দি বেগম ॥ (আস্তে) মেয়েটা ভালো! (শ্বাস ছেড়ে) তোর আব্বার হিন্দু বন্ধুরাও খুব ভালো ছিলেন। লুকিয়ে-চুরিয়ে রেতের বেলা এসে আমার হাতের খানা খেতেন। কত তারিফ করতেন। তোর আম্মা ওঁদের দেখা দিত। কথা বলত। তোর আম্মার। নিমুনিয়া হল –ডবল নিমুনিয়া! তখন তোর আব্বার হিন্দু বন্ধুরাই সদর থেকে ‘সিবিল সার্জেং’ ডাক্তার এনেছিলেন। বিলেত-পাস ডাক্তার। তোর আব্বার সাধ্যি ছিল তাঁকে আনবার? সেই পেথম হাওয়াগাড়ি এল মৌলাহাটে। হাওয়াগাড়ি দেখলাম! সিবিল সার্জেং তোর আম্মাকে পরিক্ষে করে বললেন, দের হয়ে গেছে। আর উপায় নেই। উনার হাওয়াগাড়িও রওনা দিল, তোর আম্মাও
কচি ॥ আঃ! ওসব কথা থাক। বড়ো আব্বার বড়ো আম্মার কথা বলো!
দি বেগম ।। আর কী কথা! সেই থেকে শশুরসাহেব একহপ্তা করে এবাদতখানায় থাকতেন। তখনও এ তল্লাটে বোরখার চলন ছিল না। শাশুড়িসাহেবাদের বাপের তল্লাটে ছিল। শাশুড়িসাহেবার একটা বোরখা ছিল প্যাটরায় ভরা। কোনো কোনো রোজ সেই বোরখা পরে উনি নিজেই এবাদতখানায় খানা দিতে যেতেন। দুখুচাচাও সঙ্গে যেত। সেই দেখাদেখি মৌলাহাটে অনেক বাড়িতে বোরখার ফ্যাসাং হল। বেশিদিন চলেনি। গাঁ তো তখনও চাষাভুষোর।
কচি ॥ কথাটা ফ্যাশান, ফ্যাশাং নয়! তুমি এমন বংশের মেয়ে! শুদ্ধ কথাবার্তা বলতে পার না?
দি বেগম ।। ওই হল। তবে প্রেথম-প্রেথম আমি বোরখা পরতে পারতাম না। দম আটকে যেত। রোজি– তোর বড়োদাদিজি বোরখা পরতে পেয়ে খুব খুশি হয়েছিল! ছোটোবেলা থেকে আমাদের দু-হিনেরই পাড়া বেড়ানো খাসিয়াৎ! কিন্তু তখন ওদের সঙ্গে সম্পত্তি নিয়ে বিবাদ। না– রোজির দোষ ছিল না। জানিস তো আমরা যাওয়া (যমজ) বহিন ছিলাম? এখন বুঝতে পারি, রোজিকে আমার কাছে তোর বড়োদাদাজিই আসতে দিতেন না। রোজির কোন দোষ নেই। সে তার মরদকে খুব ডর করত।
কচি ।৷ আর তুমি তার উলটো! দাদাজিক মানুষ বলেই মনে করতে না!
দি বেগম ॥ (চটে গিয়ে) আঃ কচি! ফের গেটো মুখে বড়ো কথা? মু বন্ধ কর!
কচি ।। ঠিক আছে বাবা! ঘুম পাচ্ছে। আর ডেকো না। সামনে টেসট এগজামিনেশন!…..
