সেই রাত্রে দুখু শেখ খানা আনে এবং বদ্দিউজ্জামান খানা খাওয়ার পর তাকে একটু অপেক্ষা করতে বলেন। খাগের কলম এবং কেশুরেপাতার রস আর মাটির হাঁড়ির তলার পোড়ো কালোরঙের গুঁড়ো মিশিয়ে তৈরি কালি তাঁর এবাদতখানায় সর্বদা মজুদ থাকত। একখণ্ড তুলোট কাগজে তিনি গালিবের পঙক্তিটি লিখে দুখু শেখের হাতে দেন। বলেন, এই খতখানি তুমি বিবিসাহেবাকে দিও। খর্বদার! কালা জিন যদি দেখ ঝামেলা বাধায়, ফিরে এসে খবর দেবে। এসো, তোমার মাথায় দোয়া ফুকে দিই। কোনো ডর কোরো না। দুখু শেখ ইমানদার মানুষ। সে পুকুরের ঘাটে হুজুরের খাদ্যপত্র ভক্তিভরে দেওয়ার পর দ্রুত লানটিনহাতে ফিরে যায়। তার বুকে টেকির পাড় পড়ছিল। ইদানীংকালে বিবিসাহেবা তাকে দেখা দেন। কারণ হাদিস কৈতাবে এমত বর্ণিত আছে, ‘গৃহের বান্দারাও স্বজনবর্গের অন্তর্ভুক্ত এবং তাদের সামনে পরদার প্রয়োজন নেই।’ দুখু শেখ প্রকৃতই একজন বান্দা ছিল। সে দলিজঘরে থাকত। গেরস্থালির সব কাজ তাকেই করতে হত। সে রাত্রে বিবিসাহেবার পাক হাতে সে খতখানি সসম্ভ্রমে অর্পণ করে। রুকু তখন রান্নাশালের কাজ সামলে। নিচ্ছিল। রফি তার বাবার পাশে ঘুমন্ত। রুকু আড়চোখে দৃশ্যটি দেখে এবং অবাক। হয়। খতখানি পড়ার পর সাইদা খাস ফেলে বলেন, বউবিবি! দুখুভাইয়ের খানা। বেড়ে দাও! রুকু বলে, দলিজঘরে ঢাকা আছে।
সাইদা খান্দানি মিরপরিবারের মেয়ে। লালবাগ অঞ্চলের ওদিকে ভগবানগোলায় তখনও খান্দানি মুসলিমরা দ্বিভাষাভাষী। বাঙলা আর উরদু উভয় ভাষা জানতেন। খতখানি যে শাইরি (কবিতা), সাইদা তা বুশতে পেরেছিলেন। খতের তলায়। বদিউজ্জামানের আঙ্গুটির মোহরের ছাপ ছিল। রুকু হাতের কাজ শেষ করে বদনাহাতে পায়খানাঘরের দিকে যাওয়ার সময় শাশুড়িসাহেবাকে পেয়ারাতলায় অন্ধকারে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে এবং একটু ইতস্তত করে জানতে চায়, কিসের খত আম্মা? সাইদা আস্তে বলেন, খত না, তাবিজ-রফির জন্য।…..
Und so tragt er scine Bruder,
Seine Schatze, seine Kinder
Dem erwartenden Ergeuger
Freudebrausend an das Herz.*
[* পয়গম্বর হজরত মহম্মদ সম্পর্কে কবি গ্যযটেব কবিতার অংশ। ডেভিড লুকের ইংরেজি অনুবাদ. ‘And thus he carries his brothers, his treasures, his children, all tumultuous with joy, to their waiting Parent’s bosom.’]
কচি ।। কিন্তু তাবিজ নয়?
দিলরুখ বেগম ॥ (সকৌতুকে) উঁহু, খত। চিঠি। চিঠিতে একটি বয়েৎ ছিল। মানে বুঝতে পারিনি।
কচি ।। তারপর কী হল, দাদিমা?
