ রঙের বিশাল একটা পোচ। শফি এই প্রথম গতি চিনল এবং জানল। সেই গতি তার শরীরকে কিছুক্ষণের জন্য জড়পিণ্ড করে ফেলল। তার চোখে পার্থিব সবকিছুই নিজস্বতা হারিয়ে একাকার হয়ে উঠল। সে জানল, গতি দুর্বার হলে মানুষ তার দৃষ্টিশক্তি যেন হারিয়ে ফেলে। সে অন্ধ হয়ে ওঠে। বাদশাহি সড়ক এবার ঢালু হয়ে উতরায়ে নেমেছে। জায়গায়-জায়গায় খানাখন্দে জল কাদা রয়েছে। কালো ঘোড়াটি প্রতিটি খানাখন্দ পার হবার সময় গ্রীবা আর মাথাটি উঁচু করে লাফ দিচ্ছিল আর প্রতিবার বারিমিয়াঁ শফিকে হুশিয়ার করে দিচ্ছিলেন। শফি আরও জোরে আঁকড়ে ধরছিল তাঁকে। কিছুক্ষণ পরে রাস্তা আবার শুকনো হয়ে উঠল। চড়াইয়ের দিকে মাথাতোলা রাস্তার দুপাশে এবার বাঁজা ডাঙা, তালগাছের সারি, কোথাও ঢিবির ওপর জীর্ণ মন্দির বা ভেঙেপড়া মসজিদ। ঘোড়ার খুরের আঘাতে ধুলো উড়ছিল। বারি মিয়াঁ শ্বাসপ্রশ্বাসের সঙ্গে বললেন, এদিকটায় এবার চাষবাস হয়নি। নেচার বড়ো খেয়ালি, শফি! ফতেপুর অব্দি এই অবস্থা।
