খাওয়া-দাওয়ার পর বুড়ি চিকন সুপপারি কাটতে বসে। বিকেলের দিকে পান চিবুতে চিবুতে চলে যায় নীতা। পিঠে কাপড়ের পুঁটলি, হাতে দোতারা, কণ্ঠে গান:
জননী জন্মভূমি
আমার সোনার বাংলাদেশ……….
নীতা বোধহয় পথ খুঁজে পেয়েছে। নীতার সেই অস্থিরতা নেই। মনের মানুষের অভাব ওকে বিষন্ন করে রাখে না। এখন একলাই পথ চলতে পারে। কারো অপেক্ষায় বসে থেকে পথচলা থামিয়ে রাখে না। ও নিজের ভেতর একটা আশ্রয় খুঁজে পেয়েছে। ওর আর অন্য কিছুর দরকার নেই। আসলে এমনি হয়। ভেতরের চাওয়া ফুরিয়ে গেলে বাইরের কোন কিছুর জন্যে আর ছুটতে হয় না। তখন নিজের ওপরে চমৎকার ভালবাসা গজায়। সমাহিত হয়ে যায় মন। বারান্দায় এক কোণে মাদুর পেতে রমিজা ছেলে বুকে নিয়ে ঘুমিয়ে আছে। ওর ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকালে মনে হয় না যে পৃথিবীর জন্যে কোন চিন্তা ওর মনে আছে। এ জন্যেই ও শান্তিতে ঘুমোতে পারে। যত জ্বালা বুড়ির। এমন একটা মন না থাকলেই বোধ হয় ভাল হত। কখনো অকারণ যন্ত্রণায় বুক ফেটে কান্না আসে। পরক্ষণে বুড়ি নিজেকে শাসায়। খারাপ কিছু না ভাবাই ভাল। আসলে রমিজার ঘুমের অন্য কারণ আছে। সারাদিন ভীষণ খাটুনি করে বেচারী। সংসারের সব কাজ একলা সামলায়। খুব অসুবিধা না হলে বুড়িকে ধরতে দেয় না। বুড়ির মায়া হয় ওর জন্যে। দুপুরে ঘুমোতে পারে না বুড়ি। সলীম লীমের ভাত আগলে বসে থাকতে হয়। এই একটা কাজ রমিজা ওকে দিয়েছে। রাতের বেলাও তাই। ওদের ফিরতে যত রাতই হোক বুড়ি ওদের ভাত নিয়ে বসে থাকে। আজও বারান্দার ওপর গালে হাত দিয়ে বসে আছে। বাড়িটা চুপচাপ। নিস্তব্ধ। বুড়ি নিঃসঙ্গ। মাঝে মাঝে বুক মোচড় দিয়ে ওঠে। নীতার দোতারার টুংটাং শব্দের মত।
দুপুরে কিংবা বিকেলে মাঝে মাঝে জলিল আসে। খুব দ্রুত বুড়িয়ে গেল ও। বুড়ির। কাছ থেকে পান চেয়ে নিয়ে খায়। এখন আর কেউ নেই ওর। মা-ও মারা গেছে অনেকদিন আগে। কোনদিন রাধে, কোনদিন রাধে না। কখনো রমিজার কাছে এসে বলে, হাঁড়িতে কিছু আছে নাকি রমিজা?
