নীতা রইসকে মুড়ি দেয়। ও খাবার জন্যে আগ্রহ দেখায় না। ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয়। নীতা হেসে ফেলে।
–আমাকে তোর ছেলের পছন্দ নয় সই। দেখতেই পারে না।
–ওর কথা আর বলিস না। আমার কত সাধ, কত আকাঙ্ক্ষা ছিলরে সই।
–ঐ দেখ কি কথায় কি কথা। যা তোর নাতিকে শুইয়ে দিয়ে আয়। ও ঘুমিয়ে গেছে।
বুড়ির ওঠে না। নাতিকে কোলে দোলায়।
নীতা আনমনে মুড়ি চিবোয়। রমিজার রান্না শেষ হয়েছে। গনগনে চুলো লাল হয়ে আছে। তাপ ছড়াচ্ছে। রমিজা গামছা নিয়ে পুকুরঘাটে যায়। নীতা ওর চলার দিকে তাকিয়ে বলে, তোর বৌমার স্বাস্থ্য ভাল হয়েছে রে?
বুড়ি বোকার মত বলে, হ্যাঁ ও খুব ভাল মেয়ে।
নীতা পায়ের নখ দিয়ে মাটি আঁচড়ায়। মুড়ির দিকে মনোযোগ নেই। খেতেও ভাল লাগে না। শুকনো মুড়ি গলায় আটকে যায়। আনমনে দূরের জামরুল গাছের দিকে তাকিয়ে থাকে। উঠোনের ওপর দিয়ে একটা তিতির ডাকতে ডাকতে উড়ে যায়। বুড়ি অস্বস্তি বোধ করে। কোলের মধ্যে নাতি ঘুমিয়ে গেছে। ওকে ঘরে শুইয়ে দিয়ে আসতেও ইচ্ছে করে না। কি হল নীতার? ওর মনে দোতারার তার কি ছিঁড়ে গেল? এমন বেসুরো হয়ে গেল কেন? কি যেন ভাবছে নীতা। কখনো নীতা এমনি করে বুড়ির কাছ থেকে সরে যায়। কখনো কাছে আসে আপন হয়ে। তখন বুড়ির মনে হয় নীতা আজ একলা এসেছে। সঙ্গে কেউ নেই।
–তোর মনের মানুষ কৈ সই?
–মনের মানুষ?
–ওমা ভুলে গেলি নাকি? তোর চরণদাস?
–চরণদাস আখড়ায়।
–এলো না তোর সঙ্গে?
–এখন আমি ওর কেউ না। ও আবার মনের মানুষ জুটিয়েছে। ওর কথা বলিস সই। আস্ত ছোটলোক। এমন হারামী লোক আমি দেখিনি।
–তাহলে তুই এখন কি করছিস?
–আমার জন্যে এখন আছে অখিল বাউল। খুব ভাল মানুষ। সারাদিন বসে বসে গান লেখে। ঐ যে গাইলাম ওটা তো ওর লেখা গান। আমাকে বলে কি জানিস সই? বলে আমি ঘরে বসে বসে গান লিখবো তুই রাস্তায় রাস্তায় গেয়ে বেড়াবি। তবে তো দেশের মানুষ দেশের কথা জানবে। আমরা যদি গানে গানে না জানাই তবে গাঁয়ের লোকগুলো জানবে কোথা থেকে? ওর কথা শুনলে পরাণ জুড়িয়ে যায় সই। কতো ভাল ভাল কথা বলে অখিল বাউল। আখড়ায় কত লোক আসে। রোজ আমি ওর গান গাই। লোকে চুপ করে শোনে। জানিস কারো কারো চোখে জল এসে যায়।
অখিল বাউলের কথায় উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠে নীতা। আবেগে চোখ বুজে আসে। ও গুনগুন করে। নীতার শুকনো মুখে দেশের রেখা খুঁজে ফেরে। ও এখন অন্য জগতের বাসিন্দা।
আগে যখন গান গাইতাম তখন মনে হতো নিজের জন্য গাই। এখন মনে হয় সবার জন্য গাই। গাইতাম ভক্তির গান, প্রেমের গান। এখন গাই দেশের গান।
নীতার মুখে প্রশান্তির ছাপ। বুক ভরে শ্বাস টানে। বুড়ির দম আটকে আসতে চায়। অবাক হয়। নীতা এত কথা শিখল কোথা থেকে? ও তো এত কথা জানত না? আগে কখনো বলেনি। ওর মনের মানুষ নিয়ে ব্যস্ত থাকত। ভিখ করত, গান গাইত। সঙ্গী ছাড়া পথ চলতে পারতো না।
–তুই এতো কথা শিখলি কোথা থেকে সই?