চুন্ য়কি বাশদ্ হমি ন বাশদ্ দুঈ
হম্ মনি বর্ খিজদ্ ইন্জা হম্ তুঈ…
…..জালালুদ্দিনকে আমি কেন এত স্নেহ করি? বুড়বক উজবুগরা এই নিয়ে জল্পনাকল্পনা করে, কানে আসে। সেদিন হরিণমারার ছোটোগাজি কুণ্ঠিতভাবে বলছিলেন, হজরত! জালালুদ্দিনকে আপনি মোজেজা দেখিয়েছেন। আর আমি। এতদিন আপনার খিদমত করে আসছি, কিছুই পেলাম না! বান্দার ওপর হুজুর নিশ্চয় কোনো কারণে নারাজ আছেন। এই ছোটোগাজি লোকটি মন সরল। সে তার বড়োভাইয়ের মতো ধূর্ত নয়। ভণ্ড নয়। সে যা বলে, মন খুলে বলে। কিন্তু দুনিয়ায় এমন মানুষই বেশি, যারা জিন্দেগানির চারপাশে টুড়ে বাড়তি জিনিস আদায় করতে চায়। এমন জিনিস, যা ধরাছোঁয়া যায় না, অথচ আছে। তবে সত্যিই তো, আমি যখন তাদের কাছে বুজুর্গ ব্যক্তি, তখন আমার মারফত ওই বাড়তি জিনিসের ঈষৎ আভাস তারা আশা কবতেই পারে। একটু হেসে বললাম, জালালুদ্দিনকে কী মোজেজা দেখিয়েছি গাজিসাহেব? ছোটোগাজি বললেন, আপনি ওই জঙ্গলে পাখ পাখালি পোকামাকডের সঙ্গে কথা বলছিলেন, জালালুদ্দিন শুনেছে। গম্ভীরমুখে বললাম, গাজিসাহেব! আল্লাহ কি সকল মানুষকেই হরবখত্ত মোজেজা দেখান না? ওই দেখুন, আনারগাছটি কত উঁচু হয়ে উঠেছে। কোথায় ছিল ওই গাছ? একটি ছোট্ট বীজ থেকে পয়দা। আর ওই দেখুন ফুলগাছটিকে। কোথায় ছিল ওই রঙিন জিনিসগুলিন? এগুলিন কি মোজজা নয়? ছোটোগাজি সায় দিলেন বটে, কিন্তু মনে হল, তিনি চান, জাদুগিরের জাদুর খেল দেখাই। তিনি জালালুদ্দিনের নাম ফের উচ্চারণ করেই থেমে গেলেন। তখন তাঁকে বললাম, জালালুদ্দিন যদি কিছু দেখে থাকে, তার মধ্যে আল্লাহ ইলম (প্রজ্ঞা) দিয়েছেন বলেই দেখেছে। ঠিক এই সময় আচানক একটা ঘটনা ঘটল। চৈত্রমাসের শেষ দিন ছিল এটি। জঙ্গলের দিক থেকে প্রচণ্ড একটি ঘূর্ণিহাওয়া এসে পড়ল এবং ছোটোগাজির টুপিটি উড়িয়ে নিয়ে গেল। ঘূর্ণিহাওয়াটি উত্তর-পশ্চিম দিক বরাবর পুকুরের পানিতে হুলস্থুল বাধিয়ে। এতিমখানার গা ঘেঁষে সড়কে পৌঁছুল। ছোটোগাজি চোখ বুজে ফেলেছিলেন। বললাম, দেখুন, দেখুন! ছড়ি তুলে দেখিয়ে দিলাম, তাঁর টুপিটি তালগাছ-সমান। উঁচুতে ভেসে চলেছে। দেখামাত্র ছোটোগাজি আমার পায়ের সামনে কাটাগাছের মতো আছড়ে পড়ে আবেগে কেঁদে ফেললেন, হজরত! হজরত! আমি নাদান বান্দা! খাতাহ (ত্রুটি) মাফ করুন। ভর্ৎসনা করে তাঁকে টেনে ওঠালাম। তওবা নাউজুবিল্লাহ! মানুষ আল্লাহ ছাড়া কারুর কাছে নত হবে না। ছোটোগাজি ভিজে চোখে হাসলেন। অতিশয় উজ্জ্বল হাসি। এবার হাসতে-হাসতে বললাম, কমবখত্ত জিনের তামাসা! শিগগির যান, টুপিটি সড়কের ওধারে ছুঁড়ে দেখুন। ফেলে দিয়ে গেছে। ছোটোগাজি, তখনই হন্তদন্ত এবাদতখানা থেকে বেরিয়ে গেলেন। টুপিটির তল্লাসে উনি মাদ্রাসার একদল তালেবুল এলেমকে (ছাত্র) ডেকে নিয়ে যান। হ্যাঁ, টুপিটি পাওয়া গিয়েছিল। একটি কাঁটাঝোপে আটকে ছিল সেটি। যাই হোক, জালালুদ্দিনকে অতিশয় স্নেহের কারণ আমি বৈ এক আল্লাহ জানেন। আর কেউ জানে না। যদি সেদিন মির্জা গালিবের শাইরি কেতাবখানি আমার হাতে না আসত, সাইদার সঙ্গে হয়তো এ জিন্দেগিতে আর মিলন হত না। আজ জালালুদ্দিন আরেকখানি কেতাব দিয়ে গিয়েছিল। এখানি ফারসি কেতাব। চুন য়কি বাশ হমি….. বুকের ভেতর দরিয়ার ঢেউ উঠল। কী আশ্চর্য কথা লেখা আছে? ‘যদি শুধু এক থাকে। যদি না থাকে দুই। আমার ওপর সেই একের ঢেউ যদি আছড়ে পড়ে। তাহলে আর কথা কিসের। এবার সবই তুমি হয়ে গেছ। আমিও হয়ে গেছি তুমি।