সারা বাড়িতে বুড়ি একলা। পাড়ার অন্যান্য মেয়েদের সঙ্গে ছেলে বুকে নিয়ে পালিয়েছে রমিজা। ওর বাইশ বছরের যৌবনে ঝড়ের আশঙ্কা। কলীমকে ধরে নিয়ে যাওয়ায় রমিজা হকিয়ে গেছে। কোন কিছুই ভেবে উঠতে পারে না। পাট ক্ষেত না কচুরীপানা ভর্তি ডোবায় গিয়ে ঢুকেছে ও তা জানে না। জানার ইচ্ছেও নেই। রমিজা। আপাতত নিরাপদে থাকুক এটাই কামনা। রমিজার ছেলের কথাও আর তেমন করে ভাবতে পারছে না। ঘরের মধ্যে রইস বসে আছে। রইস থাকা না থাকা সমান। যার কোন বোধই নেই সে আর কি কাজে লাগবে। নিরাসক্ত মুখে বারান্দায় বসে বাঁশবনের মাথার ওপর তাকিয়ে থাকে বুড়ি। পাতার ফাঁকে ছোট্ট একটু আকাশ দেখা যায়। ঝকঝকে নীল আকাশ। কোথাও কোন মেঘ নেই। প্রখর রোদুর। রমিজা আজ ভাত ফোটায়নি। রমিজার চুলোয় আগুন নেই। ওর ইচ্ছে করছে আগুন জ্বালাতে। বাঁশপাতা আমপাতা বুকে নিয়ে চুলোটা যদি এখন দাউদাউ করে জ্বলে উঠে তবে বেশ হয়। ওরা দেখুক সবাই পালায় না। কেউ কেউ আগুন জ্বালায়। কিন্তু উঠতে পারে না। বুড়ির বুক তোলপাড় করে। গফুরের মৃত্যুর সময় অনুভূতি যেমন থমকে গিয়েছিল আজ ঠিক তেমনি লাগছে। কিন্তু বুড়ির মুখে তার কোন প্রকাশ ছিল না। প্রাণপণে সমস্ত জাগতিক চিন্তাগুলো বাতাসে ওড়া তুলোর মত উড়িয়ে দিতে চাইছে। পায়ের কাছে বসে থাকা বাঘা কুকুরটা লেজ নাড়িয়ে গরগর করছে। বুড়ি তাও দেখছে না। সমস্ত বাড়ি এক অসীম শূন্যতায় খা খা করছে। পুব দিকের আমড়া গাছটা ভীষণ চুপ। হাঁস দুটো পালকে মুখ গুঁজে বসে আছে। অথচ সবকিছু ছাপিয়ে বুড়ির চোখের সামনে ভেসে ওঠে কলীমের চলে যাওয়ার দৃশ্য।
রমিজা অনবরত কাঁদে কলীমের জন্য। বুড়ি তাও পারে না। বুড়ির চোখে কোন জল নেই। সেটা এখন খা-খা মরুভূমি। দুদিন পার হয়ে গেছে। রমজান আলীর কাছ থেকে খবর পেয়েছে কলীমকে খুব মারধাের করছে। সলীমের খবর জানতে চাইছে। কলীম কিছুই বলে না। কেবল যন্ত্রণায় কোঁকায়। বুড়ি নিজের হাত কামড়ায়। ঠিকই বলতো ওরা, বুড়ি আসলে কিছুই করতে পারে না। কিছুই করার ক্ষমতা নেই। পেরেছে খাওয়া-দাওয়া ছেড়ে দিতে পারে বারান্দায় নইলে পুকুরঘাটে চুপচাপ বসে থাকতে। পারে অনেক দূরের আকাশের দিকে তাকিয়ে চোখের জলে বুক ভাসাতে।
–আম্মা কলীম ভাইয়ের কি হবে?
বুড়ি রমিজার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। উত্তর জানে ও। কিন্তু বলতে পারে না। জানে কলীমের মৃত্যু ঘনিয়ে আসছে। যেমন গায়ের আরো কয়েকজন গেছে তেমন। ওদের লাশ পুঁতে ফেলেছে, নয় খালে ভাসিয়ে দিয়েছে। কলীমকেও কি তাই করবে? বুড়ি ছটফটিয়ে ওঠে।
–আম্মা আপনি কথা বলেন না কেন?
