–তোরা যা বাবা। আমি একটু পরে আসি।
সলীম কলীম চলে যায়। আশেপাশের ঝোপঝাপে খস্ খস্ শব্দ হয়। বুড়ির বুক ভয়শূন্য হয়ে থাকে। শুধু সলীমের পালিয়ে যাওয়া ওকে কেমন অভিভূত করে রাখে। ও কিছুতেই মেনে নিতে পারে না। ঝিঝির শব্দে বুড়ির কানে তালা লাগে। বাঁশবনের মাথার ওপর দিয়ে অনেক দূরের আকাশটা ধূসর, ম্রিয়মাণ। ফেলে আসা দিনের মত মনে হয় বুড়ির কাছে।
একসময় ও বিছানায় ফেরে। রইস হাত পা ছড়িয়ে শুয়ে আছে। ও কিছুই জানে। রইসের পাশে গুটিশুটি শুয়ে পড়ে বুড়ি। ঘুম আসে না। পাশের ঘরে রমিজা কাঁদছে। বিয়ের পর থেকে দুজনে কোনদিন একলা হয়নি। সলীম ওকে সঙ্গে করে বাপের বাড়ি নিয়ে গেছে আবার নিজেই সঙ্গে করে নিয়ে এসেছে। রমিজা এখন একলা হয়ে যাচ্ছে। সলীম খুব নরম স্বরে কথা বলছে। বুড়ির ভাবতে ভাল লাগে যে ছেলেটা একদম পাল্টে গেছে। ছেলে হবার পর থেকে আর সলীম ওর গায়ে হাত তোলেনি। রমিজার জন্যে সলীমের এখন অনেক ভালবাসা। সলীম এখন রমিজাকে বুকে নিয়ে আদর করছে। তাড়াতাড়ি ফিরে আসবে বলে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। রমিজার কান্নার রেশ কমে আসছে। রইস ঘুমের ঘোরে বিড়বিড় করে। বুড়ি বিছানার ওপর উঠে বসে থাকে। কিছুতেই ঘুম আসে না।
ভোররাতে সলীম ওঠে। এক সানকি পান্তা খেয়ে নেয়। ছেলেকে আদর করে। বুড়ির পায়ে হাত দিয়ে সালাম করে। চুপিচুপি জলিল আসে, একটুও শব্দ না করে। বুড়ির কাছ থেকে বিদায় নেয়। ওর ভিটের দিকে খেয়াল রাখতে বলে। সকাল সন্ধ্যায় ঘরদোর আঙিনা যেন ঝাড় দেয়া হয় সেকথা বলে। মাচায় অনেক ঝিঙ্গে ধরেছে। তুলে এনে রাধতে বলে। শেষে জলিল চোখের জল আর রাখতে পারে না। বুড়ির চোখও ছলছলিয়ে ওঠে। সলীম ধমক দেয়।
–আঃ চাচা কি হচ্ছে। চোখে পানি থাকলে যুদ্ধ হয় না চাচা। তাড়াতাড়ি যাই চলেন।
জলিল আর একটা কথাও বলে না। সলীমের সঙ্গে রওনা করে। একবারও পেছন ফিরে চায় না। কেশে নিয়ে রুদ্ধ কণ্ঠ পরিষ্কার করে না।
বুড়ি বাঁশবন পর্যন্ত আসে। মনে হয় এ ঘটনা ওর জীবনে একদম নতুন। কাউকে এমন করে কোনদিন চলে যেতে দেখেনি ও। চুপে চুপে কাদে। জোরে কাঁদতে পারে না। নির্ঘুম চোখের পাতা জলের স্পর্শে কাতর। সে জল ধরে রাখতে চায় বুড়ি, মুছে ফেলতে ইচ্ছে হয় না।
সলীম চলে যাবার দুদিন পরে স্টেশনে যাবার বড় রাস্তা দিয়ে মিলিটারি আসে হলদী গায়ে। জ্যৈষ্ঠের প্রচণ্ড গরমে মাটি পুড়ে যায়। বাতাস দম ধরা। গাছের পাতা নড়ে না। বুড়ির সিঁদুরিয়া আম পেকে লাল। ওরা ফাঁকা আওয়াজ করতে করতে ঢোকে। নদীর ধারে ক্যাম্প করে। বুড়ি স্টেশনে যাবার রাস্তায় দাঁড়িয়ে দেখেছে। কিছুই প্রকাশ করতে পারে না। ওর মনে কুটুম পাখির আনাগোনা। ফিরে এসে ঘরের দাওয়ায় ধপ করে বসে পড়ে। রমিজার শুকনো মুখের দিকে তাকিয়ে বুড়ি বলে, কুটুম এসেছে রমিজা।
রমিজা কথা বলতে পারে না। ছেলেকে বুকের সঙ্গে চেপে ধরে। মাছ-কোটা বটি উঠোনে কাত হয়ে পড়ে থাকে। চুলোয় আগুন জ্বলে না। দুই-মুখো চুললাটা শীতল ছাই বুকে নিয়ে শান্ত। রমিজা ফ্যাসফ্যাসে কণ্ঠে বলে, আমাদের কি হবে আম্মা?
