তার চেয়ে বড়ো ঘটনা চেয়ারে বসে টেবিলে খাওয়া। ভৃত্য করিম খাঞ্চায় (ট্র) সাজিয়ে আরেকপ্রস্থ খাদ্য এনে যত্ন করে সাজিয়ে দিল শফির সামনে। বড়োগাজি ঘোষণা করলেন, নাও, লেটাস বিগিন!
শফি লক্ষ্য করল, বারুচাচাজির মতো উনিও বিসমিল্লাহ উচ্চারণ করলেন না। পরোটা ছিঁড়ে চিবুতে শুরু করলেন। শফি অভ্যাসে বিসমিল্লাহ বলে হাত লাগালে বড়োগাজি তার দিকে তাকিয়ে একটু হাসলেন শুধু।
করিম একটু তফাতে দাঁড়িয়ে শফিকে সন্দিগ্ধদৃষ্টে দেখছিল। একসময় সে আর চুপ করে থাকতে পারল না। বলে উঠল, ইনি মৌলাহাটের পিরসাহেবের ছেলে না? হুঁ –তাই ভাবছি, চেনা-চেনা মনে হয়, অথচ –সালাম বাপজান! সে কপালে হাত ঠেকিয়ে আদাব দিল।
বড়োগাজি ধমক দিলেন।…দেখবি, আজ যেন চা ঠাণ্ডা না হয়। গিয়ে বল!
করিম যেতে-যেতে কিছু ফিরে বলল, উনি চাহা খাবেন তো ছার?
বড়োগাজি মুখ টিপে হেসে শফিকে বললেন, কী? চা চলবে তো?
শফি মাথা দোলাল। চলবে! চা সে জীবনে একবার খেয়েছে মনে আছে। তার একটি ভাই, যে ছোটোবেলাতেই মারা যায়, তার জন্মের সময় তার আব্বা বাড়িতে ছিলেন না। দূরের কোনো গ্রামে শিষ্যবাড়ি ছিলেন তখন! খবর পেয়ে উনি বাড়ি ফিরেছিলেন। সঙ্গে ‘চা’ এনেছিলেন। প্রসবের পর মেয়েদের শরীরের রস শুকোতে ‘ঝাল’ খাওয়ানো হয়। শফি জানে। পুঁটপিপুলের বাটনার সঙ্গে আতপচালের আটা আর গুড় রান্না করা হয়। খেতে বড় ঝাল। কিন্তু মিঠে। নাকচোখ দিয়ে জল বেরুলেও শফি তারিয়ে-তারিয়ে খেয়েছিল ঝাল। সেবার আব্বা চা খাওয়ালেন মাকে। কেমন একটা নতুন আর আশ্চর্য স্বাদ-গন্ধ! শুধু চা নয়, কেটলিও কিনে এনেছিলেন তার আব্বা। কেটলির ভেতর চায়ের পাতার গন্ধটা মনে আছে। তারপর আর কোনোদিন তাদের বাড়িতে চা হয়নি। কেটলিটা রাখা থাকত তত্তাপোশের তলায়। লুকিয়ে বের করে ঢাকনা খুলে শুঁকত শফি। যেন পেত সেই আশ্চর্য গন্ধটা। না পেলেও পেত!…
হাঁ-হাঁ করে উঠলেন বড়োগাজি!…ও কী! ওইটুকু খেয়ে বাঁচবে কী করে? সবটা খাও। তবে না একজন ফাইটার হবে। লড়াই করতে পারবে।
অমনি শফির মনে পড়ে গেল তলোয়ারটার কথা। তখন কথাটা সে তুলল না। বড়োগাজির পীড়াপীড়িতে অন্তত ফিরনিটা সবই খেতে হল। টেবিলের তলায় একটি সেলেপচি বা হাত ধোওয়ার পাত্র রাখা ছিল। কারুকার্যময় উজ্জ্বল পেতলের। সেলেপচিটি বড়োগাজি নিজেই টেবিলে তুললেন। শফির হাতে একটি সুন্দর ছোট্ট সোরাহি থেকে জল ঢেলে দিলেন। তারপর নিজের হাত রুমালে মুছে বললেন, ওয়েট আ বিট। করিম টাওয়েল এনে দিচ্ছে।
শফি রুমাল বের করল। এই রুমালটি রুকু তাকে দিয়েছিল। সবার সামনেই দিয়েছিল। রুমালটি রেশমের। মৌলাহাটে ‘মোমিন সম্প্রদায়’ বা তাঁতশিল্পীরা আছে। অন্য লোকে তাদের জোলা বলে। তাই রুমালের কাপড়টি ছিল স্থানীয় এবং রুকু তাতে লালসুতোয় আরবি হরফে ‘আল্লাহ’ শব্দ, তার তলায় একটি গোলাপ বুনে দিয়েছিল। দুই বোনই এসব কাজে বড় পাকা– আয়মনির উক্তি। আর সেই রুমালটিতে এতদিনে মুখ মুছে নোংরা করে ফেলেছিল শফি। বড়োগাজির দৃষ্টি এড়াল না। বললেন, রুমাল কাচো না কেন? সবসময় ফিটফাট থাকবে কেমন?
