অথচ শফির একলা থাকার বড়ো ইচ্ছা। রুকুর সঙ্গে বিয়ের কথা শোনার পর থেকে সে একলা হয়ে ওইসব নিয়ে ভাবতে চায়। কিন্তু রবি তাকে সঙ্গছাড়া করার পাত্র নয়! রবিকে সে পাত্তা না দিয়ে পারে না। তাদের বাড়ি ‘জায়গির’ আছে সে। একটা আনুগত্যবোধ শফিকে দমিয়ে দেয়।…
পুজোর ছুটি যে এমন করে ঘোষিত হয়, শফি জানত না। খয়রাডাঙা ছিল মুসলিম প্রধান গ্রাম। ওখানে ছিল মাদ্রাসা-স্কুল। হরিণমারা হিন্দুপ্রধান গ্রাম। গন্ডায় গণ্ডায় জমিদার। তাঁরা সবাই ব্রাহ্মণ। প্রসন্নময়ী হাই ইংলিশ স্কুলে পুজোব ছুটি ঘোষণা যে সকালবেলায় হয়, শফি জানত না। সেই গ্রীষ্মকালে ভরতি হওয়ার পর মরনিং স্কুল করেছে। এদিন ভোরে রবি তাকে ঝটপট শার্ট-পেনটুল পরে স্কুলে যেতে বলায় অবাক হয়েছিল। গিয়ে সে অবাক হল! স্কুলের গেটে ছাত্ররা দেবদারুপাতা এনে তোরণ গড়ছে। বারান্দার থাম ঘিরেও দেবদারুপাতা,গাঁদাফুল, পদ্মফুল, জবাফুল থরেবিথরে সাজানো। বিশাল এক হলঘরে কাঠের ফুট ছয়েক উঁচু দেয়াল তুলে চারটে ক্লাস। ফাইভ থেকে এইট। তার ওধারে ফার্স্টক্লাস আর সেকেনড ক্লাস। মধ্যিখানে ওইরকম কাঠের দেয়াল। তার পাশের বড়োঘরটিতে অফিস আর লাইব্রেরি । আজ সকালে হলঘরে ঢুকে ফুলের ঝাঁঝালো গন্ধ শফিকে চমকে দিল। মুহূর্তে তার মনে হল, হিন্দুরা ফুল কেন এত ভালোবাসে? অথচ তার মৌলানা। আব্বা মুরিদদের সামনে ওয়াজনসিহতের সময় আরবিবাক্য উচ্চারণ করের বাঙলায় ব্যাখ্যা করেন, আমার হুজুর মুহম্মদ সাল্লাল্লাহ আলাইহেসসাল্লাম বলেছেন, হে মোমিনগণ! দিনে যদি দু পয়সা কামাও, তো এক পয়সার রুটি কেনো, আরেক পয়সার ফুল কেনো। আমার রসুলে করিম (সাঃ আঃ) ফুল ভালোবাসতেন। খুশবু (সুগন্ধ) ভালোবাসতেন।…শফির সেই মুহূর্তে মনে হল, তবু ফুলের সঙ্গে মুসলমানদের কোনো সম্পর্ক নেই কেন? আর হিন্দুরাই বা কেন ফুল ভালোবাসে? হরিণমারায আসার পর জীবনে এই প্রথম এত বেশি হিন্দু সে দেখেছে। হিন্দুবাড়ি– সে হোক না কেন, কুনাই-বাউরি অথবা একেবারে নিরন্ন মুনিশখাটা মানুষ, তার বাড়ির উঠোনে উজ্জ্বল ফুলফোঁটা গাছ থাকবেই থাকবে। এই শরতের সন্ধ্যাসকাল হিন্দুপাড়া ভেতর দিয়ে যেতে-যেতে শফির স্নায়ুকে চমকে দেবেই শিউলির গন্ধ। সেই শিউলির মালায় সাজানো কাঠের দেয়াল। এত সুঘ্রাণ আর কখনও আবিষ্ট করেনি শফিকে। সৌম্যেন্দু এসে তার কাঁধে হাত না রাখলে এই সুগন্ধের ভেতর ঘনীভূত হয়ে যেত যেন তার সত্তা। সে ভীষণ চমকে উঠে ফ্যালফ্যাল করে তাকাল। সৌম্যেন্দুর পরনে ঝকঝকে ফুলশার্ট, সোনার বোতাম, এবং আজ সে ধুতি পরেছে, কিন্তু শার্ট তার ধুতির ভেতর গোঁজা। রামকৃষ্ণ ভূগোলস্যারের মতো। রামকৃষ্ণবাবু