…’ মারহাবা! মারহাবা! ঈষৎ অন্যমনস্ক হয়ে পূর্বের নিচু পাঁচিলের দরওয়াজা খুলে জঙ্গলে ঢুকলাম। তন্ময় আচ্ছন্ন অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছি, আশেপাশে একটি কাঠবিল্লি ছোটাছুটি করে বেড়াচ্ছে, পুকুরের কিনারায় ঘন কালকাসুলে ঝোপে হলুদ ফুলের ওপর শাদা ছোটো-ছোটো একঝাক প্রজাপতি উড়ে বেড়াচ্ছে, মনে খালি ওই বয়েৎ চুন য়কি বাশ হমি…..’ সেইসময় শুকনো পাতার আওয়াজ শুনে ঘুরে দেখি, কালো বোরখাপরা এক আওরত। দেখামাত্র চিনতে পেরে খুশি ও বিস্ময়ে বলে উঠলাম, সাইদা! সাইদা আস্তে বলল, শফির খত এসেছে। ডাকের পিওন দিয়ে গেল। সে একখানি পোস্টকার্ড বোরখার ভেতর থেকে বের করে দিল। লক্ষ করলাম সে কাঁপছে। দ্রুত খতখানি পড়লাম। বাঙ্গালায় লেখা? “মা, অদ্য রাত্রে আপনাকে স্বপ্নে দেখিয়া চিত্ত এতই চঞ্চল হইল যে ইচ্ছা করিল, এতদ্দঙে ছুটিয়া যাই। কিন্তু আমার এক্ষণে যাওয়ার উপায় নাই। যে কর্মচক্রে আবদ্ধ রহিয়াছি, তাহা হইতে কিয়ৎক্ষণ দূরে সরিলে প্রভূত ক্ষতি হইবেক। শুধু জানিয়া রাখুন, আমি জীবিত রহিয়াছি। কোনও একদিবস ফুরসত পাইলেই ঝড়বৃষ্টিপাত হউক কিম্বা মহাপ্রলয় ঘটুক, গিয়া চরণদর্শন করিব। অধম সন্তানকে মার্জনা করিবেন। সহস্র ২ প্রণামান্তে–শফিউজ্জামান।” খতখানি পড়েই বললাম, এই খত তুমি পড়েছ? সাইদা কেঁদে ফেলল। তখন ভর্ৎসনা করে বললাম, ছিঃ সাইদা! শফিকে মুর্দা গণ্য করবে। সে হিন্দু হয়ে গেছে। সে খতে কোনো ঠিকানা দেয়নি। কিন্তু আমি জানি সে কোথায় আছে। সাইদা আত্মসংবরণ করে বলল, আপনি। জানেন? বললাম, জানি। কিন্তু তোমার দেলে বাজবে বলে বলি নাই। নুরপুরে থাকার সময় সম্বাদ পাই, সে বেহ্মপুর নামে এক নয়া আবাদে আছে। সম্বাদদাতা আমার হুকুম চেয়েছিল, জবরদস্তি শফিকে সেখান থেকে তুলে আনবে। আমি তাকে বলি, এ খবর ঝুট। সে অন্য কেউ হবে। আমার শফিউজ্জামান দেওবন্দে আছে। সাইদা কান্নাজড়ানো স্বরে বলল, কেন আপনি ওকে ধরে আনতে হুকুম দেননি? বললাম, সাইদা! তুমি বুঝতে পারছ না, তাতে আমার নামে হানাফিরা কেচ্ছা কেলেঙ্কারি রটনার মওকা পেত। সাইদা রুষ্টভাবে বলল, কেচ্ছা-কেলেঙ্কারির বাকি তো রাখেননি কিছু? শুধু শফির বেলায়– সে কথা শেষ না করে দ্রুত চলে গেল। দেখলাম, জঙ্গলের ভেতর দিয়ে দক্ষিণে ঘুরে সে সড়কে উঠল। সড়কের ধারে বটতলায় আয়মনি গায়ে চাদর জড়িয়ে (আজলাফ আওরতদের ওটাই পরদা) দাঁড়িয়ে আছে। দুই আওরত সড়ক পেরিয়ে চলে গেলে পোস্টকার্ডটি আবার পড়তে থাকলাম। তারপর আমিও আত্মসম্বরণ করতে পারলাম না। এবাদতখানায় ঢুকে দরওয়াজা বন্ধ করে কিছুক্ষণ ক্রন্দন করলাম! মনে-মনে বললাম, হায় রে, কানাঘোড়ার সওয়ার! আর আল্লাহ ছাড়া তোকে বাঁচানোর শক্তি কারুর নেই! আসরের বৈকালিক) নামাজের জন্য ঘাটে অজু করতে গেছি, সেই সময় দুখু এসে সম্ভাষণ করে মৃদুস্বরে বলল, হুজুর! বিবিসাহের হুকুম হয়েছে, হুজুরের কাছে একখানা খত আছে, নিয়ে এসো!, খতখানি আমার কলিজায় বিধে ছিল। দুখুর হাতে তা ফেরত দিয়ে অজু করতে গেলাম। পানির ধারে দাঁড়াতেই উলটো দুনিয়াটি চোখে পড়ল। অমনি মনে হল, আমার ঔরসে ওই উলটো দুনিয়ার এক উলটো মানুষ জন্মেছিল!…..
