শফি হনহন করে হাঁটতে লাগল। জীবনে এ এক প্রচণ্ড পরাজয়ের লজ্জা তাকে খেপিয়ে দিচ্ছিল। তা ছাড়া একটু আগে সে ওই লোকটার মুখে তার আব্বার নিন্দাও। শুনেছে। রবি ধুকুর-ধুকুর করে প্রায় দৌডে তার নাগাল নিচ্ছিল। সে ওকে বোঝাতে চাইছিল বড়োগাজি লোকটি এমনি। বড় আমুদে আর বাঁচাল স্বভাবের মানুষ। শফি, ওর এ অব্দি কতগুলো নিকে, জানিস? এগারোখানা– আল্লার কসম। এখন দুখানা টিকে আছে। তার একখানাকে ছাড়ব-ছাড়ব করছে। আসলে ছোটোবেগমটা হল ছোটো ঘরের বেটি । ওর বাপ ছিল বিলপারের বুনো গাঁ কাঁদুরির হোসেন কাঠুরে। জঙ্গলে কাঠ কেটে বেড়াত। আর নসু –মানে তার বেটি, যে এখন বড়োগাজির ছোট বউ, বুঝলি তো তারও আঠারোখানা নিকে। কোনো লোকের ‘ভাত খায়নি। নিকে করত আর কদিন পরেই লোকটার বুকে লাথি মেরে পালিয়ে আসত। হোসেন কাঠুরে ছিল আসলে মস্ত খুনে ডাকাত। তার ভয়ে লোকটা বাপ-বাপ বলে তালাক দিতে পথ পেত না। একদিন হয়েছে কী শান, বড়োগাজি যাচ্ছে ঘোড়ায় চেপে কাঁদুরিতে একটা সালিশি করতে। রাস্তায় দেখা নসুর সঙ্গে। তারপর কী হল কে জানে, হঠাৎ দেখি, নসু বলাই হাজির বউ হয়ে এল আমাদের গাঁয়ে। সেখপাড়ার বলাই হাজিকে তুই দেখিসনি। থুখুড়ে বুড়ো। তার ‘ভাত খাবে’ কেন জোয়ান মেয়ে? বলাই হাজি নাকি বরকত নামে তার বাড়ির মাহিন্দারের সঙ্গে খড়কাটা ঘরে নসুকে শুয়ে থাকতে দেখেছিল। তাড়া খেয়ে নসু এল পালিয়ে এসে কোথায় ঢুকল জানিস তো? বড়োগাজির বাড়িতে। সন্ধ্যাবেলা বলাই হাজির রাগ পড়ল। তখন শালা বুড়ো লণ্ঠন হাতে বড়োগাজির বাড়ির দরজায় এসে কান্নাকাটি করে ডাকাডাকি করতে লাগল। বড়োগাজি বললেন, এখন যাও হাজিসায়েব। বুঝিয়ে সুঝিয়ে পাঠিয়ে দেব। কিন্তু রাত গেল, দিন গেল। নসু ফেরে না। বলাই হাজি গিয়ে কান্নাকাটি করে। শেষে বড়োগাজি বললেন, হাজিসায়েব। মনে হচ্ছে, নসুবিবি তোমার ভাত আর খাবে না। ওকে বরঞ্চ তালাক দাও। বুঝলি তো শফি, বড়োগাজি হল এ তল্লাটের এক মানুষবাঘ। বাঘের ঘরে পুষ্ট কাউ। হিঃ হি হিঃ!
