স্কুলে পুজোর ছুটির আগের দিন বিকেলে শফি তার বন্ধুদের সঙ্গে বাদশাহি। সড়কে কাঁদরের সাঁকোর ধারে বসে আছে। দিনশেষের কুয়াশামাখানো ধূসর আলোয় আবার বড়োগাজিকে ঘোড়া ছুটিয়ে আসতে দেখল শফি। সড়কে বর্ষার কাদা শুকিয়ে কোথাও-কোথাও ধুলো জমেছে। অনেকদিন বৃষ্টি হয়নি। চাষিরা উদ্বিগ্ন। উঁচু জমির ধানখেতে মাটি শুকিয়ে যাচ্ছে দ্রুত। কাঁদরের জল ‘দোন’ (দ্রোণী) দিয়ে দিনমান সেচ দিচ্ছে অনেকে। বড়োগাজির ঘোড়াটা ধুলো উড়িয়ে আসতে-আসতে সাঁকোর। কাছে থেমে গেল। শফিরা গল্প করছিল। থেমে গিয়ে তাকিয়ে রইল। বড়োগাজি ঘোড়া থেকে নেমে সড়কের নিচে কাঁদরের ধারে গেলেন। দোনে সেচ-দেওয়া চাষি লোকটির সঙ্গে চাপাগলায় কথা বলতে থাকলেন। দোন থামিয়ে লোকটি সেলাম। দিয়ে সসম্ভ্রমে কথা বলছে। তারপর শফি ঘোড়াটার দিকে তাকাল। এ ঘোড়াটা তার স্বপ্নে দেখা ঘোড়া নয়। একে তেজী আর রাগী দেখাচ্ছিল। মুখে লাগামপরা ঘোড়াটি স্থির দাঁড়িয়ে আছে। ছেলেগুলো একটা হ্রেষাধ্বনির প্রতীক্ষা করছিল। কিন্তু ঘোড়াটি চুপ। তারপর বড়োগাজি কদরের ধার থেকে সড়কে উঠে এলেন। তখন ঘোড়াটিকে চঞ্চল দেখাল। মনে হল, সে বড়োগাজিকে পিঠে নিয়ে বহু ক্রোশপথ পেরিয়ে যেতে তৈরি। ঠিক এই মুহূর্তে শফির মনে হল, এতদিন সে বারুচাচাজির হাতিটির মতো একটি হাতির সাধ করে এসেছে। কিন্তু হাতি নয়, তার যদি এমন একটি ঘোড়া থাকত! তার শরীর শিউরে উঠল। বুকের ভেতর একটা চাপা আবেগ দুলে উঠল। আর বড়োগাজি তখন তার সামনে। মুখে মিটিমিটি হাসি। মাথায় ইংরেজ-টুপি, শার্ট-ব্রিচেস-বুটপরা, শকুনের মতো বাঁকা নাক, সাতমার কাল্লুখার মতো গোফ-জুলফিওয়ালা মুখ, তামাটে রঙের মানুষটির চোখে চোখ পড়তেই শফি চোখ নামাল। বড়োগাজি বললেন, তুমি মৌলাহাটের পিরসাহেবের ছেলে না? তারপর পোদোর দিকে তাকিয়ে বললেন, তুমি প্রহ্লাদ ঘোষের ছেলে –হুঁ, কী যেন নাম তোমার?
তুখোড়, গোঁয়ার এবং সাহসী বলে পরিচিত পোলদা নেতিয়ে গিয়ে বলল, আজ্ঞে হরেন্দ্রকুমার ঘোষ।
বড়োগ্নাজি বললেন, আর ওটা কে রে? চেনা-চেনা মনে হচ্ছে?
রবি ঝটপট বলল, সমু। বড়োরায়বাবুর ছেলে, চাচাজি।
কী হে? বড়োগাজি চোখ নাচিয়ে রবি আর শফিকে দেখিয়ে বললেন, তুমিও এই পাতি-নেড়েদের দলে জুটলে কেন?
সৌম্যেন্দু হাসল। কোত্থেকে আসছেন গাজিজ্যাঠা?
জবাব না দিয়ে বড়োগাজি শফির দিকে তাকিয়ে বললেন, তোমার নামটা কী যেন
শফি গম্ভীরমুখে বলল, শফিউজ্জামান।
ইন্দ্রাণীর কাছারিতে দেওয়ানসায়েবের সঙ্গে দেখা হল। বড়োগাজি বললেন। তোমার সব কথা শুনলাম। শুনে ভালোই লাগল। তুমি কি জান দেওয়ান বারু চৌধুরি আমার বুজ ফ্রেনড?