বারোমাস ওইভাবে ধুতির ভেতর শার্ট খুঁজে কোট গায়ে স্কুলে আসেন। শফি দেখল, সৌম্যেন্দুর হাতে জড়ানো শিউলিফুলের মালা। কপালে একটু লাল ছোপ। সৌম্যেন্দু বলল, তুমি একলা দাঁড়িয়ে কেন শফি? শফি হাসল, এমনি। সৌম্যেন্দু তার কাঁধ ধরে নিয়ে চলল স্কুলবাড়ির বাইরে। কলকেফুলের জঙ্গলের ভেতর ঢুকে শফি দেখল। রবি, পোদো, বিনোদ, কালীচরণ বসে বিড়ি ফুকছে। সৌম্যেন্দু পকেট থেকে একটা বিস্ময়কর জিনিস বের করল। সেটি একটি সিগারেটের প্যাকেট। পুরো দলটা হকচকিয়ে গেল। সৌম্যেন্দু সবাইকে একটা করে সিগারেট বিলি করল। শফি বারুচাচাজিকে সিগারেট খেতে দেখেছে। সিগারেটের গন্ধটা তার ভালো লাগে। জীবনের প্রথম সিগারেট টেনে শফির কিন্তু ভালো লাগল না। সে রবির কাছে বিড়ি টানতে শিখে গেছে। বিড়িই সিগারেটের চেয়ে সুস্বাদু মনে হচ্ছিল তার। তবু সিগারেট খুব সামান্য জিনিস নয়– দামিও বটে! তার চেয়ে বড়ো কথা, সৌম্যেন্দু তাকে এমন করে ডেকে এনে সিগারেট দিয়েছে। সে হাসিমুখে টানতে থাকল।
শফি সেই প্রথম আবিষ্কার করেছিল, পৃথিবীতে অজস্র সুন্দর-সুন্দর ঘটনাবলী ঘটে। আছে বহু চমকেঁদেওয়া সুখের মুহূর্ত। সেই প্রথম তার মনে হয়েছিল, এই পৃথিবীতেই আছে এমন সব জিনিস, যার তুলনায় মা-বাবার কাছে শোনা বেহেশতের। জিনিসগুলোও হয়তো তুচ্ছ হয়ে উঠবে। এখানে আসার পর শফিকে কেউ আগের। মতো ‘পিরসাহেবের ছেলে’ বলে আপনি-টাপনি করে না। রাস্তা থেকে সসম্ভ্রমে সরে দাঁড়ায় না কোনো মানুষ। বউঝিরা ঘোমটার ফাঁকে তার দিকে চেয়ে থাকে না। স্কুলের মাস্টারমশাইরাও তাকে পাত্তা দেন না। এমন কী, একদিন পদ্য মুখস্থ বলতে না পারায় তাকে বেনচে উঠে দাঁড়াতেও হয়েছিল। একটা তীব্র অভিমান তাকে কাঁদিয়ে ছেড়েছিল। ভেবেছিল, সেদিনই মৌলাহাটে পালিয়ে যাবে। কিন্তু ক্লাসসুদ্ধ সেদিন পদ্য মুখস্থ বলতে পারেনি। বাঙলার স্যার হরিপদবাবুর গলাটি ছিল জোরালো। গতিক দেখে হেসে ফেলেছিলেন, এ যে দেখছি ঠক বাছতে গাঁ উজোড়। সিট ডাউন! শফি বসছে না দেখে হরিপদস্যার খাপ্পা হয়ে গর্জেছিলেন, সিট-ডাউন! তারপর শফি বসেছিল। তখন হরিপদবাবু মুচকি হেসে বললেন, তুমি সেই পিরবাবার ছেলে না? পরে রবি চুপিচুপি বলেছিল, হরিমাস্টারের মেয়ে বাণীকে ভুতে পেয়েছে। তোর আব্বার কাছে তাবিজ এনে দিয়েছেন আমার আব্বা। হরিমাস্টার আব্বাকে বলেছে, কেউ যেন জানতে পারে না। জানলে একঘরে করবে। শফি বলেছিল, কেন? খয়রাডাঙার যে পিরের গান ভেঙে দিয়েছেন আব্বা, সেখানে তো হিন্দুরাও মানত দিত। রবি বলেছিল, ধুর বোকা! সে তো মাজার। হিন্দুরা ঢিবি-টিবি দেখলেই পেন্নাম ঠোকে। আর তোর আব্বা তা মানুষ-পির!….