রমিজার হাঁড়িতে পান্তা সব সময় থাকে। জলিলকে কখনো ফিরিয়ে দিতে হয়নি। বুড়ি কাছে বসে জলিলের খাওয়া দেখে। জলিল কখনো মুখ তুলে বলে, নেংটি পরা মানুষগুলোর পেটে ভাত না থাকলে কি হবে কলজায় সাহস আছে বুড়ি। সেই দিনকার ঢাকা শহর তো তুমি দেখনি। অফিস-আদালত, কল-কারখানা, স্কুল-কলেজ সব বন্ধ। মিছিল আর মিছিল। এখনো আমার চোখের সামনে ভাসে। তারপর–তারপর রাতের অন্ধকারে …..। নাহ্ মাথাটা কেমন করে। গুলি–আগুন।
–এসব কথা থাক। তুমি খাও জলিল ভাই।
–আমাদের হাতে কিছু ছিল না বুড়ি।
–ছিল না এখন জোগাড় কর।
–সেটাই তো করছি। প্রতিশোধ না নিয়ে ছাড়ব না।
জলিলের খাওয়া শেষ হয়। বুড়ি পান এগিয়ে দেয়। পান নিয়ে চলে যায় ও। বুড়ি যতিতে চিকন সুপারি কাটে। কুটুস কুটুস শব্দে বুড়ির মনে হয় সোনার কাঠি, রূপার। কাঠি। জলিলের কথাগুলো রূপকথার মত। বন্যা, খরা, আকাল ছাড়া আর কোন দানব তো বুড়ির চোখে পড়েনি। অথচ জলিলের কথায় সেই দানবের একটা ছবি ফুটে ওঠে। ওর সুপপারি কাটা থেমে যায়।
জ্যৈষ্ঠের মাঝামাঝি। বুড়ির সিদুরিয়া গাছের আমে পাক ধরেছে। ওর মনে খুশি। নাতিটাও বেশ ডাঙর হচ্ছে। কি যে আনন্দ ওকে নিয়ে। এখন ওকে বুকে করে এখানে ওখানে যায়। পরিবর্তনটা সহজেই টের পায়। কি যেন হয়েছে ওদের। এবার অন্যরকম। বুকের ছাতি ফুলিয়ে জয় বাংলা বলে চিৎকার করে না। সলীম লীমের মুখ শুকনো। ঠিকমত খাওয়া-দাওয়া করে না। কথা বললে রেগে যায়।
আবার মনে ভাবনা এসে জড়ো হয় বুড়ির, হলদী গার লোকের চোখে মুখে কেন সন্ত্রাস? কাচারীঘরের পাশে দাঁড়িয়ে একদিন সলীম আর জলিলের কথা শোনে।
–গাঁয়ে ঢোকার মুখের পুলটা যদি ভেঙে দেই জলিল চাচা তাহলে ওরা আর ঢুকতে পারবে না?
–না রে ঠিক হবে না। ছোট একটু নদী। ওরা নৌকা জোগাড় করে পার হবে। কিছুতেই ওদের আটকে রাখা যাবে না।
–হ্যাঁ ঠিকই বলেছেন। ভেঙে দিলে বরং গাঁয়ের লোকের অসুবিধা হবে।
দুজনে চুপ করে থাকে। বুড়ি সরে আসে। খালের ধারে দাঁড়িয়ে দেখে। স্টেশনে যাবার রাস্তার পাশেও দাঁড়ায়। লোকগুলো ফিসফিসিয়ে কি যেন বলাবলি করে। সবার চোখে আতঙ্ক। বুড়ি বুঝতে পারে না ব্যাপারটা। কি হল আবার? ওরা কি এত ভাবে? ঘুরেফিরে রমিজার কাছে এসে বসে।
–জানিস রমিজা ওদের যেন আবার কি হয়েছে?
রমিজা ডালের পাতিল নামিয়ে রেখে অবাক হয়ে তাকায়।
–কাদের?
–ঐ যে হলদী গার লোকগুলোর।
–ধুত আম্মার যে কি বাতিক! কেবল সারাদিন রোদে ঘোরাঘুরি করলে মাথা গরম হবে না।
ও খলুইয়ে রাখা মাছগুলো টেনে নিয়ে মাছ কাটায় মনোযোগ দেয়। বুড়ি আর কথা খুঁজে পায় না। রমিজা অবলীলায় কচ্ করে মাছ কাটে। রক্তের ধারা গড়ায় বঁটির গায়ে, রমিজার হাতে, মাটির ওপরে। তাজা ফটফটে মাছগুলো সলীম পুকুর থেকে ধরে দিয়ে গেছে। এক খ্যাপে অনেক উঠেছে। জালে বেঁধে মাছ উঠোননাও দেখেছে বুড়ি। আজ ভেতরের পুকুর থেকে মাছ ধরেছে ও। সলীম কখনো এক খ্যাপের বেশি দুই খ্যাপ দেয় না। নিজের হাতে মাছ মারাটা সলীমের বিশেষ শখ। পারতপক্ষে অন্য কাউকে দিয়ে মাছ ধরায় না ও। বিশেষ করে বাড়ির পুকুরের মাছ। জাল ঝেড়ে দেবার সঙ্গে সঙ্গে মাছগুলো বুড়িই টুকরিতে উঠিয়েছে। এনে ডালা দিয়ে ঢেকে রেখেছে। কাটতে বসেনি। রমিজা অন্য কাউকে কাটতে দেয় না। এ নিয়ে বুড়ি মাঝে মাঝে ঠাট্টা করে।
