হুঁ, চিনলাম। এ নিশ্চয় মৌলাহাটের সেই আবদুলের বউ ইকরা। কিন্তু মেয়েটি ধূর্ত এবং সাতিশয় কপট। বিকেলে সুতোকাটুনিরা সুতো জমা দিতে কারখানার সামনে ভিড় করে। সে সুতো জমা দিয়ে কাটুনিপাড়ার দিকে হনহন করে এগিয়ে যাচ্ছিল। বেলা পড়ে এসেছে। খালের এধারে উঁচু জমির ওপর ছিটেবেড়ার ছোট ছোটো ঘর। আগাছার ঝোঁপের ভিতর দিয়ে একফালি সংকীর্ণ পায়েচলা পথ। আমার পায়ের শব্দে সে ঘুরে দাঁড়াল। সঙ্গে-সঙ্গে বললাম, ইকরা, আমাকে চিনতে পারছ?
সে ভুরু কুঁচকে সেই বেড়ালের মতো পিঙ্গল দুটি চোখে আগুনের ছটা এনে বলল, কে ইকরা? আমার নাম করুণা।
ইকরা! আমি মৌলাহাটে শফি! আমি তোমাকে যেমন চিনি, তুমিও আমাকে চেন!
বাজে কথা বলবেন না, বাবু! এক্ষুণি চেঁচিয়ে লোক জড়ো করব।
ক্রোধ সংবরণ কবে চলে এলাম। বুঝলাম এই নারী ভয়ংকরী। ভাবলাম, দেবনারাযণদাকে এর সম্পর্কে সতর্ক করা দবকার। কিন্তু ওই কালে বহির্জগৎ সম্পর্কে এক প্রগাঢ় নির্লিপ্ততা আমাকে পেয়ে বসেছিল। আরও কিছুদিন পরে বসন্তবাবু একরাত্রে আমার ঘরে এলেন। একথা-সেকথার পর হঠাৎ সেঁতো হেসে চাপা গলায় বললেন, একটা কথা জিজ্ঞাসা করি। কিছু মনে করবেন না যেন।
বললাম, না। আপনি বলুন!
আপনি নাকি এক পিরসাহেবের ছেলে। সত্য কি?
হ্যাঁ।
মৌলাহাটের পিরসাহেবই কি আপনার বাবা?
চোখে চোখ রেখে মাথা দোলালাম। উনি চুপ করে আছেন দেখে তখন বললাম, কেন?
শুনলাম –আই মিন, কাটুনিদের মধ্যে আমার লোক আছে, অবশ্যই স্ত্রীলোক, আপনার বাবা নুরপুরে ছিলেন কিছুকাল।
আস্তে বললাম, শুনেছিলাম।
শোনেননি করুণা যখন মুসলমান ছিল, তখন তাকে আপনার বাবা বিয়ে করেছিলেন, পরে ডিভোরস করেন?
দিস ইজ অ্যাবসার্ড!
বসন্তবাবু সেঁতে হাঁসি হেসে বললেন, করুণা তাই বলেছে। সে আপনার বাবার। নামে অকথ্য-কুকথ্য নিন্দামন্দ করেছে। কাটুনিরা অনেকেই জেনে গেছে সে-কথা। বোঝেন তো ওসব ছোটোলোক মেয়েদের ব্যাপার-স্যাপার। ওদের পেটে কথা থাকে না। আমি দেববাবুকে বলতে সাহস পাই না। আপনি বলুন ওঁকে। শিগগির মেয়েটাকে এখান থেকে তাড়ানো দরকার।
কেন?
বসন্তবাবু ভুরু কুঁচকে কিছুক্ষণ গোঁফে তা দিলেন। তারপর চুপচাপ বেরিয়ে গেলেন। আমার সন্দেহ হল, লোকটি ইকরা ওরফে করুণার প্রেমভিখারি। কিন্তু আমার পিতা ইকরাকে বিয়ে করেছিলেন, ভাবতে অবাক লাগল। কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারলাম না। পিতার মুখে অসংখ্যবার শাস্ত্রীয় বাচন শুনেছি, যা তিনি। জীবনযাপনেও সতর্ক এবং দৃঢ়ভাবে পালন করতেন, হে মুসলমান! পাক কেতাবে আল্লাহ বলেছেন, যদি মনে কর একাধিক আওরতের প্রতি সমান আচরণ ও সুবিচার করতে পারবে, তবেই দুটি, তিন এবং চার পর্যন্ত নিকাহ করতে পার। তাছাড়া তিনি কোথাও কেউ দ্বিতীয় বিবাহ করছে শুনলে ক্ষুব্ধ হতেন। সতর্ক করে দিয়ে শাস্ত্র আবৃত্তি করতেন। তাঁর পক্ষে ইকরাকে বিয়ে করা অসম্ভব।
গিয়াসপণ্ডিতের কন্যাকে বিয়ে করতে চাইনি বলে উনি আমার সঙ্গে আগের মতো কথাবার্তা বলতেন না। নেহাত প্রয়োজনে দু-চারটি কথা বলতেন মাত্র। সেবার। আশ্রমে বাঙলা নববর্ষ উৎসব হল। হৃদয়নাথ শাস্ত্রী বেদপাঠ করলেন। দেবনারায়ণদা বাইবেলের “সাম্স্” অংশ পড়লেন। গিয়াসপন্ডিতের কন্যা রেহানা কোরান আবৃত্তি করল। (হায়! এই বিদূষী তরুণীর মধ্যে একটি খাঁচার পাখিই দেখিয়াছিলাম। আমি যে প্রকৃতিচর– বনের পাখিই আমার প্রিয়)। ত্রিপিটক পাঠ করলেন বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আচার্য ভবতোষ গাঙ্গুলি। শেষে দেখি, ‘হাজারিলাল’– হরিবাবু তুলসীদাসের কয়েকটি দোঁহা সুর ধরে আবৃত্তি করলেন।