বুড়ির ঠোঁট কাঁপে। কথা বেরোয় না। রমিজা ফুঁপিয়ে ওঠে। ফুলি এসে খবর দেয়।
রমিজাবু তাড়াতাড়ি পালাও মিলিটারি আসছে।
রমিজা পালিয়ে যায়। কোথাও আর কেউ নেই। শুধু বাঘা লম্বা হয়ে শুয়ে আছে। তখুনি পুরো বাড়িটার ভৌতিক নিস্তব্ধতা কাঁপিয়ে বুটের শব্দে গা ভাসিয়ে ওরা সাতজন খাকি পোশাক পরা লোক বুড়ির সামনে এসে দাঁড়ায়। কলীমকে বেঁধে এনেছে। ওর হাত দুটো পিছমোড়া করে বাঁধা। ওর দিকে তাকিয়ে চোখ ফিরিয়ে নেয় বুড়ি। ও একদম অন্যরকম হয়ে গেছে। ওর দিকে বেশীক্ষণ তাকিয়ে থাকা যায় না। অমানুষিক অত্যাচারে ওর এখন ভিন্ন আদল। মহামারী কবলিত হলদী গাঁ হয়ে কলীম এখন বুড়ির চেতনার দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে। তার জন্যে কোন শোক নেই, দুঃখ নেই, বেদনা নেই। তাকে সাক্ষী করে জন্ম হয় আগুনের। সে বলে দিতে পারে প্রতিশোধের অবদমিত স্পৃহা।
কলীম তোর ঘাড়টা ঝুলে পড়েছে কেন? তুই একবার আমার দিকে চোখ তুলে তাকা। সাহসী বারুদজ্বলা দৃষ্টি ছড়িয়ে দে হলদী গাঁয়ের বুকে। মুছে যাক মহামারী, বন্যা, খরা, দুর্ভিক্ষ। হলদী গাঁয়ের মাটি নতুন পলিমাটিতে ভরে উঠুক?
বুড়ি প্রাণপণ শক্তিতে নিজেকে শক্ত রাখে, যেমনি ছিল তেমনি বসে থাকে। ও যেন ঠিক এমনি কতগুলো সময়ের সমষ্টির অপেক্ষায় ছিল। জানত বন্দী রাজপুত্রের মত কলীম আসবে। এই বাড়িটা জনমানবশূন্যপুরী হয়ে যাবে। কদাকার দানবের দল ছিন্নভিন্ন করে দেবে সাজানো সংসার। ওদের হিংস্র মুখের দিকে একবার তাকিয়ে দৃষ্টি অন্যদিকে ঘুরিয়ে নেয় বুড়ি। একজন উঠোনে কলীমের পাশে দাঁড়িয়ে থাকে। বাকি ছয়জন বুড়ির পাশ কাটিয়ে ঘরে ঢুকে যায়। ঘরের জিনিসপত্র তছনছ করে। দুরন্ত আক্রোশে ক্রুদ্ধ হয়েছে ওরা। রইসের পিঠে এক ঘা লাগায়। হাবা-বোবা ছেলেটার কাছে কোন উত্তর না পেয়ে এক ধাক্কায় ওকে বারান্দায় ফেলে দেয়। রইস কাঁদতেও ভুলে যায়। মুখ দিয়ে গোঙানির মত শব্দ বের হয়। ও গুটিসুটি বুড়ির পাশে এসে বসে। পিঠে মুখ ঘষে। সান্তুনা চায়। পায়ে যে চোট লেগেছে তা ইশারা করে দেখায়। রইসের হাতটা নিজের মুঠিতে শক্ত করে চেপে ধরে বুড়ি। এতক্ষণ ও নিজের ভেতর একটা অবলম্বন খুঁজে পায়।
ওরা ঘরের ভেতর তুলকালাম কাণ্ড বাধিয়েছে। এ বাড়ির প্রতিটি জিনিসের প্রতি ওদের আক্রোশ। সব কিছু তছনছ করে মজা পায়। কাঁথা বালিশ ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে। কাপড় চেরার ফতৃত শব্দ কানে এসে লাগে। ওর মনে হয় এসব জিনিসের ওপর এখন আর কোন মায়া নেই। ওগুলো ছিঁড়ে পুড়িয়ে ফেললে একটুও খারাপ লাগবে না। বুড়ি একদৃষ্টে কলীমের দিকে তাকাতে পারে না। ওর সারা শরীরে কালশিটে দাগ। চোখের ওপরটা ফুলে গেছে বলে ভাল করে তাকাতে পারছে না। তবুও পাংশু বিবর্ণ দৃষ্টিতে বুড়িকেই দেখছে। ওর ঠোঁট নড়ছে। ও হয়ত কিছু বলতে চাচ্ছে। বুড়ি ভেবে কুলিয়ে উঠতে পারে না যে ঠিক এ মুহূর্তে কলীম কি বলতে পারে? ওর মনে এখন কিসের দাপাদাপি? বুড়ির মনে হয় কলীমের জন্মের ছয় মাস পর ওর মা মারা গিয়েছিল। সে মায়ের কথা কলীমের মনে নেই।
