হরিবাবু একটু চুপ করে থেকে বললেন, ব্রাহ্মরা ওঁকে সম্ভবত পছন্দ করে না। অথচ সারা ভারতবর্ষ স্বামীজির নামে জয়ধ্বনি দিচ্ছে। তোমাকে যে ফুটবল খেলতে বললাম, বাক্যটি তাঁরই। Heaven is nearer through football than through the Gita’.
কেন একথা বলেছেন উনি?
হরিবাবু চারদিক দেখে নিয়ে বললেন, আমরা থেমে নেই। তুমি তো নিয়মিত সম্বাদপত্র, পড়।
নিয়মিত নয়, মাঝে-মাঝে পড়ি।
বন্দেমাতরম্ সমিতির সদস্যরা নতুন একটি বিপ্লবী দলে যোগ দিয়েছে। গত ২৪ মার্চ জনৈক ব্যারিস্টার প্রমথনাথ মিত্র– তিনি পি মিত্র নামে খ্যাত, তিনি, সতীশচন্দ্র বসু, পুলিনবিহারী দাশ প্রমুখ বিশিষ্ট ব্যক্তি কলিকাতায় অনুশীলন সমিতি নামে একটি দল গড়েছেন। প্রকাশ্যে এই গুপ্ত বিপ্লবী দলের কাজকর্ম হল, তরুণ তরুণীদিগের খেলাধুলা, ব্যায়ামাগারে শরীরচর্চা, লাঠি-ছোরাখোলা ইত্যাদি ইত্যাদি। কালীমোহনদা ব্ৰহ্মপুরে এসে স্বামীজি সংঘ নামে একটি ক্লাব স্থাপন করে গেছেন। তুমি যেন আশ্রমে এসব কথা ঘৃণাক্ষরে আলোচনা কোরো না।
আমি কী করব, বলুন?
শফি, বললাম তো ফুটবল খেলো! অলীক মানুষ-১৬
আপনি খেলেন কি?
আমার কথায় ক্ষোভ ছিল। হরিবাবু মুচকি হেসে বললেন, স্বামী বিবেকানন্দ গীতার একটি উক্তি শ্লোগানের মতো সারা ভারতে ছড়িয়ে দিচ্ছেন : ‘নায়মাত্মা বলহীনেন লভ্যঃ। ফুটবলও একপ্রকার বলের সঞ্চার করে দেহে। তবে হাজারিলালকে ফুটবল খেলতে দেখলে টিকটিকি মাথা নেড়ে দেবে। ব্যস! কাজেই হাজারিলাল– যার দেশ কি না বিহার মুল্লুক এবং যেখানে লাঠিখেলা না জানলে মরদ বলে না, সে লাঠিখেলা শেখাবে। শেখাচ্ছে।
লাঠি! ধুস! তলোয়ারখেলা হলেও মনে হয়।
ধীরে-ধীরে সবই হবে। পিস্তল বন্দুক বোমা –সব হবে। হরিবাবু একটু ভেবে নিয়ে বললেন ফের, তোমার ডিউটি-পিরিয়কি বাঁধা?
হ্যাঁ। নটা থেকে বারোটা, সন্ধ্যা ছটা থেকে রাত্রি নটা। তবে আমি তত ডিউটিফুল নই। কখনও খুকুকে, কখনও রেহানাকে বসিয়ে দিয়ে ঘুরতে বেরোই।
হরিবাবু আস্তে বললেন, নেচার-বায় ছাড়ো! নেচারে কিছু নেই হে! হোয়াট রিমেনস ইজ ম্যান।
দারুণ কথাটা তো! কার?
জানি না। কোথায় যেন পড়েছিলাম। যাই হোক, অজয়কে বলল –সে তোমার ক্লাবের মেমবার করে নেবে। আশা করি, দেববাবুর আপত্তি হবে না। স্বাধীনের ব্যাপারে তো হয়নি।
অবাক হয়ে বললাম, স্বাধীন ওই ক্লাবে খায় নাকি? কী করে? ছোরাখেলা শেখে। একটা কথা। আপনারা কি বন্দেমাতরম শ্লোগান ছেড়ে দিয়েছেন?
হরিবাবু উত্তেজিত হয়ে উঠলেন। তোমার মাথা খারাপ? বন্দেমাতরমই আমাদের প্রেরণা। বলে আমার দিকে ঘুরলেন। কেন? তুমি কি
দ্রুত বললাম, আমি তো এসেই আপনাকে বন্দেমাতরম বলে সম্ভাষণ করলাম। আপনি প্রত্যুত্তর দিলেন না।
ভেবেছিলাম, আফটার অল তুমি মুসলমান। তাই হয়তো ওভাবে দূরে সরে গিয়েছিল। হ্যাঁ –একটা কথা। বহুকাল ধরে বলব ভেবেছি, বলিনি। ধর্মত ন্যায়ত যখন ওটা তোমারই, তখন–
কিসের কথা বলছেন?
