–সেই মানুষটাকে আনলি না কেন?
–ও বেশি বেরুতে পারে না। মাঝে মাঝে পায়ে একটা ব্যথা হয়।
–আবার এলে আনবি।
–হ্যাঁ তোর এখানে একবার না আনলে নিজেই শান্তি পাব না যে। নীতা দুহাত দিয়ে চুলের খোপা বাধে।
–বেলা অনেক গড়িয়ে গেল এবার উঠি সই?
বুড়ি নাতিকে দোলনায় শুইয়ে দেয়। রমিজা গোসল সেরে ফিরে এসেছে। ভিজে কাপড় সপ্ স করে। ওর ভিজে শরীরের দিকে তাকিয়ে নীতার দেহ শীতল হয়ে যায়।
–চল সই ডুব দিয়ে আসি। বুড়ির কথায় সাড়া দেয় নীতা।
–চল। যা গরম। সব যেন পুড়ছে।
দুজনে পুকুরের ঘাটে এসে দাঁড়ায়। পুকুরের শ্যাওলা সবুজ জলে অনেকক্ষণ ধরে নিজের ছায়া দেখে নীতা। চারদিকে ঘন ঝোপঝাপ। তারই ছায়ায় ঠাণ্ডা শীতল জল।
এই গরমেও গায়ে হিম ধরে। পুবদিকের একটা গাছে বসে কুটুম পাখি ডাকে।
–বুড়ি বলে, আজকাল কেবলই কুটুম পাখি ডাকে।
–কুটুম আসবে।
–তেমন কুটুম আর কৈ? আর আসবেই বা কে? আছেই বা কে? বুড়ি যেন নিজেকেই বলে। নীতা সরসরিয়ে পানির বুকে নেমে যায়। এক ডুবে চলে যায় পুকুরের মাঝখানে। বুড়ি ঘাটের কাছাকাছি থেকে ডুব দেয়। ও কখনো গভীর জলে যেতে পারে না। কেমন ভয় লাগে। শরীর শিরশিরিয়ে ওঠে। দুই তিন ডুব দিয়ে বুক পানিতে দাঁড়িয়ে থাকে বুড়ি। এক দুই তিন। কুটুম পাখি ডাকে একটানা। বুড়ির মনের,ব্য কুটুম পাখির আনাগোনা। কুটুমের আগমনের উল্লাস নেই, কেমন একটা থিতানো ভাব। এই কুটুমের জন্যে পিঠে পুলির উৎসব নেই। বরং জল ঢেলে চুলো নিবিয়ে লুকিয়ে থাকা। বুড়ি বিষন্ন হয়ে যায়। জলের বুকে নিজের শরীর। মাথার ভেতর কুটুম পাখির। আনাগোনা। চেতনায় সুপপারি বাগানের আলো-আঁধারি। বুড়ির মন ছটফট করে। দুপুরের সূর্য ঠিক মাথার ওপর। গরম রোদ পুকুরের গায়ে তেমন উত্তাপ দেয় না। ছায়া। ছায়া বিস্তার। পাড় ঘেঁষে ডাহুকের ঠোঁটের মত কাল জল। ফিসফিসানি শব্দের মত পাতা ঝরে। হলুদ পাতা জলে ভাসে। গাছের নিচে বিছিয়ে যায়। বুড়ি জল ছেড়ে ঘাটে উঠে যায়। ভেজা গামছা দিয়ে চুল ঝাড়ে। নীতা চিৎ-সঁতারে পুকুরের জলে ভাসে। ওর মনে অখিল বাউলের ছবি। অখিল বাউলের গন্ধভরা উত্তাপ। কণ্ঠে অখিল বাউলের গান। বুড়ির মন এখন মুছে যাওয়া শ্লেটের মত। ধার কমে গেছে। তেমন গভীর দাগের আঁচড় পড়ে না। বুড়ি ভাবে, নীতা সব পারে। এজন্যে জীবন ওর কাছে বোঝা নয়। জীবনের দায় ওকে কাঁধে বোঝা মুটের মত বাঁকা করে রাখে না। কিন্তু বুড়ি কাত হয়ে গেছে। ওর আর সোজা হয়ে দাঁড়াবার ক্ষমতা নেই। জীবনকে যত আঁকড়ে ধরেছে তত বঞ্চিত হয়েছে। ও যদি পারত সব বন্ধন পিছে ফেলে রেখে কেবলই এগিয়ে যেতে, যদি পারত পথে পথে গান গাইতে, মন চাইলে নির্ভাবনায় ঘুমিয়ে পড়তে, শ্রান্তিতে কারো বুকে আশ্রয় নিতে। ধুত বুড়ি কিছুই পারবে না। ওর তেমন শক্তি নেই। সবকিছু এক জায়গায় এসে আটকে থাকে। বুড়ি মানসিক দিক দিয়ে যতই এগিয়ে যাক না কেন পারিপার্শ্বিক সীমাবদ্ধতা আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে রাখে। বেরুনোর কোন পথ নেই। তালগাছের গুঁড়ি দিয়ে তৈরি করা ঘাটের ওপর দাঁড়িয়ে নীতার ভাসমান শরীরের দিকে তাকিয়ে থাকে। ও নিশ্চিত নির্ভাবনায় হাল ছেড়ে দিয়ে ভাসছে। উঠে আসার কোন লক্ষণ নেই।
বুড়ি ঘাটের ওপর দাঁড়িয়ে কাপড় ছাড়ে। শুকনো কাপড় গায়ে জড়ায়। শরীরের এখানে সেখানে জলের ফোঁটা লেগে থাকে। নীতা পুকুরের মাঝখান থেকে চিৎকার করে।
–কিরে তোর হয়ে গেল?