–যা হয় হবে। বুড়ি শক্ত মুখে সজনে গাছের মাথার ওপর দিয়ে তাকিয়ে থাকে।
–আমার ভয় করে।
–অত ভয় করতে নেই রমিজা। দে ছেলেটাকে আমার কাছে দে।
বুড়ি নাতি বুকে নিয়ে সুপপারি বাগানে আসে। ওখান থেকে ক্যাম্পটা পরিষ্কার দেখা যায়। ওরা কি করে দেখতে চায় বুড়ি। এমন অতিথি বুড়ি আর কোনদিন দেখেনি।
রাতে কলীমের মুখের দিকে চেয়ে বুড়ির বুক মুচড়ে ওঠে।
–তুইও পালিয়ে যা কলীম?
–কেন মা?
–সলীম গেছে তোর থাকা ঠিক না।
–বড় ভাই যে চলে গেছে এই খবর মনসুর মেম্বার ওদের জানিয়ে দিয়েছে।
–তোকে কে বলল?
–মনসুর মেম্বারই। ওদের সঙ্গে মনসুর মেম্বার খুব জমিয়েছে। গাঁয়ের খবরাখবর দিচ্ছে।
–তুই কোথাও চলে যা বাবা?
–তোমাদের কি হবে?
–আমরা ঠিকই থাকতে পারব।
–তা হয় না মা। তোমাদের রেখে বাড়ি খালি করে আমি যেতে পারি না। বুড়ি আর কথা বলে না।
–জান মা মনসুর মেম্বার বললো খুব লাফালাফি করছিলে বাবারা এবার মজা টের পাবে। ভিটেয় ঘুঘু চরিয়ে ছাড়বে। আমি অবশ্য একটুও ভয় পাইনি। মনসুর মেম্বারের মুখের ওপর কড়া জবাব দিয়ে দিয়েছি। ইচ্ছে হচ্ছিল পাছায় দুটো লাথি মেরে দেই। ব্যাটা আস্ত শয়তান। উঃ কেমন করে যে হাসছিল। ভাবলে এখনো গা জ্বলে উঠে।
বুড়ি আর রমিজা কলীমের কথা শুনে কাঠ হয়ে যায়। কলীমের খাওয়া শেষ হলে বুড়ি আবার ওকে পালানোর কথা বলে। কলীমের চোখ লাল হয়ে ওঠে। রুক্ষভাবে বলে, নিজের ভিটে ছেড়ে কোথাও যাব না। ওদের ভয়ে পালাবো নাকি? কি করবে দেখিই না?
০৮. কলীম উঠোনে নেমে গেলে
কলীম উঠোনে নেমে গেলে বুড়ির গলা দিয়ে ভাত নামে না। দুতিনবার খেয়ে দুই ঢোক পানি গিলে উঠে পড়ে। বুকের ভেতর ভাতের দলা আটকে যায়।
তল্লাশি কুকুরের মত সারা গায়ে সলীমকে খোঁজে ওরা। মনসুর মেম্বারের পালিয়ে যাওয়ার খবর অতোটা বিশ্বাস হয়নি। সলীমকে না পেয়ে কলীমকে ধরেছে। তখন ভোরের আজান দিয়েছে। কলীম বিছানায় কুঁকড়ি মেরে শুয়ে আছে। বুড়ি কেবল দরজা খুলে বেরিয়েছে, তখনই ওরা সাতজন সজনে গাছের নিচে এসে দাঁড়ায়। বুড়ি কিছু ভেবে কুলিয়ে ওঠার আগেই ঘরে ঢোকে। রমিজা পুকুরঘাটে ছিল ওখান থেকেই সুপপারি বাগানে পালিয়ে যায়। বুড়ি বাঁশের খুঁটি ধরে বারান্দার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। কলীমকে ধরে আনে ওরা। ওদের হাতে কলীমকে দেখে দৈত্যের হাতে রাজপুত্রের মত মনে হয় বুড়ির। কলীমের চোখে তখনো ঘুম ভাঙা আমেজ। কলীমকে নিয়ে ওরা উঠোন পেরিয়ে চলে যায়। বুড়ি কিছু বলতে পারে না। ছুটে জলপাই গাছটার নিচে এসে দাঁড়ায়। কলীম একবারও পেছন ফিরে তাকাবার সুযোগ পায় না। ওরা সাতজন সৈনিক রাস্তা কাঁপিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। ওদের কলরবে মাঠের চড়ই নিশ্ৰুপ হয়ে যায়।
