‘Celui qui prodigua
Les lions aux ravins du Jabel Kronnega,
Les perles a la mer et les astres a l’omber
Peut bien donner un peu de joie
a l’homme sombre.’
–Hugo.
এক বিকেলে ব্রাহ্মণী নদীর ধারে দাঁড়িয়ে ছিলাম। সেই পিরের সাঁকোব চিহ্নমাত্র। নেই। আচানক বুক হু-হুঁ করে উঠল। মনে হল, অতর্কিত শূন্যতার কিনারায় দাঁড়িয়ে আছি। কোথাও কিছু নেই, শুধু শূন্যতা। তারপর মনে হল, থামগুলি দেখতে পাচ্ছি। সিঁদুরের উজ্জ্বলতা থামগুলিকে নিটোল, মসৃণ, কোমল করে তুলতে-তুলতে এক নাঙ্গা আওরত তওবা! নাউজুবিল্লাহ! শয়তানের জাদু। তবে এতখানি না করলেই পারতাম। সূর্য দিগন্তে লাল চাকার মতো আটকে আছে। একফালি ঝিরঝিরে স্রোত বালির চড়ায় এঁকেবেঁকে বয়ে যাচ্ছে। কয়েকটি পাখি নাচের ভঙ্গিতে ছোটাছুটি করে বেড়াচ্ছে। আকাশে শনশন শব্দে বুনো হাঁসের ঝাক চলেছে উলুশরাব দিকে। আঁকটির গতিপথ লক্ষ করতে পিছু ফিরলে দেখলাম তিনজন লোক আসছে। চিনতে পারলাম। বড়োগাজি, জালালুদ্দিন, আর একজন কেউ। কাছে এলে চিনলাম, নুবপুরে সেই উকিল দিদারুল আলম। কী ব্যাপার? সম্ভাষণের পর বড়োগাজি বললেন, হজরতে। আলা! জরুরি কারণে আপনাকে বিরক্ত করলাম। দিদারুল এখনই ফিরে যাবে। আপনাকে বলেছিলাম ‘তবলিগ-উল-ইসলাম সমিতি’র কথা। দিদারুলের ইচ্ছা, জেলাসমিতির সভাপতি আপনি হোন। দিদারুল একটি ছাপানো বাঙলা ইস্তাহার দিল। দিয়ে বলল, হজরত! এখানেই আমরা বরং মগরেবের নামাজ পড়ে নিই। এবাদতখানায় গিয়ে দস্তখত আর মোহরের ছাপ দেবেন। ইস্তাহারে চোখ বুলিয়ে বুঝলাম, কাজটি মহৎ। নামাজের ওয়াক্ত হয়েছিল। নদীর পানিতে অজু করে বালির শুকনো চড়ায় ছড়িটি সামনে পুঁতে আমরা নামাজ পড়লাম। এও আল্লাহের মহিমা! এরা না এলে শয়তানের জাদু আমাকে বিপন্ন করত। ফিরে যাওয়ার সময় দিদারুল অনর্গল কথা বলছিল।….হজরত! যে ইউরোপীয় মনীষীদের জোরে হিন্দুরা নিজেদের ধর্মের নতুন-নতুন ব্যাখ্যা করছে, তাঁদেব জোরে আমরাও ইসলামের নতুন ব্যাখ্যা করতে পারি। আপনি জানেন হজরতে আলা? মনীষী হিউগো রসুলুল্লাহ (সাঃ)। সম্পর্কে কাব্য রচনা করেছেন! ইস্তাহারে সেইসব উদ্ধৃতি দিয়েছি। হিউগো পয়গম্বরের উক্তি ব্যাখ্যা করে লিখেছেন? জেবেল (আরবি শব্দ, অর্থ : পর্বত) ক্রোনেগার গিরিখাতে সিংহেরা যাঁর কৃপায় অবাধে বিচরণ করে, সমুদ্রে মুক্তা এবং মহাকাশে নক্ষত্রপুঞ্জ ব্যাপ্ত থাকে, বিষাদগ্রস্তকে তিনিই কিয়ৎপরিমাণে আনন্দদান করতে পারেন। আরেক মনীষী গ্যেটে প্রশংসা করে লিখেছেন–বড়োগাজি সম্ভবত আমাকে জ্ঞান দেওয়ায় অপমানিত বোধ করব ভেবেই তাকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, দিদারুল! হুজুরের অজানা কিছু নেই। দিদারুল জিভ কেটে বলল, জি হ্যাঁ। মাফ করবেন হজরত!…আমি অন্যমনস্ক। আমার বুকের ভেতর তখন গিরিখাতের সিংহেরা গর্জন অথবা হাহাকার করছে– যত দূরে সরে যাচ্ছি ব্রাহ্মণী নদী থেকে,
তত ওই গর্জন অথবা হাহাকার। যত সরে চলেছি তত পিছনে সমুদ্রের তলায়। ঝলমল মুক্তার মতো স্মৃতি, আর আকাশের নক্ষত্রপুঞ্জে পিঙ্গলচক্ষু এক নাঙ্গা আউরত আমার দিকে তাকিয়ে আছে।…..