শফি তাকিয়ে রইল।
বড়োগাজি হাসলেন। হি ইজ ইওর গার্জিয়ান। দেয়ারফোর আই অ্যাম অলসো ইওর গার্জিয়ান। বুঝলে কিছু? নাকি ‘মাই হ্যাজ এ হর্স’ বুঝলে?
ধেড়ে ছেলেগুলো খ্যা-খ্যা খি-খি করে হাসতে লাগল। শফি মুখ নামিয়ে ঘাস ছিঁড়তে থাকল।..
বড়োগাজি বললেন, দেওয়ানসায়েবের কাছে শুনলাম তুমি ইনটেলিজেনট ছেলে। কিন্তু ট্রেনিং-এর অভাবে তোমার এ অবস্থা। তোমাকে বলেছিলাম আমার কাছে ইংরেজি পড়তে এসো। আসছ না কেন?
রবি দ্রুত বলল, যাবে। কাল সকালেই নিয়ে যাব।
বড়োগাজি তার ঘোড়ার কাছে গিয়ে জন্তুটার চোয়ালে হাত বুলিয়ে তারপর রেকাবে পা রেখে পিঠে উঠলেন। এতক্ষণে শফির চোখে পড়ল, ঘোড়ার পিঠে জিনের পাশে একটা বাদামি রঙের ভেলভেটের খাপে টাকা তলোয়ার ঝুলছে। ঘোড়াটা চোখের সামনে দিয়ে চলে গেল। তারপর শফি আস্তে আস্তে বলল, বড়োগাজির ঘোড়ায় তলোয়ার ঝুলছে কেন রে?
সৌম্যেন্দু জমিদারবাড়ির ছেলে। সে বলল, বাবাও যখন ঘোড়ায় চেপে কোথাও। যান, এমনি সোর্ড থাকে। সে-সোর্ড দেখলে তোমার মুণ্ডু ঘুরে যাবে! প্রকাণ্ড! আমার ঠাকুর্দা ওই সোর্ড দিয়ে ডাকাতদের সঙ্গে যুদ্ধ করেছিলেন।
রবি বলল, এই সমু! তোদের হলঘরখানা একবার দেখিয়ে আনব শফিকে। কখন যাব, বল?
সৌম্যেন্দু বলল, পুজোর দিন যাস! অষ্টমীর দিন রাত্রিবেলা। দেখবি একশো আটখানা পাঁঠা বলিদান হচ্ছে।
ধুস! রবি বলল। সে নয়। তোদের হলঘরখানা দেখাতে বলছি। জানিস শফি? কত হরিণের মাথা, আস্ত বাঘ, হাতির পা। উরে আল– বলেই সে সামলে নিল। আল্লাখোদা বা মুসলমানি বুলি সে হিন্দু বন্ধুদের সামনে উচ্চারণ করে না।
পোদো হেঁ-হেঁ করে হেসে বলল, শালা নেড়ের বাচ্চা! আল্লাতান্না কথায় কথায়।
বিনোদ হাসতে-হাসতে বলল, মাইরি বড়োগজি কী জিনিস রৈ! নিজে মোছলমান হয়ে রবি আর শফিকে দেখিয়ে আমাদের বলে গেল কী শুমলি তো? বলে, পাতিনেড়ে!
কালীচরণ বলল, হ্যাঁ রে রবি? তোদের নেড়ে কেন বলে রে?
সৌম্যেন্দু বলল, মোচলমানরা যে গোরু খায়।…
পরে রবি চুপিচুপি শফিকে বলত, হিন্দুদের সব ভালো। শুধু এই একটা জিনিস বড্ড খারাপ লাগে। ঠাট্টা-ইয়ারকি হোক, যাই হোক, গোরু খাওয়া-টাওয়া আর নেড়ে-টেড়ে বলা– এ কিন্তু সহ্য হয় না। ভাবি মিশব না ওদের সঙ্গে। কিন্তু আর কার সঙ্গে মিশব বল? সেখপাড়ার ছেলেগুলোর সঙ্গে? যত্তসব চাষাভুষো রাখাল-বাগালের দল! খালি গোরু-বলদের আর চাষবাসের এঁড়ে গল্প!
রবি এসব কথা বলে। আবার বিকেল হলেই ছুটে যায় হিন্দুপাড়ার দিকে। ঠাকরুনতলার কাছে প্রথমে পোদোকে ডেকে নেয়। জীর্ণ শিবমন্দিরের চত্বরে একটু অপেক্ষা করতেই এসে পড়ে বিনোদ, কালীচরণ– ইদানীং জমিদারবাড়ির ছেলে সৌম্যেন্দুও জুটেছে দলবেঁধে বাদশাহি সড়কের দিকে হাঁটতে থাকে।
