–আরেক জন্মে তুই ঠিক মেছুনী ছিলি রমিজা। নইলে মাছের সঙ্গে তোর এত ভাব কেন?
রমিজা হাসে। সেই চিরাচরিত খুখু হাসি। ওর মাছ কাটা শেষ হলে ঝঙ্কার দিয়ে ওঠে।
–আপনি যে সারাদিন কি এত ভাবেন আম্মা?
–বুড়ি ওর কথায় উত্তর না দিয়ে বলে, কুটুম পাখি ডাকে রমিজা।
–ডাকুক। কে আর আসবে। আমার বাপ তো গত মাসেই এসে গেল। এই মাসে আর আসবে না।
রমিজা মাছ ধুতে পুকুরঘাটে চলে যায়। কখনো বুড়ির এ ধরনের উদ্ভট ভাবনা চিন্ত Tয় ও রেগে যায়। শাশুড়ী বলে বেশি কিছু বলতে পারে না। রমিজার পিছু পিছু বুড়িও পুকুরঘাটে এসে বসে। জায়গাটা ভীষণ ছায়াচ্ছন্ন। জলের বুকে শ্যাওলা ভাসে। বেতবনে ডাহুক ডাকে। বিরাট একটা বরই গাছ পুকুরের ওপর ঝুঁকে পড়ে আছে। পচা পাতার গন্ধ আসছে, গন্ধ আসছে কাদামাটির। রমিজা ঘাটের জল ঘোলা করে মাছ ধুয়ে চলে যায়। মাছের আঁশটে গন্ধ বুড়ির কেমন বিদঘুটে লাগে। নারকেলের চিকন পাতার ফাঁক দিয়ে এক টুকরো রোদ এসে পড়েছে পানির ওপর। সব কিছু একাকার হয়ে মুছে গিয়ে বটির গায়ে রক্তের ক্ষীণধারা বুড়ির চোখের সামনে ভেসে ওঠে। তাজা ফটফটে মাছগুলোর লাফানি বন্ধ হয়ে যায় এক পোঁচে। বুড়ির মনে হয় কুটুম আসবে। অর্থাৎ এই যে এ কুটুম সে কুটুম নয়। বন্যা, মহামারী, খরা যেমন ও ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় দিয়ে টের। পায় এ কুটুমের আগমন তেমনি। মাঠ ঘাট প্রান্তর তোলপাড় করে দিয়ে ওর আঙ্গিনায় কুটুম আসছে।
রাতে ঘুম আসে না বুড়ির। সন্ধ্যারাত থেকে সলীম কলীম জল্পনা-কল্পনা করছে। ভোররাতে সলীম সীমান্ত পার হওয়ার জন্যে চলে যাবে। কলীম থাকবে ওদের দেখাশোনার জন্যে। রমিজা কান্নাকাটি করে এখন শান্ত হয়ে শুয়ে আছে। বুড়ি ওদের কথা কিছুই বুঝতে পারে না। বিকেলে জলিল বলছিল গ্রামে থাকা নাকি নিরাপদ নয়। তাড়াহুড়োয় বেশি কথা বলতে পারেনি। সলীমের সঙ্গে জলিলও যাচ্ছে। জলিলের সঙ্গে। দুদণ্ড কথা বলার ইচ্ছে ছিল। কিন্তু হয়নি। ওরা ভীষণ ব্যস্ত। কথা বলারও সময় নেই। গাঁয়ে কি হলো আবার? বুড়ির জীবনে এমন ঘটনা ঘটেনি। গ্রাম থেকে কাউকে পালিয়ে যেতে হয়নি। যত কিছুই ঘটুক সকলে গ্রামে থেকেছে। সুখে-দুঃখে বিপদে-আপদে বুকে বুক মিলিয়ে। কিন্তু এখন কি হল? কারা ওদের তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে? হলদী গাঁ কি দখল করে নিল কেউ? এর আগে হলদী গা কোনদিন এমন করে নিজেকে জানান দেয়নি। বুড়ির ছেলেবেলায় মাঝে মাঝে শহর থেকে লোক আসত বসন্তের টিকা দেবার জন্যে তখন বুড়ি দেখতো বাড়ির মেয়েরা ভয়ে যে যেদিকে পারত লুকিয়ে যেত। কিন্তু তখন তো গোটা গাঁয়ের লোকের চোখেমুখে এমন ভয়-ভীতি দেখেনি। বরং লুকোনোর জন্যে বাবার কাছে গালি শুনত ওর মা, চাচি, বোনেরা। এখন কি হল? বুড়ির কিছুই ভাল লাগে না। বিছানা থেকে উঠে দাওয়ায় এসে বসে। ওপাশ থেকে সলীম ডাক দেয়।
–কি হয়েছে মা?