–হ্যাঁ। উঠে আয় সই। খিদে পেয়েছে।
–বড় ঠাণ্ডা জল। আর একটু থাকি?
বুড়ি নিরুপায়ের মত দাঁড়িয়ে থাকে। নীতার কথার পিঠে কোন কথা বলতে পারে না। নীতার ইচ্ছেশক্তি আছে। ও যখন যা খুশি তা করতে পারে। বুড়ির চারপাশে তো নিয়ম। তাই নীতার জন্যে ঘাটের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা ছাড়া উপায় কি? খানিকক্ষণ। বিরতির পর আবার কুটুম পাখি ডাকে। বুড়ি অস্থির হয়ে ওঠে। হাঁ করে আকাশ দেখে। এখন কত বেলা? বুড়ি সরে এসে নারকেল গাছের গুঁড়িতে ঠেস দিয়ে দাঁড়ায়। মনের বিষন্নতা কাটে না। ছায়া ছায়া ঝোপঝাড়, শ্যাওলা জল, হাঁসের ঝাক, মাছরাঙা সবকিছু দৃশ্য ওর চোখের সামনে ওলোটপালোট খায়। মাথা পরিষ্কার হয়ে যায়। ওখানে আর। কুটুম পাখি আসে না। বুড়ি অনায়াসে পাখির ডাক ঝেড়ে ফেলে। নীতা ঘাটের দিকে এগিয়ে আসছে।
–উঃ অনেকদিন পর শরীরটা একদম জুড়িয়ে গেল। তোর এখানে এলেই মন আমার ঘরের দিকে ছোটে সই।
বুড়ি কথা বলে না। নীতা গামছা দিয়ে চুল ঝাড়ে।
–রাগ করছিস নাকি? খুব ক্ষিদে পেয়েছে? মনের মত কিছু হলে আমার আবার খিদেটিদে উবে যায়।
–হয়েছে চল।
বুড়ি আগে আগে হাঁটে। পেছনে নীতা।
রমিজা ভাত বেড়ে গুছিয়ে রেখেছে। সব কাজ ও খুব পরিপাটির সঙ্গে করে। সলীম কলীম কেউ ফেরেনি। কখন ফিরবে ঠিক নেই। ওদের ভাত শিকায় উঠিয়ে রাখে। খেতে বসে খুশি হয়ে যায় নীতা।
–বাহ্ বউ তো খুব ভাল রাধে। আমরা হাটঘাটের মানুষ। যত্নের খাবার পেলে ধন্য হয়ে যাই।
–তুই ঘর বাঁধিস না কেন সই?
–ধুত ওসব সয় না।
এক ঢোক জল খায় নীতা। ভর্তা দিয়ে ভাত মাখিয়ে একটু একটু করে খায়। বুড়ির আগে খাওয়া হয়ে যায়। হাত ধুয়ে উঠে পড়ে। নীতার দিকে তাকিয়ে ওর মনে হয় তড়িঘড়ি করে আয়েশটা শেষ করে দিতে চায় না ও। আয়েশ উপভোগ করতে চায়। বুড়ির সব কাজে হুটোপুটি। ঝটপট শেষ করে ফেলে। হরিণের মত বুড়ি আগে আগে দৌড়ায়। আর নীতা কচ্ছপ। ধীরে ধীরে ছন্দতাল সব বজায় রাখে। তাই নীতার জীবনে ছন্দপতন হয় না। ও অনায়াসে তাল ঠিক রাখে। আর বুড়ির তাল কেটে যায়।