আগের দিন চৈত্রসংক্রান্তিতে বিজয়পল্লীতে খুব জমকালো গাজন হয়েছিল। সভার ব্রাহ্ম বক্তারা প্রত্যেকে একথা উল্লেখ করে কড়া সমালোচনা করলেন। বিশেষ। করে সঙের গানে ও নাটকে নাকি ‘ওই ইতরজনেরা নামী সজ্জনদের সম্পর্কে কুৎসা ও খেউড় কীর্তন করেছে।’ তারপর গিয়াসপন্ডিত বক্তৃতা দিতে উঠলেন। বাঙলা নববর্ষ এবং হিজরিসনের সম্পর্কের ইতিহাস বর্ণনার পর হঠাৎ জ্বালাময়ী ভাষণ। দিতে শুরু করলেন। একটু পরে চমকে উঠলাম শুনে : ‘মৌলাহাটের মহাসম্মানিত একেশ্বরবাদী সাধকপুরুষ হজরত সৈয়দ বদিউজ্জামান, যার সুবিদিত ওহাবি ভাবধারার মধ্যে আমাদিগের ব্রাহ্মধর্মের বহু সাদৃশ্য বিদ্যমান– যেহেতু আমরাও ধর্মক্ষেত্রে নিরাড়ম্বর সারল্য এবং তেন ত্যক্তেন ভূঞ্জীথাঃ– ত্যাগের দ্বারা ভোগব্রতে। ব্রতী, হজরত বদিউজ্জামানও অনুরূপ ব্রতের প্রচারক এবং বিলাসিত বর্জন করে পরমব্রহ্মের সম্মুখীন হওনের নিমিত্ত আহ্বান করেন, তিনিও তৌহিদ বা একত্ববাদের প্রবক্তা, সেই হেতু তিনিও আমাদিগের নমস্য –অথচ গতকল্য বিজয়পল্লীতে দুর্বত্ত ব্যক্তিরা তাঁর নামেও সঙের ন্যক্কারজনক গীতাদি নাট্যাদি অভিনয় করত কুৎসা রটিয়েছে। এমন কী, এক দুর্জন হারামজাদ ব্যক্তি শনের দাড়ি এঁটে টুপি পরে ওই মুসলমান আচার্যের নকল করেছে। ধিক! শত ধিক! সুধন্য নামে আরেক দুর্বত্ত যুবক স্ত্রীলোক সেজে দাড়িটুপিজোব্বাধারী শয়তানের সঙ্গে– ছি! ছি! মুখে উচ্চারণ করতে ঘৃণা বোধ হয়।’
সভায় ধিক্কারধ্বনি শোনা গেল, অবশ্য তা মৃদু এবং ম্রিয়মাণ। আমি বাঁধের পথে বিভ্রান্তভাবে হেঁটে গেলাম। বিজয়পল্লীর কাছে গিয়ে একটু দাঁড়ালাম। তারপর উদ্দেশ্যহীন হাঁটতে-হাঁটতে আবাদ এলাকা পেরিয়ে শঙ্খিনীর ধারে নতুন বাঁধে একটি ঝুঁকে পড়া গাছের ছায়ায় শুকনো বালির চড়ায় বসে পড়লাম। একটি সাঁওতাল যুবক তীর-ধনুক হাতে ওপারের জঙ্গল থেকে নদীতে নামল। হাঁটুজল পেরিয়ে এসে সে আমাকে দেখতে পেল এবং নির্লিপ্ত দৃষ্টে তাকিয়ে নিয়ে চলে গেল। নিসর্গের অন্তর্ভুক্ত একটি সত্তার প্রকাশ যেন, একটি ক্ষুঙ্কাতর কাঠবেড়ালির সঞ্চরণ যেভাবে দেখি । উহাদিগের বিদ্রোহের বৃত্তান্ত পড়িয়াছি। উহার বস্তৃত নিসর্গ হইতে নিষ্ক্রান্ত হওয়ার চেষ্টা করিয়াছিল।’দিকু’গণ উহাদিগকে আবার নিসর্গের অঙ্গীভূত করিয়াছে। ওই কৃষ্ণকায় যুবকটিকে দেখিয়া হঠাৎ আবার Revelation ঘটিল। নিসর্গ কি সত্যই প্রশান্তিময়? নাকি আমার ‘দিকু-অবচেতনাঘটিত বিভ্রম? এখানে ধারাবাহিক সংগ্রাম। টিকিয়া থাকার জন্য মরণপণ যুদ্ধ। প্রকৃতির যে নিভৃত বৃত্তটি নিসর্গরূপে আত্মপ্রকাশ করিয়াছে, উহার মধ্যেও সংগ্রামস্রোত বহিতেছে। বৃক্ষলতাও এখানে সংগ্রামরত। মাটি ও জলও সংঘর্ষে লিপ্ত। জড় ও অজড়, স্থাবর ও জঙ্গম মুখোমুখি লড়িতেছে। কোথাও জাড্য নাই। হেনরি ডেভিড থরো কি ইহাকেই ‘strange feelings’ বলিয়াছেন? বড়ো বিলম্বে উপলব্ধি করিলাম বাক্যটির প্রকৃত মর্মাথ কী। ‘Disobedience’ তত্ত্বের উৎস এইখানেই নিহিত। আত্মস্থ আত্মসমর্পণ নহে, অবাধ্য হও।