স্ট্যানলির পিস্তলটার কথা।
ওটা আছে।
মরচে ধরে অচল হয়ে গেছে হয়তো।
না। মাঝেমাঝে রাত্রে ওটা খুলে তেল দিই। তবে কার্তুজগুলানের অবস্থা জানি না। পরীক্ষা করে দেখব।
হরিবাবু ব্যস্তভাবে বললেন, না, না। প্রয়োজনে কার্তুজ পাবে।
হাসতে-হাসতে বললাম, দূর জঙ্গলে গিয়ে টেসট করব।
হরিবাবু কাঁধে হাত রেখে খাস ছেড়ে বললেন, ভাই শফি! লোহাগড়ার। কৃষকবিদ্রোহে নেতৃত্ব দিতে আমরা ব্যর্থ হয়েছিলাম। তবে যা হয়, মঙ্গলের জন্যই হয়। কৃষকদিগের ব্যাপারটা হল হড়কা বানের মতো। ওরা আদর্শ বোঝে না। বৈষয়িক স্বার্থ বোঝে। কিন্তু এই বিরাট কাজে আদর্শবাদেরই প্রয়োজন। আদর্শবাদ শিক্ষা ছাড়া গড়ে ওঠে না। সেই কারণে শিক্ষা-ব্যবস্থার সহযোগী হতে চাই আমরা। শিক্ষাব্যবস্থার সুযোগ নিয়েই স্বাধীনতা চাই। হরিবাবু খি-খি করে হাসতে থাকলেন। কথা আছে না? ‘যার শিল তার নোড়া/তারই ভাঙি দাঁতের গোড়া!
তিনি হঠাৎ মাচান থেকে নামলেন। বললেন, ভুলে গিয়েছিলাম। স্বাধীনকে রত্ন একটি চিঠি লিখেছিল। স্বাধীন তোমাকে কিছু বলেনি?
বলেছিল, আমাকে তিনি নেমন্তন্ন করেছিলেন। যাচ্ছি না কেন।
তুমি চিঠিটা নিয়ে যাও। আমার কাছে থাকা ঠিক নয়। স্বাধীনকে ফেরত দিও। বলে হরিবাবু কুটির থেকে একখানি খাম এনে দিলেন। বললেন, তুমি পড়ে দেখো। তেমন কিছু গোপনীয় নেই এতে।
I was once the trunk of a fig free.
A carpenter, doubtful whether to make me
into a god or a bench, finally decided to
make me a god.
Satires–Horace.
‘স্ট্যানলির পিস্তলটি বেঢপ গড়নের। উহার যান্ত্রিক পদ্ধতি এবং ক্রিয়া-প্রক্রিয়া সমুদয় বদ্ধ ঘরে কোনো কোনো রাত্রে নাড়াচাড়া করিতে-করিতে শিখিয়া ও বুঝিয়া লইয়াছিলাম। উহাতে চক্রাকারে আঠারোটি খোপ ছিল। স্ট্যানলি মৃত্যুর পূর্বে একটিও কার্তুজ ব্যবহার করিবার সুযোগ পায় নাই। সুতরাং আঠারোটি কার্তুজ খোপে সজ্জিত ছিল। সতর্কতাহেতু কার্তুজগুলিন খুলিযা অস্ত্রটি পরীক্ষা করিতাম। হরিবাবুর সঙ্গে ক্লারবিষয়ক কথাবার্তার পর একদিন বহুদূরে দুর্গম কাশবনের ভিতর গিয়া ঘোড়া টানিলাম। ফটাস করিয়া অদ্ভুত শব্দ হইল। বন্দুকের শব্দের সহিত ইহার পার্থক্য বুঝিলাম। বারিচাচাজির বন্দুকে হ্যাঁমার বলিয়া একটি যন্ত্র ছিল। পিস্তলটিতে তাহা ছিল না। পরবর্তী কার্তুজ কীভাবে ব্যবহার করিব, তাহা নির্ণয়হেতু দ্বিতীয়বার ঘোড়া টানিলাম। কোনো শব্দ হইল না। ঝাঁকুনি লাগিল না। নিরাশ হইয়া আবার ঘোড়া টানিলাম। আবার কার্তুজটি বারুদের কটুগন্ধ ছড়াইয়া শব্দ করিল। তখন বুঝিলাম দুইবার করিয়া ঘোড়া টানিতে হইবে! পরে জানিয়াছিলাম, পিস্তলটি আটোমেটিক নহে। কাশবনের ভিতর একটি হিজলগাছ একাকী দাঁড়াইয়া ছিল। টিপ পরীক্ষা করিতে মাতিয়া উঠিলাম। খুঁড়িতে একস্থানে কাদার ক্ষুদ্র পিঙ সাঁটিয়া আনুমানিক কুড়িহাত দূর হইতে পদ্ধতিঅনুসারে দুইবার ঘোড়া টানিলাম। এবার দক্ষিণ হস্তে পিস্তল এবং বামহস্তে দক্ষিণহস্তের কর্জি চাপিয়া রাখিলাম, যাহাতে পিতলের ঝাঁকুনিহেতু নলের মুখ লক্ষ্যভ্রষ্ট না হয়। গুলি লক্ষ্যভেদ করিল। আনন্দে লাফাইতে ইচ্ছা করিল।…..