–সবই অখিল বাউল। একদিন আখড়ায় আমার গান শুনে ঘরে নিয়ে গেল। রাতভর আমার গান শুনল। অখিল বাউলের মত এমন করে কেউ আমার গান শুনতে চায়নি। আমি মন-প্রাণ ঢেলে গাইলাম। মনে হল এমন করে কোনদিন কার জন্যে গাইনি। আমি এক অন্য মানুষ হয়ে গিয়েছিলাম সই। চরণদাস আমাকে ছেড়ে যাবার পর থেকে কেবল চিৎকার করে গান গাইতে ইচ্ছে করত। আমি ওকে ভুলতে চাইছিলাম। নিজের দুঃখ ছাড়াতে চাইছিলাম। অখিল বাউলের মিষ্টি কথায় সেদিন আমার গলা গানের নদী হয়ে গিয়েছিল। গান শেষে অখিল আমাকে বুকে টেনে নিল। তখন অনেক রাত। চারদিকে নিঝুম অন্ধকার। ঝি ঝি-র ডাকও বন্ধ ছিল। শেষ রাতটুকু দুজনে চুপচাপ শুয়েছিলাম। কেউ একটি কথাও বলিনি। অখিল বাউলের চওড়া বুকে অনেক তাপ সই। আমার মনে হয়েছিল জনম বুঝি এবার সার্থক হলো।
বুড়ি সমস্ত ইন্দ্রিয় সজাগ করে নীতার কথা শোনে। নীতা যেন রূপকথার গল্প বলছে। সেই সাত সমুদ্র তের নদীর পারের গল্প। বুড়ির জীবনের ছায়া সেই সমুদ্রের পাড়ে আর পড়ে না। সেজন্যেই গল্পের জন্যে বুড়ির এখন এত ঔৎসুক্য। শুনতে পেলে আর ছাড়ে না।
জানিস সকালে উঠে অখিল আমাকে বললো, তুই এখন আমার নীতা। এই ঘর তোর আর আমার। নিজের বুকে হাত দিয়ে দেখালো। বললো, এই বুক তোর ঘুমুবার। জন্যে। আর তোর ঐ মিষ্টি গানের গলা তোর একলার নয়। ঐ গলা সবার। এবার থেকে আমি গান বাঁধবো। তুই গাইবি। মাস তিনেক অনেক গান গাইলাম। বিরহের গান, দেহের খান, বাউল গান, মরমি গান কতো কি? তারপর জানিস সই সেই ফাগুন মাসে রেডিওতে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ শোনার পর ও বলল, এসব গান আর ভাল লাগে না নীতা। এবার থেকে অন্য গান বাঁধবো। আমি বললাম কি? বলল, দেশের গান। দেশের মানুষ এখন অন্যরকম হয়ে গেছে রে। দেশের গান দিয়েই ওদের এখন জাগিয়ে রাখতে হবে। এই গান দিয়েই আমরা আজ দেশের কাজ করবো। সেই থেকে আমি এই গান গাই। আর অন্য কিছু ভাল লাগে না। কত জায়গায় ঘুরে ঘুরে গান গাইলাম। লোকে আমাদের ঘিরে ধরে রে। শরীরে খুব যোশ পাই। জানিস পরশুদিন যখন গান গাইতে শুরু করলাম লোকে আমাদের সঙ্গে গাইতে শুরু করলো। ওরা বলল, আমরাও তোমার সঙ্গে গাইবো। আমি এক লাইন গাই তারপর ওরা গায়। সে কি উত্তেজনা! সকলে দেশের গানে পাগল হয়ে উঠল। মনে হল আকাশ-বাতাস যেন গানে গানে ভরে গেল। কালকে তোর কথা মনে হল। তাই আজ চলে এলাম দেখতে।
