বুড়ি কে? বুড়ি শুধু ওকে মমতা দিয়েছে। কিছু ভালবাসা। দুটো মিষ্টি কথা শুনিয়েছে। এর বেশি কিছু বুড়ি ওর জন্যে করেনি। ঐটুকু সম্বল করেই এখন ওর কাছে গিয়ে দাঁড়াতে চায়। শুনতে চায় কলীম কি বলবে। ওর কাছে যাবার জন্যে সিড়ি দিয়ে নামে। দুপা এগোতেই রাইফেলধারী তেড়ে আসে। যেখানে বসেছিল সেখানে বসে থাকতে হাত দিয়ে নির্দেশ করে। ওর সেই ক্রুদ্ধ ভয়াবহ মুখের দিকে চেয়ে বুড়ির চোখের সামনে হলদী গা দুলে ওঠে। সমস্ত কিছু অন্ধকার হয়ে যায়। ফিরে আসে। অথচ ওর এখন ভীষণ ইচ্ছে করছে কলীমকে একবার ছুঁয়ে দেখতে। ওর রক্তে কিসের মাতামাতি একবার কান পেতে শুনতে চায়। মৃত্যুর ছায়া ভাসে যুবক কলীমের সমস্ত অবয়বে। বুড়ি আর তাকাতে পারে না। দৃষ্টি ঘুরিয়ে নেয়। সৈনিকের হেলমেটের ওপর দিয়ে দিগন্তে সে দৃষ্টি আছড়ে পড়ে। রইস ভীষণ অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। বাঁশবনের মাথায় মৃদু বাতাস। বুড়ির অবয়বহীন কঠিন মন শিমুল বীজের মত ফেটে যেতে চাইছে।
যমদূতের মত বুড়ির সামনে এসে দাঁড়িয়েছে ওরা ছয়জন। ঘরের ভেতর কিছু না পেয়ে ক্ষিপ্ত। এতক্ষণ অকারণ শক্তি ক্ষয় করেছে। গলা ফাটিয়ে চিৎকার করছে ওদের একজন। জানতে চাইছে সলীম গোলাবারুদ রেখেছে কোথায়? হলদী গাঁয়ের আন্দোলনের নেতার কাছে অস্ত্রশস্ত্র নেই এ কি করে সম্ভব? বুড়ি ওদের কথা কিছুই বুঝতে পারছে না। ওরা যে ভাষায় কথা বলছে বুড়ির এত বছরের জীবনে তা কোন দিন শোনেনি। কেবল সলীমের নামটা ধরতে পারছে। ওরা বুড়িকে আকারে ইঙ্গিতেও বোঝাতে চেষ্টা করছে। বারবার। অনেকবার। উত্তর দেয় না। ওর গলার মধ্যে বাঘা কুকুরটার মত গরগর শব্দ হচ্ছে। তখুনি বুড়ির মনে হয় এরা কারা? এরা কি হলদী গাঁয়ের জলহাওয়া, পলিমাটি, নদীর কূলে বেড়ে ওঠা লোক? গাঁয়ের নেংটিপরা মানুষগুলো বুড়ির চোখের সামনে ভেসে ওঠে। ওদের কথা ও বোঝে। শহর থেকে দুচারজন এলে কষ্ট হলেও ওদের কথা বোঝে। কিন্তু এরা কেন বুড়ির খুব কাছের মানুষ নয়? তখুনি ও চিক্কার করে ওঠে, ঐ কলীম এই শুয়োরগুলি কি বলে?
