রইস মাঝে মাঝে অবাক হয়ে বাচ্চাকে দেখে। কি যেন এক বিস্ময় ওর চোখের সামনে। এত ছোট বাচ্চা এত কাছ থেকে ও আর কখনো দেখেনি। হাত পা নেড়েচেড়ে মাঝে মাঝে বিরূপ হয়ে যায়। মারতে ওঠে। রইসের ভয়ে নাতিকে সারাক্ষণ আগলে রাখে বুড়ি। ও কখন কি অঘটন করে ফেলে বলা যায় না। নাতিকে নিয়ে বুড়ির সময় চমৎকার কাটে। সলীম কলীম বেশির ভাগ সময় বাড়ি থাকে না। কখনো বা রাতেও ফেরে না। রমিজা সাংসারিক ঝামেলায় ছেলের দিকে নজর দিতে পারে না। ফলে নাতির সব দায় দায়িত্ব বুড়ির একলার। ও একটা ছোট্ট দেশ। বুড়ি ঐ দেশের মালিক। ঐ দেশে আর কারো প্রবেশের অধিকার নেই। দুপুরের কড়া রোদে বাইরে যখন ঘুঘু ডাকে তখন বুড়ির অন্তর আর শূন্য হয়ে যায় না। রমিজার ছেলে সরোবরে নীল পদ্ম হয়ে অনবরত গন্ধ ছড়ায়। প্রশান্তির আলো হয়ে জ্বলে বুড়ির মন নামক সমুদ্রের বাতিঘরে। ভাবনার পাখিগুলো সে বাতিঘরের চারপাশে বারবার ভিড় জমায় আশ্রয়ের আশায়। নাতির চিন্তায় ভাল করে ঘুমুতেও পারে না বুড়ি। যন্ত্রণা কখনো মধুর হয়ে ওঠে। বুড়ির এখন সে অবস্থা, দিনগুলো পালে বাতাস লাগা নৌকোর মত।
বৈশাখের শেষ দিকে গান গাইতে গাইতে নীতা বৈরাগিণী আসে। একলা, চরণদাস নেই। হাঁটুর কাছাকাছি শাড়ি ওঠানো। ধুলোয় ধূসরিত পা। ক্লান্ত চেহারা, শুকনো ঘাসের মত রুক্ষ চুল বাতাসে ওড়ে। নীতাকে যেন বয়সে পেয়ে বসেছে। ওকে দেখে ঝকমকিয়ে ওঠে বুড়ির চোখ।
–সই কতদিন আসিসনি। আয় বস।
হাত ধরে নীতাকে বারান্দার ওপর এনে বসায়। ও দোতারাটা নামিয়ে রাখে একপাশে। পিঠের ওপর থেকে কাপড়ের পুটলীটাও নামায়। পা দুখানা জড়ো করে বসে।
–নাতি বুঝি?
–হ্যাঁ।
–চাঁদের মত ছেলে।
নীতা সরল হাসি হাসে। বুকের নিচে দুম করে কিসের যেন একটা শব্দ হয়। ছেলে, স্বামী এসবের কোন বালাই নেই ওর জীবনে। বুড়ির এখানে এলে বুকটা কেন মুচড়ে ওঠে। যত বয়স বাড়ছে ততই এসব বোধ প্রবল হচ্ছে। এখন আর ওর যৌবন নেই। যৌবনের মাদকতা নেই। পথে পথে ঘুরে ক্লান্ত হয়ে যায় নীতা। বিশ্রাম চায়, আশ্রয় চায়। দুমুঠি ভাত চায়। নীতা হঠাৎ করে সব দুঃখবোধ একপাশে ঠেলে রেখে কোমরে গোঁজা কৌটো থেকে তামাক বের করে।
–কিরে কি ভাবছিস?
–ভাবছি তোর মত একটা সংসার পেলে ঠেলেঠুলে ঢুকে যাই।
–কি যে বলিস সংসার কি তোর ভাল লাগবে? তোর মুখে তো আগে কখনো এমন কথা শুনিনি?
