দুপুর গড়িয়ে গেছে। ছায়া ঈষৎ প্রলম্বিত হয়ে স্রোত ছুঁই-ছুঁই করছে। তৃষ্ণায় গলা শুকিয়ে গেছে। নদীর স্বচ্ছ জল পান করে যখন ফিরে চলেছি, তখন আমার ভিতরকার ঘাতক-সত্তা দীর্ঘ নিদ্রার পর আড়মোড়া দিচ্ছে। শুকনো খাল পেরিয়ে সুনয়নী দেবীর কুটিরের সামনে পৌঁছে স্বাধীনকে দেখতে পেলাম। সে অন্যদিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে কিছু শুনছিল বা দেখছিল। সুতোকাটুনিদের কারখানার দিক থেকে চাচামেচি কানে এল। ওরা প্রায়ই নিজেদের মধ্যে ঝগড়াঝাটি করে। নতুন ঘটনা নয়। স্বাধীন আমাকে দেখে বলল, এদিকে কোথায় গিয়েছিলে? একটু থেমে ফের বলল, তোমাকে অমন দেখাচ্ছে কেন? কী হয়েছে?
কিছু না। বলে মন্দিরের দিকে এগিয়ে গেলাম। তারপর ডানদিকে তাকাতেই একটি বিচিত্র দৃশ্য চোখে পড়ল। দুটি স্ত্রীলোক মুখোমুখি যুযুধান মূর্তিতে দাঁড়িয়ে আছে। অন্যান্য স্ত্রীলোকেরা দুজনকে নিরস্ত করার জন্য চাচামেচি করছে। একজনকে চিনতে পারলাম। ইকরা ওরফে করুণা। অন্যজন গ্রেীঢ়া। হাড়গিলে চেহারা। সে। বেশি মারমুখী। নিছক কৌতূহলে কিছুটা কাছাকাছি গেলাম। তাঁতশালার পুরুষেরা বারান্দা থেকে ভিড় করে দাঁড়িয়ে মজা উপভোগ করছে। সম্ভবত বসন্তবাবু ভাতঘুম দিচ্ছেন স্বগৃহে। নতুবা এতখানি বাড়াবাড়ি ঘটত না। প্রৌঢ়া যে মুসলমান, তার চেহারা আর কথাবার্তায় স্পষ্ট। সে চেরা গলায় বলছে, বেউশ্যা ডাহিন মাগী! আমার ননদাই (ননদের স্বামী) বুজুর্গ পির –তেনার ঘরে একশো জিন পোষা আছে, দ্যাখ, তোর কী খোয়র করে। খপর যেতে দেরি! হা আল্লা, এখানে কি মোসলমান নাই একজনাও, এই হারামজাদিকে জবাই করে গাজি হয়?
বুক ধড়াস করে উঠল। আরও কাছে এগিয়ে গেলাম। ইকরার পিঙ্গল চোখ থেকে আগুন জল হয়ে ঝরছে। মনে হল, ইতিমধ্যে যথেষ্ট গাল দিয়ে তার পুঁজি শেষ। অথবা ক্রোধে সে বাকরহিত।
প্রৌঢ়ার দিকে তাকালাম। অথবা স্মৃতির দিকে। চেনা মনে হয় কি? প্রতিপক্ষ পরাহত বুঝে সে ফের হুংকার দিল। থাম, থাম! পিরসাহেব যদি বা তোকে মাফ করেন, আমি করব না। আজই ভগবানগোলায় খপর ভেজছি মিরের ব্যাটার কাছে। তার নামে বাঘেগোরুতে একঘাটে পানি খায়। এখানেই তার লোক আছে ঘাপটি পেতে। থাম, ডেকে আনছি বাঁকা বাগদিকে।
চিনলাম। অজিফা-মামীই বটে! মামা তাঁকে তালাক দেওয়ার পরদিন ভগবানগোলায় গিয়েছিলাম। অজিফা-মামী তাহলে পেটের দায়ে এখানে এসে সুতোকাটুনি হয়েছে।
দ্রুত মুখ ঘুরিয়ে চলে এলাম। নিজের ঘরে ঢুকে আচ্ছন্ন অবস্থায় বসে রইলাম। কী বিচিত্র এই জীবন! অভিজাতবংশীয় দুটি লোক– একজন শ্যালক, অপরজন তাঁর ভগ্নিপতি– তাঁদের পরিত্যক্তা দুটি স্ত্রীলোক অপ্রসাঙ্গিক কলহে লিপ্তা। হতভাগিনীদের কে বোঝাবে তাঁরা বস্তৃত কী? একজন দস্যুসর্দার, অপরজন ধর্মগুরু। কিন্তু দুজনেই পুরুষ।
সেইরাত্রে অন্ধকার ঘরে স্বপ্নের মধ্যে আমি এই প্রকার কথোপকথনে লিপ্ত হইয়াছিলাম। আমার সম্মুখে দুইটি স্ত্রীলোক দণ্ডায়মান ছিল।
তোমরা কে?
