–হ্যাঁ ঠিকই। প্রতিশোধ চাই। রক্তের বদলে রক্ত।
বুড়ি বেড়ার পাশেদাঁড়িয়ে শশানে। সবাই চলে গেলে জলিল এসে বসে বুড়ির দাওয়ায়। ওকে এখন চেনা যায় না। অনেক বদলে গেছে। মাথার চুল অর্ধেকের বেশি সাদা হয়েছে। বুড়িকে দেখেই জলিলের আবেগ কেঁপে ওঠে। স্খলিত কণ্ঠে এলোমেলো কথা বলে।
সব মানুষ যখন ঘুমিয়ে রাতের আঁধারে পাকিস্তানী সৈন্যরা ঝাঁপিয়ে পড়লো। আগুন। গুল। দাউদাউ করে জ্বলে চারদিকে। মানুষ চিল্লায়। আমি বাড়ি ছিলাম না। গিয়েছিলাম নারায়ণগঞ্জ। বাবুবাজার বস্তি পোড়ার সঙ্গে সঙ্গে ওরাও পুড়ে মরলো। সব আমারে বললো পাশের ঘরের তাহের। ওরও কেউ বাঁচেনি। ও একলা পালিয়েছে।
জলিলের চোখ দিয়ে দরদরিয়ে জল গড়ায়। বুড়িও কাঁদে।
–আমি এমনটা দেখি নি বুড়ি। মানুষ মানুষকে এমন করে মারে কি করে? উঃ আল্লা ওদের প্রাণে কি মায়াদয়া নাই? চোখ বন্ধ করলে আমি আগুন দেখি। গুলির শব্দ শুনি। মানুষের চিল্লানিতে কান ফেটে যেতে চায়। বুড়ি আমার ঘুম আসে না।
জলিলের মুখের শিরাগুলো স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বুড়ি নিৰ্ণিমেষ তাকিয়ে থাকে। এক সময় থেমে থেমে বলে, যারা আমাদের ওপর গুলি চালালো তারাতো আমাদের দেশেরই মানুষ জলিল ভাই?
–হ্যাঁ আমরা তো একদেশেরই মানুষ। দেশটাতো পাকিস্তান। অন্য নাম তো শুনিনি।
–তাহলে ওরা আমাদের মারে কেন? ওরা কি আমাদের ভালবাসে না?
বুড়ির কণ্ঠ উত্তেজিত হয়ে ওঠে। জলিল চুপ করে থাকে। এর উত্তর ও জানে না। বুড়ির কথা নিজেও ভেবে দেখে।
বুড়ি আবার বলে, আমাদের জন্যে যাদের মায়া নেই তাদের জন্যে আমাদের মায়া কি জলিল ভাই?
–ঠিক বলেছো। এ জন্যেই তো আমরা আলাদা হব। একথাই তো সবাই বলে, আমি কেবল বুঝতে পারি না।
জলিল উত্তেজিত হয়ে ওঠে।
–ভেবেছিলাম শোধ নেব। দেশের জন্য লড়ব। আমি যাই বুড়ি।
জলিল দ্রুত পায়ে নেমে যায়। সলীমকে খোঁজে। বুড়ি বসেই থাকে। ওর কাছে এখন সব কিছু পরিষ্কার হয়ে আসছে। ওর ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় দিয়ে সব বুঝে ফেলে। আগুন মানেই কেবল রমিজার ভাত রাধা নয়। আগুণ আরো অন্য কিছু। গুলি শব্দটাও বুড়ির অভিজ্ঞতায় নতুন করে সংযোজিত হয়। গুলি দিয়ে পাখি শিকার করতে দেখেছে বুড়ি। কিন্তু মানুষ মারতে দেখেনি। বুড়ি বিড়বিড় করে, ঐ গুলিটা যখন আমাদের শরীরে ঢুকতে পারে তখন ওদের শরীরে ঢুকবে না কেন? বুড়ি সাহসী হয়ে ওঠে। আমাদের ছেলেরাও তো ওটা পাল্টা ছোড়ার জন্যে তৈরি হচ্ছে। বুড়ি উঠে প্রিয় জলপাই গাছের নিচে এসে দাঁড়ায়। এখান থেকে গায়ের অনেক কিছু দেখা যায়। দেখতে পায় মাঠের মধ্য দিয়ে দ্রুত হেঁটে যাচ্ছে জলিল।
চৈত্রের শেষ রমিজার ছেলে। হয়। ফুটফুটে ছেলে। বেশ বড়সড়। অবিকল গফুরের মত। বুড়ির কাজ বাড়ে। সারাক্ষণ নাতি নিয়ে মেতে থাকে। কাজল পরায়, তেল মাখায়। গা চর্চ করে। ওকে নিয়ে গান গায়। বুড়ির প্রাণের বন্ধ দুয়ার যেন খুলে গেছে। এ ছেলে কি করবে, কোথায় রাখবে বুঝতে পারে না? রমিজা বুড়ির কাণ্ড দেখে হাসে।
–আম্মার খুশি যেন আর ধরে না।
গর্বিত মায়ের স্বর রমিজার কণ্ঠে। বুড়ি রমিজাকে দেখে। খুশিতে ওর মুখটা চচ করে।
–কি দেখেন আম্মা?