–যত বয়স বাড়ছে ততই তোকে আমার হিংসে হয়।
–সব তোর বাজে কথা।
বুড়ি হেসে গড়িয়ে পড়ে। নাতিকে আদর করে। নীতার বৈরাগী মন ধূ-ধূ করে। ধূসর হয়ে যায় সামনের দিনগুলো। পেছনের দিনগুলো কত মধুময় ছিল। ঘরের চার দেয়াল কল্পনাই করতে পারত না। এখন আখড়ায় বসেও সব কেমন এলোমেলো হয়ে যায়।
–তোর মনের মানুষ কই সই।
–মনের মানুষ? মনের মানুষ ছেড়ে এসেছি। এখন এই দেশটাই মনের মানুষ। নীতা দোতরা তুলে নেয়। টুংটাং ধ্বনির সঙ্গে সঙ্গে ও আবার নিজের ভুবনে ফিরে আসে। মাঝে মাঝে এখান থেকে বেরিয়ে গিয়ে একটা অকারণ যন্ত্রণা পায়।
ও গান ধরে :
সোনার গাঁয়ে বসত করি
সোনা মারেই জানি
বাংলা মায়ের কথা কইয়া
জুড়াইতো পরাণী
মায়ের কোলে দুধের শিশু
আদরের নাই শেষ
আমার সোনার বাংলাদেশ।
০৭. বুড়ি মনোযোগ দিয়ে গান শোনে
বুড়ি মনোযোগ দিয়ে গান শোনে। সলীম লীমের কথা মনে হয়। ওরাও ঠিক এই বলে। নীতার কণ্ঠ বুড়ির অন্তর ছুঁয়ে সারা গায়ে ভেসে চলে যায়। বাঁশবনে, খালের ধারে, স্টেশনের রাস্তায়, শিমুল গাছের মাথায় একটা ছোট বলের মত লাফিয়ে লাফিয়ে যায়। বাতাসের সঙ্গে তার সব ভাব। বুড়ি অভিভূত হয়। নীতাকে বড় আপন, বড় কাছের মনে হয়। ও এখন কেবল মনের মানুষ খোজা বাউল নীতা নয়। নীতার সুখ দুঃখ কণ্ঠের গান মিলিয়ে নীতা বুড়ির ঘরের লোক। দূরের নক্ষত্র হয়ে কেবল জ্বলে না। নীতার দোতারার টুংটাং ধ্বনি সারা বাড়িময় জেগে রয়। উঠোনে রমিজা বাঁশপাতা দিয়ে ভাত ফোটায়। মুঠো মুঠো শুকনো পাতা চুলের মধ্যে খুঁজে দিচ্ছে। একদফা পুড়ে নিঃশেষ হবার আগেই আরেক মুঠো দাউদাউ করে জ্বলে ওঠে। আগুন দেখতে দেখতে নীতার দোতারা থেমে যায়। বলে, আজ আমার যাবার তাড়া নেই সই। তোর এখানে ভাত খেয়ে একটু গড়িয়ে নিয়ে বিকেলে যাব। তোর ছেলেরা বাড়িতে নেই তো?
–না, তাছাড়া ওরা কখন ফিরবে তারও ঠিক নেই।
–ওরা থাকলে বড় সংকোচ লাগে।
মিছামিছি লজ্জা পাস। ওরা বড় ভাল ছেলে।
কি বেঁধেছিস সই?
ধুন্দুল দিয়ে শোল মাছ। লাল শাক ভাজি। ডাল। নারকেলের ভর্তা।
বাঃ বেশ। খাওয়াটা ভালই হবে। ডাল আর নারকেলের ভর্তা হলেই আমার চলবে। ভাল খাবার খেতে না পেয়ে জিহ্বায় চড়া পড়ে গেছে সই।
–কি আমার ভাল খাবার। তুই তো বেশি কিছু খাসই না।
নীতা হেসে মাথা নাড়ে।
বুড়ি রমিজাকে ডেকে বলে, ও রমিজা, সই আজ এখানে ভাত খাবে।
–ভালই তো। তারপর নীতার দিকে তাকিয়ে বলে, আম্মার সই এলে আম্মা খুব খুশি হয়। আপনি কিন্তু বেশি বেশি করে আসবেন।
–প্রায়ই তো আসি।
–কই আসেন? একবার গেলে আম্মার কথা তো ভুলেই যান। আবার কতদিন পরে মনে পড়ে।
–পথে পথে ঘুরি। আখড়ায় দিন কাটে। আমাদের কি পথের ঠিক আছে।
রমিজা হেসে মাথা নাড়ে। চুলো থেকে ভাত নামাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। বুড়ি ডালায় করে মুড়ি এনে নীতার সামনে দেয়। ঘটিতে করে জলও। রইস বারান্দার একপাশে বসে আছে। মুখ দিয়ে লালা গড়াচ্ছে। বাম হাত দিয়ে বারবার মাছি তাড়ায়। বুড়ি নাতিকে ঘুম পাড়ায়।