১৮. কেশবপল্লীতে হাজারিলালের কুটিরে
‘And now…. I will rehearse a tale of love
which I heard from Diotima of Mantineia,
a woman wise in this…. She was my
instructress in the art of love….’
(Socrates to Agathon: Symposium-Plato)
সেই সন্ধ্যায় পূর্বকথানুসারে যখন কেশবপল্লীতে হাজারিলালের কুটিরে যাই, বুঝি নাই যে আবার আমার একটি মেটামবফসিস আসন্ন। জীবন কী রহস্যময় বিষয়! প্রতিটি পরবর্তী পদক্ষেপে কী ঘটিবে তুমি জান না, জানিবার কোনো উপায় নাই। কর্মফল-তত্বে বিশ্বাস নাই, কারণ উহা যুক্তিবিরহিত। একই কর্মে এক প্রকার ফল ফলিতে দেখ না কি? সর্বত্র যেন আকস্মিকতা ওত পাতিয়া আছে। দুইয়ে দুইয়ে চারি হইবার গ্যারান্টি নাই।
হরিবাবু আমার অপেক্ষা করিতেছিলেন। হাতে একটি লাঠি ও একটি লণ্ঠন লইয়া বাহির হইলেন। মাথায় হিন্দুস্থানীদের মতন পাগড়ি, গায়ে কম্বল এবং পায়ে কাঁচা চামড়ার নাগরা। অগ্রহায়ণ মাসের সন্ধ্যা। হিমের গাঢ়তা জীবজগতকে নৈঃশব্দ্যে ডুবাইয়া রাখিয়াছে। বলিলেন, এ কী! তুমি আলোয়ান আন নাই কেন?
হাসিয়া বলিলাম, আমার রক্তে কিছু আছে। শীত কাবু করিতে পারে না। কিন্তু আপনি কি অন্যত্র যাইবেন?
হ্যাঁ। হরিবাবু চাপা স্বরে বলিলেন। আমারই ভুল হইয়াছে! তোমাকে আভাসে বলা উচিত ছিল আমরা একটি দুর্গম স্থানে যাইব!
আপনার সহিত নরকে যাইতেও আপত্তি নাই। তবে আমি নিরস্ত্র।
হরিবাবু হাসিলেন!… না, না। নরহত্যা করিতে যাইতেছি না। একটু অপেক্ষা করো। বলিয়া তিনি তাঁহার কুটিরের তালা খুলিয়া ঢুকিলেন। তাহার পর একখানি। তুলার কম্বল আনিয়া বলিলেন, গায়ে জড়াইয়া লও। মাথা পর্যন্ত ঢাকো।
বাঁধের শিশিরসিক্ত ঘাসে দুইজনে হাঁটিতেছিলাম। কোথায় যাইতেছি, কেন যাইতেছি, এইপ্রকার প্রশ্ন করার অভ্যাস আমার নই। শৈশব হইতেই এই নির্লিপ্ততা আমার মধ্যে থাকিয়া গিয়াছে। আমার পিতার যাযাবর স্বভাবই ইহার মূলে। সর্বক্ষণ সকল মুহূর্তের জন্য আশৈশব প্রস্তুত থাকিয়াছি, কোথাও যাইতে হইবে। দেবনারায়ণদা সেদিন ঐতয়ের ব্রাহ্মণের ‘চরৈবেতি’ শ্লোকটির ব্যাখ্যা করিতেছিলেন। ভাবিলাম, যাযাবর নরগোষ্ঠী ছাড়া এমন উক্তি কাহাদের মুখ দিয়া বাহিব হইবে? ওইসকল শাস্ত্রপ্রণেতা নাকি আর্য ছিলেন। হরিদা সেদিন উদাত্তস্বরে আমার রক্তেরও আর্য সাব্যস্ত করিয়াছেন। হ্যাঁ, এই একটি ক্ষেত্রে ২+২ = ৪ হইল বটে। মনে মনে হাসিতে থাকিলাম।