তারপর আবদুল চা আনল। সুন্দর চায়ের কাপ-প্লেট দেখে শফি আরও অভিভূত। তারপর চায়ে চুমুক দেওয়ামাত্র মায়ের কথা মনে পড়ে গেল তার। বুকের ভেতর একটা তোলপাড় জাগল। সঙ্গে-সঙ্গে সে ঠিক করে ফেলল, ছুটিটা সে বাড়িতেই কাটাবে।
কিন্তু তার আগে তলোয়ারটি দেখে যাওয়ার ইচ্ছে তাকে পেয়ে বসল। বড়োগাজি চা খেতে-খেতে কিছু ভাবছিলেন। শফি তাঁকে কী সম্বোধন করবে ঠিক করতে পারছিল না। চাচাজি বললে উনি রাগ করবেন। একটু পরে দ্বিধাজড়িত কণ্ঠস্বরে সে আস্তে ডাকল, গাজি আংকল!
ইয়েস! বডোগাজি মিটিমিটি হাসতে লাগলেন।
আপনার ঘোড়ার জিনে একটা তলোয়ার দেখেছিলাম।
দেখবে তুমি? বলে হাঁক দিলেন, করিম! করিম বখ্শ্!
করিম অন্দর থেকে দৌড়ে এসে বলল, ছার!
আমার তলোয়ার নিয়ে আয়। বলে শফির দিকে ঘুরলেন বড়োগাজি। বললেন, তলোয়ার ইংরেজি কী?
সোর্ড।
ব্র্যাভো! শাব্বাশ! বড়োগাজি টেবিলে থাপ্পড় মারলেন।…আমাদের ফ্যামিলির পদবি গাজি কেন জান? আমার পূর্বপুরুষ এ অঞ্চলে এসেছিলেন আকবর দা গ্রেটের আমলে। সেনাপতি মানসিংহের আনডারে মনসবদার ছিলেন একজন। তাঁর নাম ছিল ফরিদ খান। এই পরগনার নাম ছিল ফতে সিং পরগনা। ফতে সিং নামে একজন হাড়িবংশীয় রাজা– কুঁজোর সাধ যায় চিত হয়ে শুতে– যাকে দয়া করে। পরগনার জায়গিরদার করা হয়েছিল, সে বলল, আমি বদাশাহকে খাজনা দেব না । বোঝ অবস্থা। মানসিংহ এলেন বিদ্রোহদমনে। আব ফরিদ খান মনসবদার তলোয়ারের এক কোপে ঘ্যাচাং করে হাড়িরাজার মুভুটি কেটে পাঠিয়ে দিলেন দিল্লিতে বাদশাহের কাছে। বাদশা খুশি হয়ে খেতাব পাঠালেন সিলমোহর করে। অ্যানড দ্যাট ওয়জ দা মোসট অনারেবল টাইটেল অ্যামং দা মোসলেম ও গাজি। তুমি পিসাহেবের ছেলে। ডু ইউ নো হোয়াট ডজি ইট মিন?
শফি আবৃত্তি করল, কাফেরদের সঙ্গে যুদ্ধে যারা মারা যায়, তারা শহিদ। আর কাফেরদের যারা মারতে পারে তারাই গাজি।
দ্যাটস কারেকট। বড়োগাজি মুখে বললেন। আমরা গাজির বংশধর। কথা হচ্ছে, একসময় মোসলেমরা খ্রিস্টিয়ানদের সঙ্গে ক্রুসেড–আই মিন, জেহাদ করেছে। ইনডিয়াতেও ইংরেজের সঙ্গে মোসলেমরা লড়েছে। পলাশির যুদ্ধে হেরে গেছে। সেদিনও এইটটিন ফিফটিসেভেনেও শেষবার লড়াই করেছে। বেঙ্গলে হিন্দুদের ট্রেচারির জন্যই বাহাদুর শাহ ওয়জ ডিফিটেড। অ্যানড নাও এগেন দা টাইম হ্যাজ কাম। কিন্তু এ লড়াই অন্য লড়াই। ওয়র অফ ব্রেইন। ডু ইউ আনডারস্ট্যানড?