দি বেগম ॥ (মুখ টিপে হেসে, চাপা স্বরে) এক রেতে শাশুড়িসাহেবার দরজা খোলার আওয়াজ পেলাম। তখন আর আয়মনিখালা শুতে আসত না ওঁব কাছে। একলা শুতেই পছন্দ করতেন। তো ভাবলাম, বুঝি পেসাব করতে বেরুলেন। আমি কান করে আছি। একটু পরে
কচি ।। একমিনিট! তোমার বুঝি ঘুম হত না রাত্তিরে?
দি বেগম ॥ না রে! নিঁদ এলেই খালি কতরকম খোয়াব (স্বপ্ন)। ইচ্ছে করেই জেগে থাকতাম। হাজার কথা মাথায় আসত। আর রেতের বেলা কী হয, সে আমি জানি! ছোটো কথা বড়ো হয়। বুজকুড়ির মতন। ফোটে, ভেঙে যায়।
কচি ॥ হুঁ পড়েছি? ‘Beware thoughts that Come in the night!’ তোমার সেই ফারসি কেতাব ‘হুঁশিয়ারনামায়’ অবিকল একই কথা আছে। কে কার থেকে চুরি করেছে কে জানে?
দি বেগম ।। বকবক করবি, নাকি শুনবি?
কচি ।। সরি! বলো!
দি বেগম ॥ তো খিড়কির দরজাটা একটু আঁটো ছিল। সহজে খুলতে চাইত না। সেখানে আওয়াজ শুনে ভাবলাম, উনি এত রেতে ওদিকে বেবুচ্ছেন কেন? উঠে জানালা দিয়ে দেখি, উনি বেরিয়ে গেলেন। তখন আধখানা চাঁদ উঠেছে। একটু চাঁদনি ছিল। চত্তির মাস। খুব হাওয়া দিচ্ছে।
কচি ।। তারপর? তারপর দাদিমা?
দি বেগম ॥ গেলেন তো গেলেন। আর আসেন না, আর আসেন না। ডরে কাঁপছি। অমন করে কোথায় গেলেন? কচি, ঘরপোড়া গোরু সিঁদুরে মেঘ দেখে ডরায়। এমনি চাঁদনি রাতে আমার আম্মা– (জোরে শ্বাস ছেড়ে চুপ করলেন)
কচি ॥ আঃ, বলল না!
দি বেগম ॥ ভাবছি তোর দাদাজিকে ডেকে তুলব নাকি। কিন্তু সে তো ল্যাংড়াভ্যাংড়া মানুষ। দুখুচাচাকেই ডাকি বরঞ্চ। এই ভেবে উঠতে যাচ্ছি, খিড়কির দরজায় আওয়াজ হল। জানালায় উঁকি মেরে দেখি, শাশুড়িসাহেবা ফিরে এলেন। (ফোকলা দাঁতে হেসে) তখন কি জানি উনি কোথায় গিয়েছিলেন? পরদিন খবর হল, পিরসাহেব বাড়ি আসছেন। ফজরের নামাজে দুখুচাচা মসজিদে গিয়েছিল। সেই খবর আনল। তারপর দেখি কী, শাশুড়িসাহেবা ঘরদোর সাফ করছেন। তাড়া লাগিয়েছেন। সাজো-সাজো রব এই বাড়িতে।
কচি ॥ (প্রচণ্ড হেসে) মাই গুডনেস! বড়ো আম্মা অভিসারে গিয়েছিলেন বলো। দারুণ! অসাধারণ! ওঃ! ভাবা যায় না!
দি বেগম ॥ (কপট ক্রোধে) হিঁদুগিরি ছাড় দিকি! হিঁদু মেয়েগুলানের সঙ্গে মিশে তোর এই স্বভাব হয়েছে। না হিন্দুস্থান-পাকিস্থান হবে, না মৌলাহাটে হিঁদুদের বসতি হবে!
কচি ।। দাদিমা! তুমি বড় সাম্প্রদায়িক! জান না ওরা তোমার মোছলেম বেরাদারদের জুলুমে ইস্টবেঙ্গল থেকে এ দেশে পালিয়ে এসেছে? আজ শ্রাবণী নামে যে মেয়েটা এসেছিল, তুমি জান কি ও খড়ের গাদায় লুকিয়ে না থাকলে ওকে জবাই কবা হত? তখন ও এতটুকু ফ্ৰকপরা মেয়ে! তবু দেখো, ওরা আমাদের ঘৃণা করছে না!