–দেখি তোকে। রইস হওয়ার পর আমি তোর মত সুখ পাইনি রমিজা।
–ঐ দেখ কোথা থেকে কি কথা।
রমিজা তাড়াতাড়ি পুকুর ঘাটে চলে যায়। বুড়ি বাঘার গায়ে থাপ্পড় দেয়, ঐ বাঘা তোর খুশি লাগছে না? আমাদের ঘরে একজন নতুন মানুষ এসেছে।
যত দিন যায় নাতিকে কেন্দ্র করে বুড়ির আবেগ তরতরিয়ে বাড়ে। ছেলেকে দোলাতে দোলাতে বুকের সঙ্গে চেপে ধরে। ও রইসের মত নয়। ও হাসে, তাকায়, মুখ। দিয়ে বিচিত্র শব্দ করে। যখন বুড়ির দিকে তাকিয়ে হাত-পা ছুঁড়ে খেলে তখন বুড়ি বুকের ভেতর জমানো সব দুঃখের কথা ভুলে যায়। ওর সঙ্গে কথা বলে, ও দাদু, দাদুরে তুই আমার সাত রাজার ধন। বুকের মানিক। তুই এমন একটা সময়ে এলি! এটা এখন জয় বাংলার সময়রে। দেখছিস না চারদিকের বাতাসে উথাল-পাথাল ঢেউ। দাদুরে তুই জানতেও পারিস না যে তোর বাপের বুকের মধ্যে প্রতিশোধের আগুন। হলদী গাঁ এখন গায়ের চামড়ার বদল ঘটাবে বলে তৈরি হয়ে উঠেছে। ও দাদু, দাদুরে তুই যখন বড় হবি দেখবি হলদী গাঁ আর হলদী গাঁ নেই। হলদী গাঁ বদলে গেছে। যারা ভায়ের বুকে গুলি চালায় আমরা তাদের সঙ্গে থাকি না রে।
বুড়ি নাতিকে চুমোয় চুমোয় ভরিয়ে দেয়। পরক্ষণে সলীমের ওপর রেগে ওঠে। সারাদিন ওর কাজ আর কাজ। কি যে এত কাজ?
বুড়ি একদিন বলেছিল, হ্যাঁ রে বাপ হয়ে ছেলেটাকে তো একদিন ভাল করে দেখলিও না? এ কেমন কথা?
ধুত ঐ মুরগির বাচ্চা আমি দেখব কি? তুমি দেখ। বড় হোক তখন ও আমার। বুড়ির আবাক হয়ে ওর দিকে তাকায়।
–কি দেখছ কি? আচ্ছা মা তুমি যে ওকে কোলে নিতে বল তা কি আমি পারি? হাতের ফাঁক দিয়ে তো পড়ে যাবে। তাছাড়া আমার সময় কৈ ছেলে সোহাগ করার? আমার কত কাজ।
–ঐ কাজ নিয়েই তুই থাক। বড় হলেও ছেলে তুই পাবি না।
–আচ্ছা দিও না। শোন মা, ও যাতে একটা স্বাধীন দেশের মাটিতে বড় হতে পারে সেই প্রতিজ্ঞাই তো আমি নিয়েছি। বড় হয়ে ও গর্ব করতে পারবে যে ওর বাপ একটা নতুন দেশের জন্যে যুদ্ধ করেছিল। আমার ছেলের বুকের মধ্যে এই অহংকারের বীজ আমি পুঁতে দিতে চাই মা। এটাই আমার সোহাগ। তুমি ওকে এখন সোহাগ কর ও যাতে বড় হয়। মানুষ হয়।
সলীম হাসতে হাসতে বেরিয়ে যায়। কথাগুলো বুড়ির বড় ভাল লাগে। কথাগুলো বুকের কৌটো খুলে তার মধ্যে জমিয়ে রাখে। দুঃসময়ে এসব কথা ভীষণ কাজ দেয়। বুড়ির দুঃখ ভুলিয়ে দেয়।
