ছুটি ঘোষণার দিন স্কুল থেকে ফেরার পথেই শফি পড়ে গেল বড়োগাজির পাল্লায়। দহলিজের বারান্দায় মাঝখানে খানিকটা গোলাকার অংশ বেরিয়ে এসেছে খোলা আকাশের নীচে। সেখানে লাইম-কংক্রিটের দুধারে অর্ধবৃত্তাকার বেনচ। মাঝখানে ফাঁকা এবং সিঁড়ির ধাপ। সেই বেনচে বসে বড়োগাজি বাসি স্টেটসম্যান পড়ছিলেন– রবির মতে, যা নাকি স্রেফ লোকদেখানো ভড়ং।
রবি হনহন করে চলে গেল। কিন্তু বড়োগাজির ‘শফিউজ্জামান’ ডাকটিতে কিছু ছিল, শফি দাঁড়িয়ে পড়েছিল। বড়োগাজি ডাকলেন, কাম অন মাই বয়, কাম অন!
শফি আড়ষ্টপায়ে সিঁড়ি ভেঙে উঠে গেল। বড়োগাজি বললেন, সিট ডাউন। তিনি তাঁর পাশের জায়গায় একটি থাপ্পড় স্থান নির্দেশও করলেন। শফি বসল।
বড়োগাজি বললেন, স্কুলের পুজো ভ্যাকেশন হল?
জি।
হাসতে লাগলেন বড়োগাজি।…পিরসায়েবের ছেলে তুমি! জি বলছ! ভেরি ওয়েল! তবে তোমার ওই দেওয়ানসায়েবের চেয়ে আমি এককাঠি সরেস। জি টি পসন্দ করি না।
শফি মৃদুস্বরে এবং একটু হেসে বলল, তাহলে কী বলব?
বড়োগাজি তার কাঁধে একটা হাত রেখে বললেন, তুমি আমাকে গাজি আংকেল বলবে! বলো তো আংকেল মানে কী?
কাকা –স্কুলের অভ্যাসে শব্দটি বলেই শফি শুধরে নিল। চাচা।
বড়োগাজি ঠিক বারু চৌধুরির প্রতিবিম্বের মতো অট্টহাসি এবং ভঙ্গি করে বললেন, কাকা, চাচা, খুড়ো, জ্যাঠা, মামা –এভরিওয়ান। কিন্তু তুমি কাকা বললে, ওটা কিন্তু মুসলমানি ওয়ার্ড। তুর্কি সুলতানদের আমলে কাকা চালু হয়েছিল। দ্যাটস এ টার্কি ওয়ার্ড।
বলে বড়োগাজি চোখ নাচিয়ে চাপা স্বরে ফের বললেন, পুজো ভ্যাকেশানে বাড়ি যাচ্ছ তো?
শফি আস্তে মাথাটা শুধু নাড়ল। সে নিজেই জানে না কী করবে।
বড়োগাজি একই ভঙ্গিতে বললেন, সেদিন দেওয়ানসাহেবের কাছে শুনলাম লেট তোফাজ্জেল চৌধুরির যমজ মেয়েদের সঙ্গে তোমাদের দু-ভাইদের বিয়ে হবে?
শফি চুপ করে থাকল।
তোফাজ্জেলও আমার বন্ধু ছিল। বড়োগাজি একটু গম্ভীর হয়ে বললেন, ওকে সবাই তোফা চৌধুরি বলে ডাকত। কেন জান? লাইফটাকে সে আনন্দে কাটাতে চাইত। হি ওয়াজ আ ম্যান অফ প্লেজর।…তো দা পুওর ম্যান ফেল্ড আ ভেরি-ভেরি স্যাড ডেথ। রাস্তার মরে পড়ে ছিল।
শফি তাকাল। তাকে তো একথা কেউ বলেনি।
বড়োগাজি আস্তে বললেন, হি ওয়জ আ ফুলিশ ম্যান। তুমি নিশ্চয় আশরাফ আজলাফ বোঝ।
জি।
আবার জি? বড়োগাজি কপট ধমক দিলেন। তারপর বললেন, আজলাফ ঘরের মেয়েকে বিয়ে করাটাতে দোষের কিছু নেই। আমিও–তো…বড়োগাজি থেমে গেলেন হঠাৎ। মুখ তুলে সামান্য দূরে একটা তালগাছের দিকে তাকিয়ে থাকলেন কিছুক্ষণ। তারপর একটু হাসলেন।… দেওয়ানসাহেবের মতে, তোমার বিয়ে করাটা ঠিক হবে না। আর আমার মতেও তাই। আমরা চাইছি, মুসলমান ছেলেরাও ইংরেজি স্কুলে পড়ুক। যে মুসলমান এই সেদিন পর্যন্ত বাদশাহি করেছে, সে মুসলমান হিন্দুর গোলাম হয়ে যাবে –এটা সহ্য করা যায় না। ক-বছর ধরে ফাইট করে হরিণমারা স্কুলে মৌলবি টিচার রাখতে বাধ্য করেছি। মুসলমান ছাত্র আরবি-ফারসিও শিখুক, আবার ইংরেজি শিখুক। কেন? না-আরবি-ফারসি শিখলে সে তার পূর্বপুরুষের কালচার-সিভিলাইজেশান কী ছিল, জানতে পারবে। আর ইংলিশ শিখলে সে। হিন্দুদের গোলামে পরিণত হবে না। কী? ‘মাই হ্যাজ’?