আমরা পাখি, ফুল, প্রজাপতি।
কে তোমরা?
আমরা বায়ু, অগ্নিশিখা।
তোমরা কি মনুষ্য নহ?
আমরা স্ত্রীলোক, প্রকৃতি।
তোমরা কি মনুষ্যের ভাষা বুঝিতে পার না?
উহারা শুনিতে পায় না।
তোমরা কী বলিতেছ?
আমরা কথা বলিতেছি।….
‘Heaven is nearer through football
than through the Gita.’
সকালে ‘হাজারিলালে’র খোঁজে গেলাম। আমার মধ্যে স্বাধীন-কথিত ‘দুর্দান্ত বাঘ’ গরগর করছিল। গত কয়েকটি বছর আমি নিজের ভিতর যেন সমাহিত ছিলাম! শুধু গ্রন্থপাঠ আর উদ্দেশ্যহীন ভ্রমণ। জীবন এবং জগৎকে ব্যাখা করার চেষ্টা। হরিবাবু আমার হাবভাব আঁচ করেই আর বিশেষ যোগাযোগ করতেন না। কিন্তু মানুষের মনের রহস্য বোঝা কঠিন। কোথায় আঘাত লাগে, কোথায় ঝনঝন শব্দ ওঠে। পিতার নামে কুৎসার আঘাতই কি আমাকে বিলম্বিত ‘হাইবারনেশন’ থেকে জাগিয়ে দিয়েছিল? জানি না। বুঝি না। শুধু এইটুকু বুঝি, প্রচণ্ডভাবে বেজে উঠেছিল মনের অন্য একটি তন্ত্রী। গ্রাম্য প্রবাদে আছেঃ লঙ্কাধামে রাবণ মলো/বেউলা কেঁদে রাঁড়ি হল? হাসির কথা নয়। এমনই হয়।
হরিবাবু তাঁর কুটিরের সামনে গাবগাছের তলায় বাঁশের মাচানে বসে পাথরের থালায় ছাতু খাচ্ছিলেন। আমাকে আসতে দেখে তাকিয়ে রইলেন। কাছে গিয়ে অনুচ্চস্বরে বললাম, বন্দেমাতরম্!
হরিবাবু হাসলেন। কী ব্যাপার? হঠাৎ–
মাচানে বসে বললাম, মনে বাতব্যাধি ধরে গেছে। একটা কিছু করতে চাই। ছোটাছুটি, চিৎকার, হত্যা– এরকম কিছু।
হরিবাবু চুপচাপ ছাতু শেষ করলেন। ঘটি থেকে গলায় জল ঢাললেন। তারপর নীচের গভীর নয়ানজুলিতে ঘোলা জলে পাত্রটি সযতে ধুয়ে আনলেন। সেটি কুটিরের ভেতর রেখে মাচানে এসে বসলেন। গামছায় গোঁফ আর খোঁচা খোঁচা দাড়ি মুছে বললেন, নতুন কোনো বই পড়লে বুঝি?
সব বই-ই পুরনো, হরিদা! নতুন—
চুপ। বাতাসের কান আছে। হাজারিদা বলো!
হাজারিদা আমি এখানে আর থাকব না। আমার চুপচাপ সঙ সেজে বসে থাকতে আর ইচ্ছে করছে না।
ফুটবল খেলো!
নড়ে বসলাম। বললাম, পরিহাস করছেন?
হরিবাবুর মুখে কৌতুকের চিহ্ন ছিল না। গম্ভীরমুখে বললেন, তুমি নিশ্চয় স্বামী বিবেকানন্দের নাম শুনেছ?
শুনেছি। শাস্ত্রীমশাইয়ের ছেলে অজয়ের কাছে তাঁর চিকাগো বক্তৃতা নামে একটি বইও পড়েছি। আমাদের লাইব্রেরিতে ওঁর কোনো বই দেখিনি।