–কিছু না রে।
–বাইরে গিয়ে বসলে কেন?
–বুকটা কেমন ধড়ফড় করে।
সলীম উঠে এসে ওর পাশে বসে। কলীম আসে। রমিজাও। বুড়ি টের পায় আসলে ওরা কেউই ঘুমোয়নি। সবাই চুপচাপ শুয়েছিল কেবল। অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে বা আকাশ পাতাল ভাবছে। হঠাৎ বুড়ি শব্দ করে কেঁদে ওঠে। নিজের আবেগ ধরে রাখতে পারে না। এ কদিনের গুমোট পরিবেশে ভেতরে ভেতরে একটা রুদ্ধ
অভিমান জমে উঠেছিল। আজকের কান্না তার বহিঃপ্রকাশ।
–আঃ মা চুপ কর। কেউ শুনতে পাবে।
–তুই যাবি কেন বাবা?
–খবর পেয়েছি গ্রামে মিলিটারি আসবে।
–মিলিটারি? বুড়ির চোখ বিস্ফারিত হয়।
বুঝতেই পারছ আমাকে পেলে ওরা জ্যান্ত রাখবে না। বসে বসে মরার চাইতে ওদের সঙ্গে একবার লড়েই দেখি। শোন মা, আমি যে যাচ্ছি একথা কাউকে বলবে না। জানাজানি হলে তোমাদের ওপর বিপদ আসবে। কেউ জিজ্ঞাসা করলে সোজা বলে। দেবে জানি না।
বুড়ি মাথা নাড়ে। কলীম চুপ করে বসে আছে। ও এমনিতেই কম কথা বলে। অন্ধকারে ওদের শ্বাস-প্রশ্বাস ওঠানামা করে। সলীম একটা বিড়ি ধরায়। রমিজার ছেলে কেঁদে উঠলে ও চলে যায়। অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ ওদের তিনজনের সামনে হাঙরের মুখের মত হাঁ করে আছে। কারো মনে কোন স্পষ্ট ধারণা নেই। সামগ্রিক অবস্থাকে নির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে কেউ ধরতে পারছে না। সলীম লড়তে যাচ্ছে। ফলাফল জানা নেই। ও ফিরে আসতে পারবে কি না জানে না। যারা এখানে থাকবে তারাও একটা অনিশ্চিত অবস্থা মোকাবেলা করার জন্যে প্রস্তুতি নিচ্ছে। এর বাইরে ওরা আর কেউ কিছু জানে না। ওরা খুব সাধারণ। ওদের কোন গভীর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা নেই–চেতনা নেই। ওরা কেবল বোঝে দেশের সীমানা এবং মাটি। এটুকু সম্বল করেই ওরা এগোয়। বিপদে বুক পেতে দেয়। প্রয়োজনে ঝাঁপিয়ে পড়ে। প্রাণের এই গভীর টানটুকু আছে বলেই ওরা অনমনীয় এবং দুর্বার হয়ে ওঠে।
সলীম শেষ টান দিয়ে বিড়িটা উঠোনে ছুড়ে ফেলে। ওরা তিনজন অনেক্ষণ ধরেই চুপচাপ। কারো মুখেই কথা নেই। কলীম হাই তোলে। সলীম উঠে দাঁড়ায়।
–যাও মা ঘুমোও। আবার ভোররাতে উঠতে হবে।
বুড়ি আঁচলে চোখ মোছে। সলীম বুড়ির কাছে এসে বসে।
–ও-মা-মাগো। তুমি এমন করলে কে আর আমাকে শক্তি যোগাবে বল? তুমি মন খারাপ করলে কে আর আমাকে সাহস দেবে? ভোর ভোর রওনা করতে না পারলে দিনের বেলা আবার সব জানাজানি হয়ে যাবে। যাও মা, ঘুমোও।
সলীম বুড়িকে হাত ধরে টেনে ওঠায়। ওর কথায় বুড়ি কোন সান্ত্বনা পায় না। উঠতেও ইচ্ছে করে না।