শফি চুপচাপ ইংরেজি খবরের কাগজের দিকে তাকিয়ে ছিল। খয়রাডাঙার। জমিদারকেও সে ইংরেজি কাগজ পড়তে দেখেছে। চোখে পড়লে বড়োগাজি কাগজগুলো ভাঁজ করে কপট লুকোনোর ভঙ্গিতে বললেন, ওসব পরে– পরে হবে। কথা হচ্ছে, তোমাদের স্কুলে যখন ফাইনাল একজামিনেশন, তখনই তোমার বিয়ের দিন ধার্য হয়েছে। দেওয়ানসাহেবকে আমি বললাম, ঠিক আছে। আই অ্যাম হেয়ার– দা টাইগার অফ হরিণমারা। লোকে আড়ালে আমাকে বলে বাঘাগাজি। জান তো?
শফি মাথা নাড়ল।
জেনে রাখো। তো–
এইসময় দলিজঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে একটা লোক মৃদুস্বরে বলল, নাশতা, ছার!
বড়োগাজি শফির হাত ধরে ওঠালেন। কাগজগুলো বগলদাবা করে হাসতে হাসতে বললেন, করিমকে কিছুতেই স্যার শেখাতে পারলাম না, বুঝলে? ছার! ভেংচি কাটলেন করিমের উদ্দেশে, ছা–আ–র। ধুর হতভাগা। যা, গিয়ে বল, একজন খুদে গেস্ট আছে। বুঝলি তো?
করিম দাঁত বের করে বলল, বুঝেছি। ম্যামান ছার।
বড়োগাছি তেড়ে গেলেন।…মেহমান বলতেও পারে না। বুঝতে পারলে শফি? এই তো মুসলমানের অবস্থা। না ঘরকা না ঘাটকা।
ঘরের ভেতর ঢুকে শফি অবাক হয়ে দেখল, স্কুলের লাইব্রেরি-ঘরের মতো সারবন্দি বইভরতি আলমারি। চেয়ার, টেবিল, আরামকেদারা। দেয়ালে বাঁধানো সব অচেনা মানুষের ছবি। শফি আব্বা-আম্মার কাছে জেনেছে, মানুষ বা জীবজন্তুর ছবি মুসলমানের জন্য হারাম (নিষিদ্ধ)। ঘরের একপাশে একটি নকশাকরা পালঙ্ক। পালঙ্কে সুন্দর বিছানা। কিন্তু বিছানার ওপাশে দেওয়াল ঘেঁসে এলোমেলো প্রচুর বই-কাগজ। শফি ভাবল, বড়োগাজি তাহলে রাতে এখানেই শোন।
টেবিলের কাছে তাকে নিয়ে গেলেন বড়োগাজি। একটি চেয়ারে বসিয়ে দিলেন। অন্যদিকে মুখোমুখি নিজে একটা চেয়ারে বসলেন। টেবিলে সুদৃশ্য দস্তরখান। তার ওপর রাখা আছে নকশাদার চীনামাটির থালা আব ততরি (ছোটো প্লেট)-তে একরাশ সুখাদ্য। থালায় আছে পরোটা, প্লেটে ভুনা গোশ আর ফিরনি। ফিরনিতে কিসমিস দেওয়া আছে। একটা প্লেটে শাদা ঘন কাথের মতো লাচ্ছা সেমাই। শফি খোনকারবাড়ি সকালের নাশতার কথা ভাবছিল। রোজ সকালে রবি আর সে একথালা মুড়ি-গুড়, কিংবা গুড়ের বদলে দুটুকরো বাতাসা খায়। কোনো-কোনোদিন মিষ্টি আচার দিয়ে পান্তাভাতও। একদিন রবির দুলাভাই (জামাইবাবু এসেছিল বলে তিনিসুদ্ধ তত্তাপোশে দস্তরখান পেতে পরোটা-সুজি আর আর হালুয়া খাওয়া হয়েছিল।