রবি খুব হাসতে লাগল। নসু হয়ে গেল নাসিমা বেগম। চাষার মেয়ের বরাত! মিয়াঁবাড়ির বেগম। ইদানীং শুনেছি, বড়োগাজির বড়ো বউ, সে আবার কোন সাবডেপুটি ম্যাজিসট্রেটের বোন, তার সঙ্গে দিনরাত খিটিমিটি চলছে নসুর। নসু বলছে, পরদায় বাঁধা সে থাকতে পারছে না। যখন-তখন খিড়কির দরজা দিয়ে বেরিয়ে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। বড়োগাজি তো– (অশ্লীল শব্দ) পেলেই খুশি। বকাঝকা করে না। কিন্তু এবার নাকি নসুর এক কীর্তি দেখেছে।
রবি শফির কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিসিয়ে বলল, বলাই হাজির মতোই বড়োগাজি কদিন আগে হাতে-নাতে ধরেছে নসুকে। মোমিনপাড়ার রুহুলের সঙ্গে দিনদুপুরে আখের খেতে– আল্লার কসম! বড়োগাজি বন্দুক নিয়ে আখের জমির চারপাশে ঘোরে আর গুলি মারে। চক্কর দেয় আর গুলি মারে। রুহুল কোন ফাঁকে সুরুত করে পালিয়ে গিয়েছিল। নসু বলেছে, মিয়াঁবাড়ির পায়খানায় বসতে পারে না। অভ্যেস নেই কিনা! আখের ভুইয়ে হাগতে গিয়েছিল।
রবি শফিকে জড়িয়ে ধরে হাঁটতে লাগল। হাসির চোটে সে ঝুঁকে পড়ছিল । একটু পরে সে আবার ফিসফিসিয়ে উঠল, আল্লার কসম– নসুকে আমিও একদিন– যখন বলাই হাজির বিবি ছিল, তখন –কী? বিশ্বাস হচ্ছে না?
শফি চুপ করে রইল। শুধু একবার তাকাল রবির দিকে। রবি চোখ নাচিয়ে বলল, বোশেখ মাসের দুপুরবেলা। তখন কী খাঁ খাঁ অবস্থা হয় জানিস তো? হাজি গিয়েছিল বিলের জমিতে বোরো ধান দেখতে। বাড়ি ফাঁকা। দরজায় উঁকি মেরে দেখি, নসু চিত হয়ে শুয়ে আছে। যা আছে কপালে বলে ঢুকে পড়লাম। ও শফি! তোকে কী বলব? নসুর ওপর গিয়ে যেই পড়েছি, নসু আমাকে জড়িয়ে ধরে কামড়াতে লাগল। ও এক রাক্ষুসি মাগি, আল্লার কসম!….
সেদিনই বিকেলে স্কুলে ছুটির পর দলবেঁধে শফি বন্ধুদের সঙ্গে আসছে, পেছনে ঘোড়ার পায়ের শব্দ শোনা গেল। দলটা রাস্তার একধারে দাঁড়িয়ে গেল। শফি দেখল, কালচে-লাল একটা ঘোড়ার পিঠে চেপে বড়োগাজি চলে গেলেন। পরনে ব্রিচেস, ছাইরঙা শার্ট, মাথায় একটা অদ্ভুত টুপি– বইয়ের ছবিতে এক ইংরেজ সায়েবের মাথায় যেমন টুপি শফি দেখেছে। সে অবাক চোখে তাকিয়ে রইল।
স্কুলটি গ্রামের বাইরে মাঠের ধারে। তার একপাশে বাদশাহি সড়ক। প্রতিদিন মিয়াঁপাড়ায় একই রাস্তায় শফি আর রবি স্কুল থেকে ফেরে। ফেরার পথেই গাজিদের একতালা বিশাল বাড়িটা পড়ে। দহলিজঘরটা রাস্তার ধার ঘেঁষে। কিন্তু বড়োগাজিকে সে দেখেনি বা লক্ষ করেনি এতদিন। আজ সেখানে পৌঁছে দেখল, বড়োগাজি নেই, কিন্তু পাশের একটুকরো খোলামেলা ঘাসজমিতে সেই ঘোড়াটিকে টহল খাওয়াচ্ছে একটা লোক। ঘোড়াটি ভালো করে দেখার জন্য শফি দাঁড়িয়ে গেল। কিন্তু রবি। তাকে দাঁড়াতে দিল না।
সে-রাতে শফি ঘোড়াটাকে স্বপ্নে দেখল। ঘোড়াটার চোখ টানা-টানা, প্রচণ্ড লাল। আর সেই চোখে কাজল পরানো। ঘোড়াটাকে কেন যেন খুব বিষণ্ণ দেখাচ্ছিল। মনে হচ্ছিল ঘোড়াটির খুব দুঃখ। তার জন্য কান্না পাচ্ছিল শফির।
একরাতে ঠিক এমনি করে বারুচাচাজির হাতিটিকে স্বপ্নে দেখেছিল শফি। হাতিটির পাঁজরের হাড় দেখা যাচ্ছিল। রুণ সেই পাঁজরবেরকরা হাতিটিকে দেখে শফি হু হু করে কেঁদে ফেলেছিল। রবি তার ঘুম ভাঙিয়ে দেওয়ার পরও কিছুক্ষণ শফির মনে কান্নার আবেগটা থেকে গিয়েছিল।….