ওরা কলীমকে ধাক্কা দিয়ে বুড়ির পায়ের কাছে ফেলে দেয়। উপুড় হয়ে পড়ে থাকা কলীমের দেহটা ওরা একজন পা দিয়ে চেপে রাখে। কলীম বুঝি বাঁকানো বেত। ছেড়ে দিলে ছিটকে উঠবে। আসলে কলীম কিছুই করতে পারছে না। কলীমের হাত বাঁধা। অত্যাচারে ক্ষতবিক্ষত। তবুও হাত বাধা না থাকলে ও হয়ত একটা কিছু করত। অন্তত করতে চেষ্টা করত। সেটাও বুড়ির জন্য সান্ত্বনার কারণ হত। কলীমের অসহায়ত্ব বুড়িকে মরমে মারে। ওরা কলীমের পিঠে বুটের লাথি বসিয়ে বলছে, কোন খবর না দিলে ওরা কলীমকে মেরে ফেলবে। ওদের ক্রুদ্ধ আক্রোশে এখন বারুদের স্ফুলিঙ্গ। যে, কোন মুহূর্তে দপ করে জ্বলে উঠবে। . বুড়ি বিড়বিড় করে, তোর মা থাকলে কি করত আমি জানি না কলীম। কিন্তু আমি কিছু করতে পারি না? বড় পাওনার জন্য কাউকে কাউকে বুঝি এমনি করে মরতে হয় কলীম। তুই আর আমাকে মা ডাকিস না। আমি তোর মা হওয়ার উপযুক্ত না।
বুড়ি হাত দিয়ে চোখ মোছে। সলীমের মুখটা মনে হয়। পাশাপাশি দুজনের। কে আগে সলীম না কলীম? বুড়ি সলীমকে কথা দিয়েছে ওর কথা কাউকে বলবে না। কিন্তু নিজেও তো জানে না সলীম কোথায়? কলীম এখন মরে যাচ্ছে। একদম বুড়ির চোখের সামনে। বুড়ি কি করবে? বুড়ির জীবনের বিনিময়ে কি ওরা কলীমকে ছেড়ে দেবে? হঠাৎ বুড়ি চিৎকার করে বলতে থাকে, তোমরা আমাকে মার। ওকে ছেড়ে দাও। ছুটে গিয়ে একজনের পা ধরে, তোমরা আমাকে মার? আমাকে মার ….।
ওরা ছয়জন পরস্পরের মুখ চাওয়াচায়ি করে। বুড়ির কথা বুঝতে পারে না। ফাঁক পেয়ে কলীম ছিটকে ওঠে।
–মা
সঙ্গে সঙ্গে ওরা কলীমকে বুটের লাথি দেয়। কলীমের আর্তচিৎকারে বুড়ি চুপ করে যায়। আবার সিঁড়ির ওপর ফিরে আসে। আজ ওরা ছয়জন আজরাইলের মত। বুড়ি আজরাইলের একটা স্পষ্ট চেহারা বহুবার মনে করার চেষ্টা করেছে। পারেনি। এখন একটা সুস্পষ্ট ধারণা হচ্ছে।
ওরা বুড়িকে ধরে ঝাঁকুনি দিচ্ছে। বুকের ওপর রাইফেলের ঠাণ্ডা নল চেপে ধরে আছে। গুলি করবার ভয় দেখাচ্ছে। কলীম মাঝে মাঝে মুচড়ে উঠছে। ফাটা মাঠের মত কলীমের মুখ। একটা কিছু চাচ্ছে। এক একবার ইচ্ছে করে ছুটে গিয়ে ওকে বুকে জড়িয়ে ধরতে। কিন্তু শরীরটা পাথরের চাইতেও ভারি। টেনে ওঠানো যায় না।
ওদের গর্জনের মুখে বুড়ি কেবল বিড়বিড় করে, আমার কিছুই করার নেই। কেউ কেউ এমনি করেই মরে যায়। কাউকে কাউকে মরতে হয়।
বুড়ি আর কিছু করতে পারছে না। কণ্ঠে কোন শব্দ নেই। এমনকি কোরানের আয়াতও না? যে আয়াত স্মরণ করলে বুকে বল ফিরে আসে তা কেন একটাও স্মরণে আসছে না? গফুরের মুখ স্মরণ করার চেষ্টা করে। কিন্তু তাও পারে না। সমস্ত হলদী গাঁ একাকার হয়ে বুড়ির চোখের সামনে লুটোপুটি খায়। ওর কেবলই মনে হয় রমিজার ছেলে কোথায় যেন কাঁদছে।
বুড়ির কাছে কোন উত্তর না পেয়ে ওরা ফিরে দাঁড়ায়। নিজেরা কয়েক মুহূর্ত কি যেন আলোচনা করে। সদম্ভ পদক্ষেপে ভীষণ কিছু ঘোষণা করে। হেঁচকা টানে কলীমকে দাঁড় করিয়ে দেয়। উঠোনের মাঝখানে নিয়ে গুলি করে। মুখ থুবড়ে পড়ে যাওয়া কলীমের দেহটা এক লাথি দিয়ে ওপাশে গড়িয়ে দেয়। আবার এক লাথি দিয়ে এপাশে। তারপর হাসিতে শিসে গানে আনন্দ প্রকাশ করতে করতে ওরা চলে যায়।
গুলির শব্দ এসে বিধে বুড়ির হৃদয়ে। গুলির শব্দটা ঠিক সেই মুহূর্তে কলীমের মা ডাকের মত। তীক্ষ। তীব্র। এঁফোড় ওফোড় করে বেরিয়ে যায়। বুড়ির মুখ দিয়ে কোন আর্তনাদের ধ্বনি বের হয় না। কেবল কুকুরটা ভীষণ শব্দে ঘেউ ঘেউ করছে। ইতস্তত ছুটোছুটি করছে। মাটি আঁচড়াচ্ছে। দাঁড়িয়ে লম্বা নিঃশ্বাস নিচ্ছে। বুড়ির সামনে দাঁড়িয়ে কিছু বলতে চাইছে। সারা বাড়িতে আর কোথাও কোন শব্দ নেই। রইস মাকে ধরে আঁকুনী দেয়। হাত ধরে টানাটানি করে।
